সম্পাদকীয় ১

অ-প্রাসঙ্গিক

শিশু পালনের অধিকার কাহার আছে, কাহার নাই, এই তর্ক শুনিতে মহা প্রাচীন হইতে পারে, কিন্তু একবিংশ শতকের সমাজেও যে তাহার প্রাসঙ্গিকতা বিস্ফোরক, প্রমাণ করিয়া দিল মিশনারিজ অব চ্যারিটি (এমওসি)। কলিকাতা-ভিত্তিক এই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান তাহার সামাজিক ও মানবিক কাজের জন্য বিশ্বখ্যাত।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০১৫ ০০:২৬
Share:

শিশু পালনের অধিকার কাহার আছে, কাহার নাই, এই তর্ক শুনিতে মহা প্রাচীন হইতে পারে, কিন্তু একবিংশ শতকের সমাজেও যে তাহার প্রাসঙ্গিকতা বিস্ফোরক, প্রমাণ করিয়া দিল মিশনারিজ অব চ্যারিটি (এমওসি)। কলিকাতা-ভিত্তিক এই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান তাহার সামাজিক ও মানবিক কাজের জন্য বিশ্বখ্যাত। কিন্তু এই মুহূর্তে এ দেশে তাহার অস্তিত্ব ও কর্মপরিসর সংকটময়। যে মূল্যবোধে ভর করিয়া তাঁহারা কাজ করেন, ভারত সরকারের নূতন দত্তক শিশু পালন বিধি তাঁহাদের সেই মূল্যবোধে প্রবল আঘাত হানিয়াছে। ‘সিঙ্গল পেরেন্ট’ বা একক অভিভাবককে শিশু দত্তক লইবার অধিকার দিবার যে নির্দেশিকা আসিয়াছে, এমওসি তাহা গ্রহণ করিতে নারাজ। তাঁহাদের মতে, বিবাহ-ভিত্তিক পরিবারের বাহিরে শিশু পালনের কাজটি সুস্থ ভাবে হয় না, ডিভোর্স-পরবর্তী একক অভিভাবকের পরিবার বা অ-বিবাহভিত্তিক পরিবার শিশুর মানসিক অবলম্বনের উপযুক্ত নহে। আরও একটি নূতন নির্দেশ লইয়া তাঁহাদের তীব্র ক্ষোভ। প্রতিপালনে ইচ্ছুক অভিভাবকদের ছয়টি শিশুর মধ্য হইতে একটিকে পছন্দ করিবার অধিকার সরকার দিতে চাহে। এমওসি-র মতে, শিশু পছন্দের পদ্ধতিটি প্রকৃতির বিরোধী, সুতরাং অনৈতিক। কেন্দ্রীয় সরকারের নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীন সেন্ট্রাল অ্যাডপশন রিসোর্স অথরিটি-র নূতন নীতির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁহারা তাই স্থির করিয়াছেন, দীর্ঘ দিন ধরিয়া ভারতে শিশু দত্তক দিবার যে গুরুতর কাজটি তাঁহারা করিয়া থাকেন, তাহা বন্ধ করিবেন। এমওসি-র এই মত দুর্ভাগ্যজনক, যদিও অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে তাঁহাদের আদর্শের সঙ্গে তাঁহাদের মতটি যথেষ্ট সুসমঞ্জস। কয়েক দিন আগে ক্যাথলিক বিশপস’ কনফারেন্স অব ইন্ডিয়া (সিবিসিআই)-ও যে এমওসি-র মত সমর্থনের ঘোষণা করিয়াছে, তাহা অকারণ নহে। ক্যাথলিক ঐতিহ্যমতে বিবাহ-বহির্ভূত পরিবার, শিশু নির্বাচনের অধিকার ইত্যাদি যথার্থই অগ্রহণযোগ্য। এই সব আদর্শ হইতে সরিতে হইলে ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মের গোড়ায় ঘা লাগে না কি?

Advertisement

সুতরাং প্রশ্ন ইহা নয় যে, তাঁহারা কেন এ কথা বলিতেছেন। প্রশ্ন এই যে, তাঁহারা এত কাল পরে, দুনিয়া এতখানি পাল্টাইয়া যাইবার পরও এই কথা বলিবেন? সময় পাল্টাইয়াছে। বিবাহ এখন আগের মতো অপরিবর্তনীয় প্রতিষ্ঠান নাই। বিবাহের মতো বিবাহবিচ্ছেদও এখন আইনত সিদ্ধ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সে ক্ষেত্রে কোন মুখে ভারতীয় আইন বা বিচার ব্যবস্থা বিবাহিত ও বিবাহবিচ্ছিন্ন প্রতিপালক পিতা-মাতার মধ্যে পার্থক্য করিবে? সিঙ্গল পেরেন্ট-এর নিকট শিশু ভাল ভাবে বাড়িয়া উঠিতে পারে না, এই ‘যুক্তি’তে? ইহা কোনও ধর্মমতের বিশ্বাস হইতে পারে, কিন্তু জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, তথ্য, পরিসংখ্যান দিয়া ইহার কোনও প্রমাণ মিলে না। বরং বিপরীত প্রমাণ মিলিতে পারে। ব্যতিক্রম? কোন পরিস্থিতির ব্যতিক্রম নাই? বিবাহিত পরিবারে দুঃপালিত শিশুর দৃষ্টান্ত কি ভারতীয় সমাজ কম দেখিতেছে?

প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবাহ আজ বিভিন্ন সামাজিক মডেলের অন্যতম মাত্র। তাহার পূর্বতন মহতী বিভা দিগন্তে বিলীন। আসিয়াছে ব্যক্তি-অধিকারের স্বীকৃতি। কেবল বিবাহ না করিবার, কিংবা বিবাহ ভাঙিয়া যাইবার ‘অপরাধে’ যে কাহারও অধিকার কাড়িয়া লওয়া যায় না, এমনকী শিশুপালনের অধিকারও না। ক্যাথলিক আদর্শেরও কি যুগের সঙ্গে তাল মিলাইবার দায় নাই? তাহা হইলে শরিয়তি প্রথার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উদ্গারণই বা কোন্ যুক্তিতে, সনাতনী হিন্দু বর্ণভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরোধিতাই বা কোন যুক্তিতে? সমাজকর্মের খাতিরেও সমাজ পরিবর্তনের স্বীকৃতি চাই। নতুবা নিজেদেরই অপ্রাসঙ্গিক হইয়া পড়িতে হয়।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement