প্রবন্ধ ৩

কেন আমরা শব্দপুজোর এত ভক্ত

ব ছর নয়-দশের একটি ছেলে। দিব্যি তুরতুরে, হাসিখুশি। দস্যিপনায় অতিষ্ঠ বাড়ির লোক। কিন্তু কালীপুজো এলেই সে উধাও। এ-ঘর, সে-ঘর, উঠোন, দালান— সারা দিনে কেউ কোথাও খুঁজে পাবে না তাকে।

Advertisement

পৌলমী দাস চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০১৬ ০০:০০
Share:

শব্দহীন। শুধু আলোয় দীপাবলি যাপন।

ব ছর নয়-দশের একটি ছেলে। দিব্যি তুরতুরে, হাসিখুশি। দস্যিপনায় অতিষ্ঠ বাড়ির লোক। কিন্তু কালীপুজো এলেই সে উধাও। এ-ঘর, সে-ঘর, উঠোন, দালান— সারা দিনে কেউ কোথাও খুঁজে পাবে না তাকে। কারণ, সে তখন খাটের তলায়, সবচেয়ে কোণের ঘরে চুপ করে কাঁপছে। শব্দবাজিতে বড্ড ভয় তার। অথচ, অন্য দাদারা সব ওস্তাদ বাজি-ফাটিয়ে। হাতে করে চকলেট বোম ফাটায়, শুকনো চৌবাচ্চায় একশোটা পটকা একসঙ্গে বেঁধে পলতেয় আগুন দেয়। সে-ই কেবল ছন্নছাড়া। তাই সে ‘মেয়েলি’। তার জন্য পুজোর দিনে অপেক্ষা করে একলা ছাদ আর গত বছরের বেঁচে যাওয়া ফুলঝুরি, রংমশাল, সাপবাজি।

Advertisement

এক বছর সে সাহস করে বাড়ির সামনে একখানা বোর্ড টাঙিয়েছিল। তাতে বড় বড় হরফে লেখা ‘এখানে বাজি ফাটানো নিষেধ।’ সে বার পাড়ার প্রত্যেকটা চকলেট বোম ঠিক তাদের ঘরের সামনের রাস্তায় ফেটেছিল।

শব্দপুজোর দিনে, শব্দ থেকে দূরে সরে থাকতে চাইলে এই ভাবেই তো শায়েস্তা করতে হয়। যাঁদের কান এখনও উঁচু আওয়াজ সহ্য করতে শেখেনি, তাঁদের প্রায় সকলের জীবনেই এমন দু-চারটে বীভৎস রাত আছে। এক বছর শব্দবাজি নিয়ে ভারী কড়াকড়ি হল। সারা সন্ধে দু’চোখ ভরে খেলা দেখাল রকমারি আলোর বাজিরা। পাড়ায় টহল দিল পুলিশ জিপ। কী আনন্দ! রাতে নিশ্চিন্তে ঘুম। ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ হঠাৎ কানফাটানো আওয়াজে ঘুম থেকে আঁতকে উঠলাম। তার পর টানা এক ঘণ্টা রাস্তা চকলেট বোমের দখলে। দুটো প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মধ্যে আধ মিনিটও বোধহয় ফাঁক ছিল না।

Advertisement

ফি-বছর কালীপুজোর আগে নব্বই ডেসিবেল নিয়ে ভয়ানক একটা দড়ি টানাটানি চলে। কোনও বছর হয়তো শুরুটা বেশ সুন্দরই হয়। আওয়াজ কম। আলো বেশি। কিন্তু রাত হলেই কিছুতেই যেন রাশটা আর ধরে রাখা যায় না। ‘রাত দশটা থেকে ভোর ছ’টা অবধি শব্দবাজি ফাটানো দণ্ডনীয় অপরাধ’ কথাটা তখন ভয়ঙ্কর ঠাট্টা। বরং রাত যত গভীর, জায়গা যত আবদ্ধ, দু’দিকে বাড়ি-ঠাসা সরু গলি কিংবা চার দিকের লম্বা টাওয়ারের মাঝে আবাসনের একফালি জায়গা, শুরু শব্দবাজির খেল। কালীপুজোটা কোনও রকমে অল্পস্বল্প আইন মেনে উতরে গেলেও হাতে থাকে পরের দিনের দেওয়ালি, ভাসান, ছটপুজো, কিংবা হ্যাপি নিউ ইয়ার! কালীপুজোয় শব্দবাজি নিষিদ্ধ করা নিয়ে যতটা হইহই হয়, বর্ষবরণের রাতে ততটা হয় কি! অথচ সে রাতেও শব্দ কিছু কম হয় না।

শব্দবাজির এত ভয়ানক রমরমা কেন? কেন ফি-বছর সাধারণ নাগরিকের (সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, যাঁরা শব্দ থেকে দূরে থাকতে চান) হার্ট এবং কান বাঁচানোর জন্য পুলিশকে এমন ব্যাপক ভয় দেখানো ভূমিকায় রাস্তায় নামতে হবে? কানে তালা লাগিয়ে, মাথায়, বুকে হাতুড়ি ঠুকে কীসের এত সুখ? হয়তো এঁদের কানের পরদা অন্যদের থেকে আলাদা। বিকট শব্দ সেখানে মোলায়েম আরাম তোলে। তাই যে শব্দে অন্যরা ত্রাহি ত্রাহি করেন, সেই শব্দের মধ্যেও এঁরা অনায়াসে দাঁড়িয়ে মজা লুটতে পারেন। আর মজা আদায় করবেন বলেই তাঁরা আইনের তোয়াক্কা বিশেষ করেন না। তাই হার্টের রোগী কাতরায়, কুকুর-বেড়াল দিশেহারা ছোটে, পাখিরা মরে যায়, এবং প্রতি বছর ঘটা করে বিজ্ঞাপনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সে সব প্রচারও করা হয়। তার পরেও দিব্যি নিষিদ্ধ শব্দগুলো মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। আসলে শব্দকে আমরা জীবনের সঙ্গে এমন ভাবে মিশিয়ে ফেলেছি যে, নিজেরাও শব্দ ছাড়া উৎসবের কথা ভাবতে পারি না। অসহ্য হলে ‘দু-এক দিনের ব্যাপার’ বলে চোখ বুজে বসে থাকি।

Advertisement

মাত্রাছাড়া শব্দ থেকে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার এই রোগকে কিন্তু নেহাতই ‘সেডিস্ট’ মানসিকতা ভাবলে ভুল হবে। অন্যকে খোঁচানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দ তো নিজেরও সমান ক্ষতি করছে। তা হলে? আসলে, আমার শব্দবাজি অসহ্য লাগে— কথাটার মধ্যেই বোধহয় ভয়ানক একটা কাপুরুষতার গন্ধ আছে। উৎসবের রাতকে নব্বই ডেসিবেল পার করা শব্দ দিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে দিতে না পারলে যথেষ্ট পৌরুষ দেখানো হয় না। ‘হাতে ধরে চকলেট বোম ফাটিয়েছি’ কথাটা বলার মধ্যে প্রচ্ছন্ন গর্ব সে দিকেই যেন আঙুল তোলে।

এবং সেই পৌরুষ শুধুমাত্র শব্দবাজিতেই আটকে নেই। অহেতুক গাড়ির হর্নে হাত, উৎকট জোরে মাইক, ভেঁপু হাতে প্যান্ডাল হপিং, বিসর্জনের শোভাযাত্রায় বিকট ‘ডিজে’— সব কিছু থেকেই ক্ষমতা প্রদর্শন চুঁইয়ে পড়ছে। এই ছকে ফেললে শব্দশহিদের সংখ্যাবৃদ্ধিকেও তেমন আশ্চর্য মনে হয় না। দিনে দিনে বাহুবলীদের এমন শ্রীবৃদ্ধির জন্যই বোধহয় এ পোড়া দেশে আসন্ন ভারত-পাক যুদ্ধ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন পিঠ চাপড়ানির হুল্লোড় পড়ে যায়। নিউটাউন অঞ্চলে দেওয়ালির রাতে আচমকা শব্দদূষণের বাড়বাড়ন্ত দেখে মনে হল, এঁদের কেউ কেউ বোধহয় সেই যুদ্ধের মহড়া এখনই দিয়ে রাখলেন।

কালীপুজোর আগের সন্ধেয় ভবানীপুরের এক বাজি বাজারের সামনে বাজি পোড়ানো হচ্ছিল। দু’পাশে থমকে গাড়ির সারি। শুরু হল শব্দবাজি। সেগুলোর মাথাপিছু শব্দ নব্বই ডেসিবেল পেরোয় কি না, জানা নেই। কিন্তু ফাটছিল খান পাঁচেক একসঙ্গে। মজা লাগল দেখে, স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা মাইক মুখে তাতে বেজায় উৎসাহ জুড়তে শুরু করলেন এবং প্রতি আধ মিনিটে মনে করিয়ে দিতে লাগলেন, ‘শব্দবাজি কিন্তু এখন নিষিদ্ধ। আইন ভাঙবেন না।’ তার পরই ফের ঠাস ঠাস দ্রুম দ্রাম। শব্দবাজির সেই প্রতিযোগিতা দেখতে উপস্থিত একরাশ লোকের জ্বলজ্বলে চোখ-মুখ দেখে মনে হল, শব্দহীন উৎসবের কনসেপ্ট মানুষের কাছে পৌঁছতে কল্পান্তর অবধি অপেক্ষা করতে হবে।

তবে, চেষ্টা করলে ফল মেলে। গত দু-তিন বছরের থেকে এ বার কালীপুজোয় শব্দবাজির তাণ্ডব অন্তত বাড়েনি। বরং বেশ কিছু জায়গায় পুজোর রাত ছিল অনেকটাই শান্ত। কারণ, অনেক জায়গাতেই পুলিশ-প্রশাসনের টহলদারি। কারণ, শব্দ নিয়ে এ বছর মিডিয়ারও যথেষ্ট শব্দ খরচ। দুর্গাপুজোয় বেলাগাম মাইক বেশ কিছু বছর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে থিম পুজো বাজার ধরতে শুরু করার পর থেকে। যদি কালীপুজো-দেওয়ালিতেও তেমন লক্ষণ মেলে, ভালই তো।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement