আজ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবনে মুকুল রায় ও অমিত মিত্রের উপস্থিতি গত কয়েক দিনের কষায় স্বাদ খানিক হইলেও কমাইতে পারিবে। তবে, কুনাট্যটির প্রয়োজন ছিল না। দৃশ্যতই নরেন্দ্র মোদী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দের প্রধানমন্ত্রী নহেন। কিন্তু ভারতীয় গণতন্ত্রের পরীক্ষা তাঁহাকে সেই আসনের অধিকারী করিয়াছে। শপথগ্রহণের অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি প্রেরণ লইয়া টালবাহানা সেই পরীক্ষার ফলকে অসম্মান করা। প্রশ্নটি মোদীর প্রতি অনুরাগ-বিরাগের নহে। প্রশ্নটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মানের। নির্বাচনে পর্যুদস্ত কংগ্রেসের কর্ণধার সনিয়া গাঁধী এবং তাঁহার পুত্র গণতন্ত্রকে সম্মান করিবার সিদ্ধান্ত করিয়াছেন। তাঁহারা শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকিবেন। বিভিন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রধানও যে আসিতেছেন, তাহা ব্যক্তিমাহাত্ম্যে নহে, তাঁহাদের সমাগমন স্বাভাবিক সৌজন্যেই। এ পার বাংলার বাঙালিই কেবল দ্বিধায় মরিল। সিপিআইএম-এর সূর্যকান্ত মিশ্র অনতিপ্রচ্ছন্ন গর্বের সহিত জানাইয়াছেন, তাঁহারা অটলবিহারী বাজপেয়ীর সময়েও যেমন প্রতিনিধি পাঠান নাই, এই বারও পাঠাইতেছেন না। তাহা হইলে সীতারাম ইয়েচুরি আজ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবনে কোন দলের তরফে উপস্থিত থাকিবেন, এই প্রশ্নটি উহ্য থাকুক। কিন্তু, ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা বজায় রাখিতে না পারিবার মধ্যে যে কোনও গৌরব নাই, এই কথাটি বামপন্থীরা আর কবে বুঝিবেন?
বিমান বসুরা ভাবিতেই পারেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র যে দুঃসহ ভার তাঁহারা জাতির স্বার্থে বহন করিতেছেন, মোদী তাহাতে আঘাত হানিবেন। গণতন্ত্র সুযোগ দিয়াছিল— ক্ষমতায় কুলাইলে তাঁহারা মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের পথ আটকাইতে পারিতেন। প্রধানমন্ত্রী ভারতের সাংবিধানিক চরিত্র হইতে বিচ্যুত হইলে প্রতিবাদ করিবার সুযোগ তাঁহাদের আছে। কিন্তু, স্বাভাবিক সৌজন্য বিস্মৃত হইতে হইবে কেন? বিশেষত এই সৌজন্যের সহিত গণতন্ত্রের সম্মান যুক্ত। নরেন্দ্র মোদী ভারতের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তাঁহাকে স্বীকার না করিবার অর্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটির প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন। বিরোধিতার টানে তৃণমূল কংগ্রেস বা সিপিআইএম সেই কথাটি ভুলিয়া গেলে তাহা অতি লজ্জার। বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা ভারতীয় রাজনীতির অভিজ্ঞান হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহাতে সংসদ অচল হউক আর দেশের উন্নতি স্থগিত হইয়া যাউক, বিরোধীদের সম্ভবত কিছু আসিয়া যায় না। বিমান বসুরা সেই পথে থাকিতেই মনস্থ করিয়াছেন বোধ হয়।
সব দোষ যে বিরোধীদের, তাহা বলা অবশ্য মুশকিল। গত দশ বৎসর সাক্ষী, সরকার ঠেকিয়া গেলে তবেই বিরোধীদের সহিত আলোচনার কথা স্মরণে আসে। পরমাণু চুক্তিই হউক বা খুচরা ব্যবসায়ে বিদেশি বিনিয়োগে সম্মতি, প্রতি ক্ষেত্রেই সনিয়া গাঁধী-মনমোহন সিংহ একেবারে নাচার হইয়া তবে বিরোধীদের সহিত কথা বলিতে উদ্যোগ করিয়াছিলেন। প্রবণতাটি গণতন্ত্রের পক্ষে মারাত্মক। শাসক-বিরোধী, উভয় পক্ষের মত বিনিময়ের মাধ্যমেই নীতি নির্ধারণ বাঞ্ছনীয়। যাহার সহিত মত মিলে না, তাহার মতকে সম্মান করাই গণতন্ত্রের শিক্ষা। বিগত জমানা এই কথাটি বুঝিতে পারে নাই। নরেন্দ্র মোদীর প্রথম কয়েক দিন দেখিয়া ক্ষীণ আশা জাগিতেছে, ছবিটি বদলাইতেও পারে। তবে, না আঁচাইলে যে বিশ্বাস নাই, বঙ্গবাসী বিলক্ষণ জানিবেন। ২০১১ সালের মে মাসে আশা জাগিয়াছিল, এই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশও বুঝি বদলাইবে। নূতন মুখ্যমন্ত্রী সেই পরিবর্তন সাধিবেন। কিন্তু সেই আশা ভোজের বাজির ন্যায় মিলাইয়া যাইতে সময় লাগে নাই। পশ্চিমবঙ্গ সেই বিরোধিতার কুম্ভীপাকেই আছে। নরেন্দ্র মোদী দেশকে অন্য পথে লইয়া যাইতে পারেন কি না, তাহাই দেখার।