অনেক শিশু পুলিশ সাজিতে ভালবাসে। এ রাজ্যে শিশুর অভিনয় করিতে ভালবাসে পুলিশ। পুলিশের তোলাবাজি এড়াইতে মরিয়া ট্রাকের ধাক্কায় তিনটি শিশু প্রাণ হারাইল বেলঘরিয়ায়। স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের দুর্নীতির প্রতিবাদে রাস্তা অবরোধ করিলেন। ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার নীরজকুমার সিংহ শিশুসুলভ বিস্ময়ে বলিলেন, পুলিশের তোলাবাজির অভিযোগ তো হয় নাই। সত্যই তো, থানায় অভিযোগ দায়ের না করিলে পুলিশকর্মীদের দুষ্কর্মের কথা কর্তারা জানিবেন কী করিয়া? শিশুকে যেরূপ বিশদে বুঝাইয়া দিতে হয়, সেই রূপ পুলিশকেও তো জানাইতে হইবে যে পুলিশ কখন, কোথায় তোলাবাজি করে, নেতারা কী রূপে সিন্ডিকেট করেন, তাঁহাদের চেলাচামুণ্ডারা নির্বাচনের আগে কী প্রকারে ভীতিপ্রদর্শন করিয়া থাকে। না হলে অবোধ পুলিশ জানিবে কী করিয়া, করিবেই বা কী। অবশ্যই, পুলিশ বা নেতার বিরুদ্ধে নালিশ লিখাইতে হইলে প্রাণ হাতে করিয়া থানায় যাইতে হইবে। বাড়িতে হামলা, প্রাণনাশের হুমকি হইতে প্রকাশ্যে খুন, কোনও সম্ভাবনাই বাদ দেওয়া যাইবে না। কিন্তু নাগরিকের প্রাণের আবার মূল্য কী? তোলাবাজির জেরে সন্তানদের প্রাণ যাইবে, ভোট দিতে গিয়া বৃদ্ধ বাবা-মা বোমা খাইবেন, রেশন চাহিতে গিয়া গুলি খাইতে হইবে। তাহাতে ভয় পাইলে চলিবে না।
পুলিশেরও কি প্রাণের ভয় নাই? তাহাদেরও কি রাজনৈতিক দুষ্কৃতীদের তাড়া খাইয়া থানার টেবিলের তলায় সিঁধাইতে হয় নাই? নেতা-নেত্রীর হাতে চড়-কিল খাইয়া হজম করিতে হয় নাই? থানায় ভাঙচুর হইতেছে দেখিয়া কি নীরবে সহিতে নাই? তাহার পরেও মহামান্য পুলিশকর্তারা যদি চেয়ারের মায়া ছাড়িয়া না থাকেন, তাহা হইলে সামান্য প্রাণের মায়া ত্যাগ করা নাগরিকের নিকট কী এমন কঠিন? যদি মরিতেই হয়, অভিযোগ করিয়া মরিব, এই শপথ লইয়া থানায় যাইতে হইবে। তবে ফলের আশা করিলে চলিবে না।
পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা ‘অভিযোগ হয় নাই’ বলিলে তাহা তথ্যের অভাবকে বোঝায় না। বোঝায় দায়বদ্ধতা, কর্তব্যবোধের অভাবকে। এলাকায় কী হইতেছে, তাহা জানাই তাঁহাদের কাজ। কলিকাতায় এমন রাস্তা নাই, যেখানে ট্রাফিক পুলিশ তোলা না তুলিয়া থাকে। সেই টাকা নিয়মিত ভাগ-বাঁটোয়ারার সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাও যে রহিয়াছে, মুদ্রিত কুপন তাহার প্রমাণ। সকলের চোখের সম্মুখে এমন বহু দুর্নীতি, অপরাধ, অপব্যয় ঘটিয়া যাইতেছে। কিন্তু সে বিষয়ে শোরগোল উঠিলেই নেতারা বাঁধা গতটি বাজাইয়া দেন— অভিযোগ তো হয় নাই। যেন লিখিত অভিযোগ যদি না হইয়া থাকে, তা হলে তাঁহাদেরও করণীয় আর কিছু নাই। নিজেদের কাজের নিয়মিত মূল্যায়ন, এবং তৎসম্পর্কিত অভাব-অভিযোগ বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকা যে সরকারি কাজেরই অঙ্গ, লিখিত অভিযোগের দাবি তুলিয়া এ কথাটা যেন সম্পূর্ণ অস্বীকার করা চলে। পরিতাপের বিষয়, বহু জনপ্রতিনিধিও সমালোচনার সম্মুখে পড়িলে আজকাল ‘অভিযোগ নাই’ বলিয়া থাকেন। তাঁহাদের উদ্দেশ্য তখন সমস্যার মোকাবিলা নহে, তাহা উড়াইয়া দেওয়া। গরু পাচার, নারী পাচার-সহ বিভিন্ন অপরাধ যে ট্রাফিক পুলিশের প্রশ্রয়েই হইয়া থাকে, পথদুর্ঘটনার একটি বড় কারণ যে ট্রাফিক পুলিশ, তাহা এ রাজ্যের শিশুরাও জানে। এত দিন শিশুরা পুলিশ সাজিতে পা ঠুকিয়া স্যালুট ঠুকিত। অতঃপর হয়তো হাতটি আগাইয়া দিবে।