এবং বন্ধুভাগ্য। নরেন্দ্র মোদী ও বারাক ওবামা। প্যারিস, ৩০ নভেম্বর, ২০১৫। পিটিআই
রা ষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসনে রয়েছে পাঁচটি দেশ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং চিন। রাষ্ট্রপুঞ্জের জন্ম ১৯৪৫ সালে। তার পর সত্তর বছর কেটে গেছে। অন্য অনেক দেশ এখন অর্থনৈতিক অথবা সামরিক শক্তির বিচারে এই দেশগুলির সমকক্ষ হওয়ার দাবিদার। এদের মধ্যে জাপান, জার্মানি, ভারত এবং ব্রাজিল অন্যদের তুলনায় এগিয়ে। এরা ‘জি-৪’ নামে একটি জোট তৈরি করেছে নিরাপত্তা পরিষদের পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করতে। অনেক দেশই এই জোটকে সমর্থন জানিয়েছে আর অনেকে তীব্র বিরোধিতা করেছে। নতুন করে কোন কোন দেশ স্থায়ী আসন পাবে, তা ঠিক করার উপযুক্ত সময় হত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিপর্বে। কিন্তু কেউই অত দিন অপেক্ষা করতে রাজি নয়।
তাই রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার ৬৯-তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে একটি দলিল গৃহীত হয়েছে, যার ভিত্তিতে সদস্য দেশগুলি ৭০-তম অধিবেশনে এই বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবে। আমরা বেশ কিছু দিন ধরেই বিভিন্ন সম্মেলনে আমাদের দাবি জানিয়ে এসেছি। গোড়ার দিকে অনেকের আপত্তি ছিল। সেই আপত্তি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেছে। পরিস্থিতি অনুকূল বুঝে প্রধানমন্ত্রী মোদী সাধারণ সভায় আবেদন রেখেছেন বিষয়টি এই অধিবেশনেই চূড়ান্ত করার জন্য।
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা এখন পনেরো। স্থায়ী সদস্যদের বাদ দিয়ে বাকিরা নির্বাচিত হন দু’বছরের জন্য। পরে আবার ফিরে আসতে পারেন। ভারত এ ভাবে সাত বার সদস্য হয়েছে। পরিষদে সিদ্ধান্ত নিতে হলে নয় সদস্যের অনুমোদন লাগে। কিন্তু স্থায়ী সদস্যদের বিশেষ ক্ষমতা আছে যে কোনও সিদ্ধান্ত একক ভাবে বাতিল করে দেওয়ার, যাকে বলা হয় ভিটো পাওয়ার। স্থায়ী সদস্যরা বারে বারেই এই বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে নিজেদের স্বার্থে।
এই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে আমরা কেন চাইছি নিজেরাও এই ক্ষমতা ভোগ করতে? এটা কি আমাদের বাস্তবমুখিতার, পরিণত বুদ্ধির পরিচয়? শেষমেষ আমরা পারলাম নেহরু জমানার আবেগপূর্ণ, অবাস্তব নীতি বর্জন করতে? রাষ্ট্রপুঞ্জের গঠনের সময় অনেকেই চাননি যে স্থায়ী সদস্যপদ থাকুক বা ভিটো পাওয়ার থাকুক। যুদ্ধবিজয়ী মিত্রশক্তি সাফ জানিয়ে দেয় যে এই ক্ষমতা না থাকলে তাঁরা সদস্য হবেন না। আমেরিকার তরফে বলা হয় 'এক দিনের জন্যও নয়'। অন্যরা বাধ্য হন মেনে নিতে। পরে অনেক চেষ্টা হয়েছে পরিষদের গনতন্ত্রীকরণের। বুত্রোস গালি ও কোফি আন্নান দু’জনেই উদ্যোগ নেন। কোনও চেষ্টাই সফল হয়নি। কাজেই কোনও মৌলিক পরিবর্তনের আশায় প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়া অনর্থক। কিন্তু স্থায়ী সদস্য হয়ে আমাদের লাভ?
নেহরু জমানার কথা যখন উঠলই তখন একটা গল্প না বললেই নয়। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি ওয়াশিংটন পোস্টে খবর বেরোয় যে ভারতের স্থায়ী সদস্য হওয়ার আমেরিকান প্রস্তাব নেহরু খারিজ করে দিয়েছেন। পার্লামেন্টে প্রশ্ন ওঠে। উত্তরে নেহরু বলেন, এ ধরনের কোনও সরকারি বা বেসরকারি প্রস্তাব ভারত পায়নি। বিতর্ক কিন্তু থেমে যায়নি। ২০০৪ সালে প্রকাশিত নেহরু: দি ইনভেনশন অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে লেখক শশী তারুর আবার জল্পনা উস্কে দেন। প্রস্তাব পেলে কি নেহরু সম্মত হতেন? সে প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়ে যাননি।
আজ ভারত সরকারের মূল লক্ষ্য হল অর্থনীতির বৃদ্ধির হার বজায় রাখা। এর জন্য দরকার দেশি ও বিদেশি লগ্নি। এর জন্য দরকার ‘ভারতে নির্মাণ’ উদ্যোগের সাফল্য। এও দরকার যে বিশ্বে শান্তি বজায় থাকবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলবে নির্বিঘ্নে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য না হলে আমাদের কিছুই করার থাকবে না? আর হলে কি আমরা বিশ্বশান্তি সুনিশ্চিত করতে পারব? বিগত সত্তর বছরের ইতিহাস কিন্তু সে কথা বলে না। সর্ব বলে বলীয়ান হয়েও পরিষদ ভিয়েতনামের যুদ্ধ থামাতে পারেনি। আফগানিস্তানে রাশিয়ার আক্রমণ থামাতে পারেনি। প্যালেস্টাইন সমস্যার সমাধানে কোনও পদক্ষেপ করতে পারেনি আমেরিকার বিরোধিতায়। কসোভোতে বাধ্য হয়েছে ‘নেটো’র আক্রমণকে স্বীকৃতি দিতে। রোয়ান্ডায় হস্তক্ষেপ করতে পারেনি যথেষ্ট কারণ থাকা সত্ত্বেও।
নিরাপত্তা পরিষদকে চূড়ান্ত অপমান সহ্য করতে হয়েছে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময়। সাদ্দাম হুসেন কুয়েত আক্রমণ করায় আমেরিকা বোঝে যে, পশ্চিম এশিয়ার তেলের ভাণ্ডার বিপন্ন। ইরাককে আক্রমণ করতে হবে, অজুহাত চাই। আমেরিকা বলে ইরাকের হাতে এমন অস্ত্র আছে যা পৃথিবী ধ্বংস করতে পারে। কেউ বিশ্বাস করেনি। ইন্সপেক্টর পাঠানো হয় ইরাকে। তারা কোনও অস্ত্রের সন্ধান পায় না। ফ্রান্স ও রাশিয়া যুদ্ধের বিরোধিতা করে। আমেরিকা ঘোষণা করে দেয় যে পরিষদ রাজি হোক বা না হোক, তারা যুদ্ধে যাবেই। পরিষদ তখন নিজের সম্মান বাঁচাতে রাজি হয় আমেরিকার প্রস্তাবে।
এই রকম একটি সভার সদস্য হওয়ার জন্য আমরা পেট্রোল পোড়াচ্ছি কেন? আমাদের রফতানি বাড়বে? দেশে বিনিয়োগ করা সহজ হবে? প্রতি বছর পনেরো লক্ষ চাকরি দেওয়া সম্ভব হবে? ১৯৮০-র দশক থেকে চিনের অর্থনীতি যে ভাবে বেড়েছে, তা কি চিন ১৯৭১ সালে স্থায়ী সদস্য হওয়ার ফল? সে কথা কেউ বলে না। তবে এ কথা অনেকেই বলেন যে, চিনের সঙ্গে আমাদের তফাত আছে। বলেন, ভারত যদি জগৎসভার শ্রেষ্ঠ আসনে বসে, তা হলে দেশবাসী গর্বিত বোধ করবে। উৎফুল্ল হবে। একজোট হয়ে কাজ করার উৎসাহ বাড়বে। সংসদের ভিতরে ও বাইরে সরকারের ‘অহেতুক’ ও ‘অযৌক্তিক’ বিরোধিতা কমবে। সরকার বেশি সময় দিতে পারবে উন্নয়নের কাজে। শুধু জিএসটি বিল পাস হলে যদি আর্থিক বৃদ্ধির হার এক-দেড় পারসেন্ট বেড়ে যায়, তা হলে এই সাফল্যে আরও দুই পারসেন্ট যোগ হওয়াই কি স্বাভাবিক নয়?
তাই যদি হয়, তা হলে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ ‘জি-৪’-এর সবাই যে সাফল্য পাবে তা নয়। ইন্টারভিউয়ে সবচেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে কী করে? প্যারিসে আমরা বলেছি ‘মাথাপিছু’ নিঃসরণের কথা। এখানে আমরা জোর দেব ‘মোট’ আয় ও তার বৃদ্ধির হারের উপর। দেশে তিরিশ কোটি লোকের ঘরে বিদ্যুৎ নেই, সে কথা আর নয়। বরঞ্চ দেশে ক’জন কোটিপতি আছেন, তাঁদের মধ্যে ক’জন ব্রিটেনের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, সে প্রসঙ্গ তোলা যেতে পারে। আমদানি, রফতানি, বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার, সামরিক বাজেট ইত্যাদি নিয়ে তো বলতেই হবে। বিদেশি লগ্নিতে কোনও বাধা আছে কি না, কটা বিদেশি কোম্পানি এল, কটা বিদেশি এনজিও গেল, সবই জেনে রাখা দরকার। দেশে কত পরিমাণ সৌরশক্তি আছে, শুধু তাই নয়, আরও কত হবে তার হিসেবও যেন পকেটে থাকে। মানবাধিকার আর অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে জলঘোলা করার চেষ্টা হতে পারে, তাই উচিত মতো জবাব তৈরি রাখতে হবে।
ভূতপূর্ব মুখ্য সচিব, পশ্চিমবঙ্গ সরকার