দুর্ভাগ্য, গাঁধীর মুক্তচিন্তার পরিসর আজ আর নেই

পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পরেও গাঁধী কিন্তু প্রার্থনাসভা থেকে কোরানের পাঠ প্রত্যাহার করতে রাজি হননি। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষালপাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পরেও গাঁধী কিন্তু প্রার্থনাসভা থেকে কোরানের পাঠ প্রত্যাহার করতে রাজি হননি। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৫ মে ২০১৭ ০০:১৫
Share:

প্রার্থনারত মহাত্মা গাঁধী।—ফাইল চিত্র।

আজকাল সব সময়েই ভাবি, সত্যি সত্যিই কি সময়টা অনেক অনেক বদলে গেছে? এখন আলাপ আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চিন্তার স্বৈরতন্ত্র বড় ভয়াবহ। এর চেয়ে বোধহয় জরুরি অবস্থা ভাল। পুলিশ ধরে প্রতিবাদী মানুষকে জেলে পুরে দেওয়া হচ্ছে। সেটা খুব স্পষ্ট বিষয়। পৃথিবীর নানা দেশে বিদ্রোহী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে এমনটা হয়েছে। সক্রেটিস থেকে ট্রটস্কি। গণতন্ত্রের নামাবলী গায়ে দিয়ে বিরুদ্ধ মতের পরিসরকে কবর দেওয়া। মনস্তাত্ত্বিক ভাবেই ভাবতে শুরু করছে মানুষ, এই খাঁচার পাখি হয়ে থাকাটাই রাষ্ট্রের কল্যাণ। চিনে এমনটা হয়েছে বহু ক্ষেত্রে, তবু স্বাধীনতার পর সত্তর বছর ধরে আমরা কিন্তু সেই অচলায়তন গড়ে তুলতে চাইনি ভারতীয় সমাজকে।

Advertisement

পূরণচন্দ্র যোশীর কথা মনে আছে আপনাদের? কমিউনিস্ট নেতা পি সি যোশী? হালে তাঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে মোহনদাস কর্মচন্দ্র গাঁধীর পত্রাবলির একটি সংগ্রহ গ্রন্থ পড়লাম। চিঠি ও গাঁধীর জবাব দেখে আমি যুগপৎ বিস্মিত ও আহ্লাদিত হলাম। দেখেছিলাম নবীন পি সি-কে প্রবীণ গাঁধী কতখানি গুরুত্ব ও মর্যাদা দিয়েছেন। পি সি যোশীর চিঠি তো নয়, পত্রাঘাত! তিনি বলেছেন, আপনি আমার লেখা পেপার ও রিপোর্টগুলো পড়তে চাইছেন কিন্তু লাভ কী? আপনি ভীষণ রক্ষণশীল, আগে থাকতেই সমস্ত অভিমত আগাম নিয়ে বসে আছেন। জবাবে গাঁধী বলছেন, এত উত্তেজিত না হয়ে পেপারগুলো পাঠাও, আমি সেগুলো পড়তে চাই। এক নাস্তিক কমিউনিস্ট অন্য দিকে কমিউনিস্ট বিরোধী ‘মহাত্মা’। গুজরাতে, মানে আহমেদাবাদে যখনই যাই বিমানবন্দরে ফেরার পথে এক বার সবরমতী তীরে গাঁধী আশ্রমে যাই। ক’দিন আগেই গিয়েছিলাম। গেলে এক বার পুস্তক বিক্রয়কেন্দ্রে যাই। এ বার শোভা ওয়ারিয়ারের লেখা বই His days with Bapu- Mahatma Gandhis Personal Secretary Recalls কিনলাম।। গাঁধীর ব্যক্তিগত সচিব ভি কল্যাণম। তিনি একশো ছুঁই ছুঁই। তাঁর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে শোভা এই বইটি লিখেছেন।

সবরমতী আশ্রমে মহাত্মা গাঁধী।—ফাইল চিত্র।

Advertisement

বইটিতে বহু অজানা তথ্য আছে। গাঁধীর প্রতিটি প্রার্থনাসভার মিনিটস্ লিখতেন কল্যাণমজি’। তিনি কিছু নথিও প্রকাশ করেছেন এই বইটিতে। যেমন, ’৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ৩১ অক্টোবর প্রার্থনাসভার প্রাক্কালে দু’জন গাঁধীর কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রার্থনাসভায় কোনও ভাবেই কোরান থেকে পাঠ করা চলবে না। গাঁধীকে তাঁরা এ কথা চিঠি লিখেও জানান। পড়ে গাঁধী চিঠি দিয়ে জানান, কোরান থেকে পাঠ হবে, যাঁদের পছন্দ হবে না তাঁরা প্রার্থনাসভা থেকে নিজেদের বিযুক্ত করুন। দেখুন, ’৪৭ সালে দেশভাগের পর গোটা দেশে হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছিল। তবু, পাকিস্তান নামক পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পরেও গাঁধী কিন্তু প্রার্থনাসভা থেকে কোরানের পাঠ প্রত্যাহার করতে রাজি হননি। আর একটি ঘটনা। রামচন্দ্র রাও হরিজন পত্রিকায় কাজ করতেন। রামচন্দ্র রাও অন্ধ্রের মানুষ ছিলেন। তাঁর ডাক নাম গোবা। An atheist with Gandhi বইটি রামচন্দ্ররাও লিখেছেন। এতে ওঁর সঙ্গে গাঁধীর সমস্ত তর্ক-বিতর্ক লিপিবদ্ধ। তিনি নাস্তিক মার্কসবাদী। তিনি গাঁধীকে ঈশ্বর মনে করতেন। কিন্তু নিজে ঈশ্বরকে মানতেন না। তাঁর সঙ্গে গাধীর চিঠিপত্র কথোপকথন অসাধারণ। গাঁধী বলছেন, আমি হিন্দু-আমি মুসলমান-আমি খ্রিস্টান-আমি জরথ্রষ্টবাদী, কিন্তু আমি নাস্তিক নই। আর মাসরুওয়ালা বলছেন, ধর্ম না থাকলে রাজনীতি হিংসামুক্ত হতে পারে। কী হবে ধর্ম? গাঁধী তাকে বলছেন, ঈশ্বরকে বাইরে খুঁজছ, তাই তুমি নাস্তিক। ঈশ্বরকে সোজা নিজের থেকে মানে আত্মা থেকে শুরু কর, তা হলেই আর হানাহানি থাকে না। কী অসাধারণ মুক্তচিন্তার পরিসর।

আমাদের দুর্ভাগ্য, আজ এই মুক্তচিন্তার পরিসর থাকছে না। পাঠক আমার আজকের লেখাটি পড়ে মনে করবেন না যে আমি গোঁড়া গাঁধীভক্ত, গাঁধীর মধ্যে যে অনেক ইডিও সিনক্রাসি ছিল সে কথা তাঁর সচিব কল্যাণমজি-ও লিখেছেন। আসলে ছাত্রজীবনে দেখেছি, আজও দেখছি কলকাতায় সিপিএমের দলীয় ঘেরাটোপে থাকা মার্কসবাদীরা ট্রটস্কি বা রোজা লুক্সেমবার্গ পড়ে না। আবার এখন দেখছি সবার আগে গায়ে একটা ‘জার্সি’ লাগাতেই হবে। তুমি আমেরিকা? না চিন? তুমি কংগ্রেস না বিজেপি? তুমি মমতা না সিপিএম? যাঁর যা ইচ্ছে করুন। আমি যদি কোনও জার্সিই গায়ে না দিয়ে ক্ষমতা নামক ভয়াবহ জন্তুটির সঙ্গে সহবাস করেও নিজেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করি? নিজের সত্তাকে পাঁকালমাছ করে রাখি যাতে পাঁক না লাগে, তেল মেখে নদীতে স্নান করি যাতে কুমির টানলেও পিছলে যেতে পারি, তবে কি আমি সুবিধাবাদী?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement