এ বার কাজের পালা। জয় ঘোষণার পরে। ইয়াঙ্গন, ১৩ নভেম্বর। ছবি: এএফপি।
পঁচিশ বছর আগে সামরিক শাসকদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে রূপকথার জয় ছিনিয়ে আনলেও সে বারে শেষ রক্ষা করতে পারেননি আউং সান সু চি। এ বারে তিনি সফল। জাতীয় সংসদের অধিকাংশ আসন সত্তর বছর বয়সি সু চি-র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি(এনএলডি)-র দখলে। আন্তর্জাতিক চাপ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি— সব মিলিয়ে হয়তো বছর ঘুরলে এনএলডি-র হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া ছাড়া এখন মায়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের গত্যন্তর নেই। অথচ এর পরেও সু চি আপাতত দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবেন না।
সাংবিধানিক অন্তরায়
২০০৮-এ সাইক্লোন নার্গিস-এ মায়ানমারে যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও জীবনহানি ঘটে, তার ফলেই হোক বা অন্যান্য কারণেই হোক, ওই বছরই সে দেশে রাজনৈতিক পর্বান্তর প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটে। সেনাকর্তাদের নতুন সংবিধানের কথাও ভাবতে হয়। এই সংবিধানে গণতন্ত্রীকরণের রূপরেখা থাকলেও তার ৫৯(এফ) ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনও ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী অথবা কোনও সন্তান ভিনদেশের নাগরিক হলে সেই ব্যক্তি দেশের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। সু চি-র প্রয়াত স্বামী বা তাঁর সন্তানরা যে ব্রিটিশ নাগরিক! সু চি-র পথের কাঁটা সেখানেই।
মায়ানমারের ৫ কোটি ৪০ লক্ষ নাগরিকের মধ্যে মোট ভোটদাতা ছিলেন ৩ কোটি ২০ লক্ষের মতো। সেনাবাহিনীর মদত সত্ত্বেও ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসড পি) ভোটে আদৌ সুবিধে করতে পারেনি। তার পরেও অবশ্য সেনাকর্তাদের তেমন দুশ্চিন্তার কারণ থাকছে না। জাতীয় সংসদে মোট ৪৯৮টি আসনের (নিম্ন কক্ষে ৩৩০ ও উচ্চ কক্ষে ১৬৮) পঁচিশ শতাংশই সেনা প্রতিনিধিদের জন্য সংরক্ষিত। তা ছাড়া, মন্ত্রিসভার বাকি সদস্যেরা স্বাভাবিক নিয়মে মনোনীত হলেও দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সীমানা-সম্পর্কিত মন্ত্রী সেনাকর্তাদের দ্বারাই মনোনীত হবেন। অতএব, ১৯৯০-এর তুলনায় (যখন শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি) এ বারে সেনা-স্বার্থ অনেক সুরক্ষিত। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গিয়ে এখনই সংবিধান সংশোধন সম্ভব কি না অথবা এনএলডি নেতৃত্ব সে পথে এখনই হাঁটতে আগ্রহী কি না, সে কথা আলাদা।
নতুন সংবিধান রচিত হওয়ার পরে ২০১০-এ প্রথম বার ভোট হলেও এনএলডি তা বয়কট করেছিল। সেই সুবাদে সেনা-ঘনিষ্ঠ ইউএসডিপি-র নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অসুবিধা হয়নি। ২০১১-তে প্রেসিডেন্ট থাইন সেইন-এর নেতৃত্বে এক আধা-সামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হলেও প্রশাসনের চাবিকাঠি ছিল সেনাকর্তাদের হাতেই। পরের বছরের উপনির্বাচনে এনএলডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ৪৫ আসনের ৪৩টিই তাদের ঝুলিতে এসেছিল। জনসমক্ষে না আসতে পারলেও সু চি-র জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি, বরং তা আরও ঊর্ধ্বগামী হয়। এই জয়ের প্রেক্ষিতেই পশ্চিমের বহু দেশ মায়ানমারের উপর থেকে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম বহির্বিশ্বের সঙ্গে মায়ানমারের যোগাযোগ গড়ে উঠতে থাকে।
রাজনৈতিক অন্তরায়
দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা প্রায় তিন দশক বন্দিত্বের শেষে মুক্তির পরে তাঁর দেশের রাজনীতিতে অনেকটাই পরিবর্তন এনেছিলেন। দীর্ঘ কালের বর্ণবিদ্বেষী নীতি থেকে সরতে শুরু করেছিল তাঁর দেশ। দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি থাকবার পরে আউং সান সু চি কি পারবেন মায়ানমারে তেমন কিছু ঘটাতে? এ ব্যাপারে সন্দেহ কিন্তু থেকেই যায়।
সন্দেহের কারণ, গণতন্ত্রের পথে নতুন পা-ফেলা দেশটির সামনে নানান চ্যালেঞ্জ। কঠিনতম চ্যালেঞ্জ বোধহয় দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বিভিন্ন জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্তি সুনিশ্চিত করতে সর্বজনীন গণতন্ত্রের (ইনক্লুসিভ ডেমোক্র্যাসি) পথ প্রশস্ত করা। বর্মন জনগোষ্ঠীর মানুষ মায়ানমারে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শ’খানেকের বেশি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় চল্লিশ শতাংশ। এই কারণেই সু চি-র প্রয়াত পিতৃদেব জেনারেল আউং সান দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ১৯৪৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বেশ কয়েকটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ‘পাংলং বোঝাপড়া’ তৈরি করেছিলেন। এই চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীগুলির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তো স্বীকৃত হয়েছিলই, ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর স্বাধীন ব্রহ্মদেশ থেকে কাগজে-কলমে তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার স্বাধীনতাও ছিল।
আউং সান অচিরেই খুন হয়েছিলেন। অন্য দিকে, পাংলং চুক্তির পনেরো বছরের মধ্যেই ১৯৬২-তে জেনারেল নে উইন-এর নেতৃত্বে সেনাশাসন শুরু হয়, পাঁচ দশক ধরে তা অনেক সুদৃঢ় হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলির অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়। তাদের ক্ষোভ বাড়ে। কোনও কোনও জনগোষ্ঠীর কিছু সদস্য স্বাধিকারের দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নেয়।
এ বার ৮ নভেম্বরের ভোটের কয়েক দিন আগে ১৫ অক্টোবর ‘দেশব্যাপী অস্ত্রবিরতি’ সমঝোতা হয় বটে, কিন্তু নিন্দুকেরা বলেন যে, এই সমঝোতায় যে আটটি গোষ্ঠী শরিক হয়েছে, তার মধ্যে কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন এবং রেস্টোরেশন কাউন্সিল অব শান স্টেট বাদে বাকিগুলি তেমন প্রভাবশালীই নয়। তাদের সঙ্গে ‘অস্ত্রবিরতি’ নিরর্থক, লোকদেখানো।
রোহিঙ্গিয়া প্রসঙ্গ
মুসলমানরা মায়ানমারের মোট জনসংখ্যার অন্তত চার থেকে পাঁচ শতাংশের মতো হলেও এই ভোটে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। বস্তুত সমাজ ও রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অনেকে মনে করেন যে, এই মুসলমানরা দেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। কর্তৃত্বশালী ভিক্ষু উইরাথু এবং তাঁর লাখ দশেক সমর্থকের ‘মা বা থা’ (‘কমিটি টু প্রোটেক্ট রেস অ্যান্ড রিলিজিয়ন’) ইউএসডিপি-কেই সমর্থন করে। এনএলডি-কে এই সংগঠন ‘মুসলমানদের দল’ বলে অভিহিত করে থাকে।
মায়ানমারে দীর্ঘদিন অধিবাসী (অধিকাংশ) রোহিঙ্গিয়ারা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রথম ভোটে অংশ নিতে পারলেন না। উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালের নাগরিকতা আইনে দেশের বেশির ভাগ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা স্বীকার করা হলেও, ওই আইনে রোহিঙ্গিয়াদের স্বীকৃতি মেলেনি। গত জানুয়ারিতেই এদের অনেকের কাছে থাকা সাদা রঙের ‘অস্থায়ী’ পরিচয়পত্র সরকারি নির্দেশে বাতিল বলে গণ্য হয়, বন্ধ হয় ভোটে অংশ নেওয়ার পথও। তার আগেই এই সম্প্রদায়ের লোকেরা একাধিক বার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর আক্রমণের নিশানা হয়েছেন। আক্রান্ত রোহিঙ্গিয়ারা উদ্বাস্তু হয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে গেছেন। প্রাণের দায়ে, পেটের দায়ে জীর্ণ ডিঙিতে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে চেষ্টা করে অনেকের সলিলসমাধি হয়েছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তাইল্যান্ডে বেশ কিছু রোহিঙ্গিয়ার অস্থায়ী আশ্রয় মিললেও তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। অনিশ্চিত ভারতে আগত হাজার পঞ্চাশেক রোহিঙ্গিয়ার ভবিষ্যৎও। বাংলাদেশে কিছু রোহিঙ্গিয়া ‘শরণার্থী’ স্বীকৃতি পেলেও রোহিঙ্গিয়ারা কার্যত আজ এক রাষ্ট্রবিহীন গোষ্ঠী। দীর্ঘকালের বাস সত্ত্বেও মায়ানমারেই তাঁরা আজ ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’। অনেকে আজ মানুষ পাচার চক্র ও দালালদের হাতের পুতুল।
আজ শুধু মায়ানমার নয়, গোটা বিশ্ব সু চি-র নেতৃত্বের সূর্যোদয়ের দিকে তাকিয়ে। অথচ ভোটের প্রচারে তিনি রোহিঙ্গিয়া প্রশ্নে নীরব থেকেছেন। কিন্তু দেশবাসীর গণতন্ত্রের স্বপ্নপূরণে নেতৃত্ব তাঁকেই দিতে হবে। গণতন্ত্রের পথে চলতে গিয়ে পা পিছলে নতুন মায়ানমার যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের ফাঁদে না পড়ে, দেখতে হবে তাঁকেই। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এক, আর সমস্ত দেশবাসীর প্রশাসক হয়ে ওঠা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সু চি সমগ্র মায়ানমারবাসীর নেতা হয়ে উঠতে পারলে তাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, অন্য দিকে তাঁর ব্যর্থতা মায়ানমারকে নতুন বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপকের সামনের পথটি তাই এখনও বন্ধুর।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক