সম্পাদকীয় ২

প্রশ্নচিহ্ন

প্রকাশ জাভড়েকর আতান্তরে পড়িয়াছেন। তাঁহারই মন্ত্রক দেশের সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমতালিকা প্রকাশ করিয়াছে, ফলে তালিকাটিকে উড়াইয়া দেওয়ার উপায় নাই।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০১৭ ০০:০০
Share:

প্রকাশ জাভড়েকর আতান্তরে পড়িয়াছেন। তাঁহারই মন্ত্রক দেশের সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমতালিকা প্রকাশ করিয়াছে, ফলে তালিকাটিকে উড়াইয়া দেওয়ার উপায় নাই। সেই তালিকার শীর্ষ ভাগেই রহিয়াছে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়— যে প্রতিষ্ঠানগুলি, নাগপুরের মতে, দেশদ্রোহীদের আখড়া। তালিকা মানিলে এই প্রতিষ্ঠানগুলির শ্রেষ্ঠত্বও মানিতে হয়। কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী নিজের মতো করিয়া একটি রফাসূত্র বাহির করিয়া লইয়াছেন— যে ছাত্ররা দিন রাত স্লোগান দেয় আর আন্দোলন করে, সেই রাখালদের দৌলতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সেরা হয় নাই, হইয়াছে সেই গোপালদের জোরে, যাহারা নাওয়াখাওয়া ভুলিয়া শুধু পড়াশোনা করিয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতিত্বের প্রেক্ষিতে গোপাল-রাখালের ‘বাইনারি’টি যে মস্তিষ্কে আসিয়াছে, তাহার দরজা-জানালা নাগপুরের পেরেক দিয়া আঁটা। নচেৎ তিনি জানিতেন, জেএনইউ বা যাদবপুরে যে ছাত্ররা রাষ্ট্রের উদ্দেশে বিপজ্জনক সব প্রশ্ন ছুড়িয়া দেয়, তাহাদের সিংহভাগই লেখাপড়াতেও কৃতী। বিদ্যাচর্চা ও রাজনীতির মধ্যে বিরোধ তো নাই-ই, বরং সাযুজ্য আছে। যে অনুসন্ধিৎসু মন উচ্চশিক্ষার দিগন্ত খুঁজিয়া বেড়ায়, সেই মনই রাজনীতির প্রশ্নগুলি উত্থাপন করে। যে মন বিনা প্রশ্নে মানিয়া লইতে অস্বীকার করে, তাহাই প্রকৃত ছাত্রের মন। জাভড়েকরদের বিরোধ এই মনের সহিত।

Advertisement

বিরোধটি মূলগত। তাঁহারা নাগপুরের সন্তান। তাঁহারা কুচকাওয়াজের নিয়মানুবর্তিতাকেই শিক্ষার পরাকাষ্ঠা জ্ঞান করিয়া বড় হইয়াছেন। সেই পাঠশালা গুরুমুখী। সেখানে প্রশ্ন করা নিষেধ। ফলে, ছাত্ররা কোনও গোত্রের কর্তৃপক্ষকেই প্রশ্ন করিবে, এই কথা মানিয়া লইতে জাভড়েকরদের গোটা মনন বিদ্রোহ করিয়া উঠে। উদার রাজনীতির প্রথম কথাই আবার প্রশ্ন করা— বিশেষত, কর্তৃপক্ষকে। জেএনইউ বা যাদবপুরের ন্যায় প্রতিষ্ঠানে এই প্রশ্ন করিবার ঐতিহ্যটি সযত্নলালিত। কানহাইয়া কুমার বা উমর খালিদ যখন ক্ষুধা, অসাম্য, অশিক্ষা হইতে আজাদির দাবিতে স্লোগান দেন, যখন রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে প্রশ্ন করেন— সেই প্রশ্নগুলি শুধুমাত্র তাঁহাদেরই নহে, তাহা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতির ফসলও বটে। জাভড়েকর এবং কানহাইয়া কুমার দুই বিপ্রতীপ সংস্কৃতির প্রতিভূ— এক জনের মনে নাগপুরের প্রশ্নহীন রক্ষণশীল আনুগত্যের অটল সিংহাসন, অন্য জনের চিত্তে জেএনইউ-এর উদারপন্থার আলো। সংঘাত অনিবার্য।

যে ছাত্ররা মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বাঁধিয়া গুরমেহের কৌরকে ভারতমাতার মাহাত্ম্য সমঝাইতে ব্যস্ত ছিল, তাহাদের রাজনীতিও জাভড়েকরের নিকট অসহ ঠেকে কি না, তিনি খোলসা করেন নাই। তবে, উত্তরটি অনুমান করা চলে। এবং বোঝা যায়, বর্তমান সরকার কেন যে কোনও উপায়ে জেএনইউ-এর ন্যায় প্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ড ভাঙিয়া দিতে মরিয়া। জাভড়েকররা উদার চিন্তাকে, যুক্তিবাদী মনকে, প্রশ্ন করিবার সাহসকে সামাল দিতে পারিতেছেন না। এই প্রতিরোধ সামলাইবার শিক্ষা তাঁহাদের নাই। তাঁহারা প্রশ্নহীন আনুগত্যের ভীতিপ্রদ আবহ সৃষ্টি করিতে উদগ্রীব। প্রশ্ন করিবার অভ্যাসটি বিনষ্ট হইয়া যদি উচ্চশিক্ষার সর্বনাশ হয়, তাহাও সই, কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের চোখে চোখ রাখিতে শেখায়, তাহার শেষ না দেখিলেই নহে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement