সম্পাদকীয়

অসুরের বারোমাস্যা

পূজা ফুরাইয়াছে। যে মণ্ডপগুলিতে এখনও দেবী এবং তাঁহার পদতলে মহিষাসুর বিরাজমান, সেগুলিরও মেয়াদ আর কয়েক ঘণ্টা মাত্র। কলিকাতা নামক নগরীতে ফিরিবার জন্য মহিষাসুর আগামী আশ্বিনের অপেক্ষায় থাকিবে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০১৫ ০০:০১
Share:

পূজা ফুরাইয়াছে। যে মণ্ডপগুলিতে এখনও দেবী এবং তাঁহার পদতলে মহিষাসুর বিরাজমান, সেগুলিরও মেয়াদ আর কয়েক ঘণ্টা মাত্র। কলিকাতা নামক নগরীতে ফিরিবার জন্য মহিষাসুর আগামী আশ্বিনের অপেক্ষায় থাকিবে। তত দিন শহর অসুরহীন থাকিবে, সেই সম্ভাবনা অবশ্য তিলমাত্রও নহে। সিন্ডিকেটাসুর, ছাত্রনেতাসুর, অটোচালকাসুরের এই শহরে নবতম হইল বাইকাসুর। শহরের রাজপথে বেপরোয়া দ্বিচক্রযান চালনা, কোনও আইনের তোয়াক্কা না করাই যে অসুরের তাণ্ডবের প্রধান চরিত্র। এক অর্থে তাহারা আত্মঘাতীও বটে— আর কোনও অসুর নিজের অস্ত্রে এত বেশি মারা পড়ে না। তবে, কবি বলিয়াছেন, চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, হেলমেটহীন যেথা শির। অতএব, নিত্য ঘটিয়া চলা মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও তাহাদের নিরস্ত করিতে পারে না। পুলিশও নহে। রাতের শহরে বরং পুলিশই তাহাদের ডরায়। কেহ বলিতে পারেন, আঠারো বৎসর বয়সের ইহাই ধর্ম। সকল বাইকাসুরই আঠারো, পুরসভার সার্টিফিকেটে জন্মের তারিখ যাহাই হউক না কেন। তবে, কিশোর কবি যাহা বলেন নাই, এই আঠারোর ক্ষেত্রে সেই মহামূল্যবান প্রাচীন কথাটিও স্মরণে রাখা প্রয়োজন— যথাবিধি কান মুলিয়া দিলে বয়সের অনেক দোষই হাওয়ায় মিলাইয়া যায়।

Advertisement

পূজার দিনগুলিতে কলিকাতা পুলিশ এই কর্ণমর্দনের আয়োজন করিয়াছিল। পুলিশের ফেসবুক পেজে জানানো হইয়াছে, এই কয় দিনে পাঁচশো বাইক আটক করা হইয়াছে। আরোহীরা বেপরোয়া বাইক হাঁকাইতেছিলেন তো বটেই, কোনও নথিপত্র সঙ্গে রাখিবার প্রয়োজনও বোধ করেন নাই। তবে, একই সঙ্গে আর একটি কথাও জানা গিয়াছে। শহরে পূজার কয়টি দিন এমন যত ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহার মাত্র দুই শতাংশ ক্ষেত্রেই বাহন আটক করা সম্ভব হইয়াছে। কলিকাতা পুলিশের মতে, পূজায় একই সঙ্গে ট্রাফিক চলাচল অব্যাহত রাখা এবং বাইকের উপর নজরদারি চালানো সম্ভব নহে। শহর সচল রাখিবার দিকেই তাঁহাদের অধিকতর মনোযোগ দিতে হয়। কথাটি উড়াইয়া দেওয়ার নহে। তবে, পূজা চার দিনের, আর বাইকাসুরের তাণ্ডব গোটা বৎসর। ফলে, আগামী কাল হইতে কর্ণমর্দনের বিষয়টিতে জোর দেওয়াই বিধেয়। গোটা বৎসর শাসনে রাখিলে পূজার দিন আর নূতন করিয়া ভাবিতে হয় না। আইনের শাসন মানিয়া চলা একটি অভ্যাস। সেই অভ্যাস প্রতিষ্ঠা করিতে হয়। সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারে কান দিতে যে বাইকাসুরের রুচি নাই, তাহা এত দিনে স্পষ্ট। অতএব, কঠোর শাস্তিই পন্থা। দুই শতাংশ অপরাধীকে ধরা গেলে তাহাদেরই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা হওয়া বিধেয়। এমন শাস্তি, যাহাতে অন্যদের মনেও ভয়ের কাঁপন লাগে। একমাত্র এই পথেই বাইকাসুর-বিনাশ সম্ভব।

তবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি পরিবেশ প্রয়োজন। পুলিশকে ভয় পাইতে হয়, এই কথাটি হাওয়ায় না ভাসিলে পুলিশ কার্যত অসহায়। বঙ্গেশ্বরীর কল্যাণে পুলিশ এখন নিধিরাম সর্দারের বাড়া। প্রত্যেকেই জানে, ঠিক জায়গার ধমক খাইলেই পুলিশ গুটি গুটি পায়ে সরিয়া পড়িবে। প্রয়োজনে থানার টেবিলের নীচে লুকাইবে। কে আর এমন পুলিশকে ভয় পায়? পশ্চিমবঙ্গে এখন অসুর অবধ্য। কাজেই, লালবাজারের যে কর্তারা রাস্তায় বাইক সামলাইবার প্রয়োজনের কথা ফেসবুকে লিখিতেছেন, তাঁহারা নিজেদের প্রশ্ন করুন। মেরুদণ্ড বন্ধক রাখিবার কী ফল মিলিতেছে, ভাবিয়া দেখুন। পুলিশের উপর রাজনৈতিক দখলদারির এই ভয়ঙ্কর অভ্যাসের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ান। দেবী দুর্গাও বিনা অস্ত্রে অসুর বধ করিতে পারেন নাই। পুলিশের প্রথম অস্ত্র জনগণের মনে সমীহ আদায় করিতে পারিবার ক্ষমতা। সেই অস্ত্রটি খোয়া গেলে তাঁহারা আর যুদ্ধ করিবেন কী ভাবে?

Advertisement

য ৎ কি ঞ্চি ৎ

লক্ষ বা কোটিতে মাপা যাবে না, অন্তত ট্রিলিয়ন চাই, মানে লক্ষ কোটি। ডিজিটাল দুনিয়ায় মোট কত ‘শুভ বিজয়া’ এল, সে হিসেব কষতে দিলে চিত্রগুপ্ত নির্ঘাত কলমখানি সিন্দুকে তুলে রাখতেন। সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষও এখন দিব্যি একখানি ত্রিনয়নওয়ালা মেসেজ পাঠিয়ে দিচ্ছেন। হয়তো কোনও কারণে তাঁর মোবাইলে বা ইমেলে নাম-ঠিকানা সেভ করা আছে, অতএব লট-এ শুভেচ্ছা চলে গেছে। কে বলতে পারে, মহিষাসুরও হয়তো মা দুর্গাকে ‘হ্যাপি বিজয়া’ পাঠিয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement