প্রবন্ধ ১

এই হিংসার পিছনে যে অর্থনীতি

আমরা গাছ দেখি, অরণ্য দেখি না। যে লুম্পেন রাজত্ব পশ্চিমবঙ্গে কায়েম হয়েছে, তার পিছনে আছে লুম্পেন পুঁজির কারবার। বেআইনি লগ্নি সংস্থার কেলেঙ্কারি আর রাজনীতির মঞ্চে এই তাণ্ডব সেই একই উৎস থেকে সঞ্জাত।আমাদের বিস্ময়বোধ যে কত প্রবল, রাজ্যে ঘটে চলা পুনরাবৃত্ত অপকর্মগুলিতে তার পরিচয় মিলেছে। কখনও কামদুনির মতো ধর্ষণকাণ্ডের বীভৎসতায়, কখনও বা তোলাবাজি প্রসূত হিংসার নৃশংসতায় বা সিন্ডিকেট-রাজের উন্মত্ততায়, কখনও আবার সাম্প্রতিক পুরনির্বাচনের বর্বরতায় স্তম্ভিত আমাদের বিস্ময়ের শেষ নেই।

Advertisement

অসীম চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০১৫ ০০:০১
Share:

পুলিশ ওরফে দর্শক। বিধাননগর পুরসভার নির্বাচন, ৩ অক্টোবর। ছবি: শৌভিক দে।

আমাদের বিস্ময়বোধ যে কত প্রবল, রাজ্যে ঘটে চলা পুনরাবৃত্ত অপকর্মগুলিতে তার পরিচয় মিলেছে। কখনও কামদুনির মতো ধর্ষণকাণ্ডের বীভৎসতায়, কখনও বা তোলাবাজি প্রসূত হিংসার নৃশংসতায় বা সিন্ডিকেট-রাজের উন্মত্ততায়, কখনও আবার সাম্প্রতিক পুরনির্বাচনের বর্বরতায় স্তম্ভিত আমাদের বিস্ময়ের শেষ নেই। অথচ পুনরাবৃত্ত এই অপকর্মগুলির উৎস যে রাজ্যে বিদ্যমান লুম্পেন রাজত্ব সে বিষয়ে আমাদের আগ্রহ আর একটু গভীর হলে অবশ্যই এই রাজত্ব নির্মাণে ও বিকাশে বেআইনি লগ্নি সংস্থার— তথাকথিত চিটফান্ড-এর— ভূমিকা জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। আক্ষেপের কথা, আমরা প্রায়শই বিচ্ছিন্ন বৃক্ষগুলিকে দেখি, কিন্তু এই বৃক্ষরাজির সমাহারে সৃষ্ট অরণ্য আমাদের চোখে পড়ে না।

Advertisement

অথচ রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল ও নেতানেত্রীদের সঙ্গে বেআইনি লগ্নি সংস্থাগুলির যোগাযোগ যে কত নিবিড় ও কত গভীর, তা এখন উন্মোচিত। শাসক দলের এক সাংসদ জেলে, মুখ্যমন্ত্রীর দাক্ষিণ্য সত্ত্বেও এক মন্ত্রী জেলবন্দি, শাসক দলের একগুচ্ছ কেষ্টবিষ্টু জামিনে খালাস, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না হলে আরও কত নেতা-মন্ত্রী ধরা পড়তেন কে জানে। হিমালয়ের কোলে গভীর রাতের নির্জনতায় ডেলো বাংলোর বৈঠকের কথা সর্বজনবিদিত। এই সংস্থাগুলির প্রত্যক্ষ মদতেই যে শাসক দল ক্ষমতাসীন হয়েছে, এই সত্য এখন আর কোনও গোপন কথা নয়। রাজ্যে ক্রমবর্ধমান মাৎস্যন্যায়কে বোঝার জন্য তাই বেআইনি লগ্নি সংস্থার রহস্য বোঝা জরুরি।

অনেকেই ভেবেছিলেন জনস্মৃতি স্বল্পায়ু হওয়ার কারণে চিটফান্ড নিয়ে ‘হুজুগ’ অচিরেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। কিন্তু যায়নি। রাজনৈতিক তাৎপর্য ছাড়াও এর কারণ হল, এই সংস্থাগুলির প্রতারণার আকার ও প্রকার। স্পষ্ট করে বলা দরকার, প্রতারিত আমানতকারীর সংখ্যা নব্বই লক্ষেরও বেশি। শুধু সারদাকাণ্ডে, যেখানে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ, সরকারি মতে ২৪০০ কোটি টাকা (আসলে আরও বেশি), সেখানেই আমানতকারীর সংখ্যা, শ্যামল সেন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ লক্ষের বেশি। রোজভ্যালি (৯৭৬০০ কোটি টাকা), এমপিএস (১০০০০ কোটি) বা অ্যালকেমিস্ট সারদার থেকে অনেক বড়। তাই মোট আমানতকারীর সংখ্যা নব্বই লক্ষের বেশি হওয়া স্বাভাবিক। গড়ে পাঁচ জনের পরিবার ধরলে রাজ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ এই প্রতারণায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ যাবত্‌ আত্মঘাতী হয়েছেন ১২৪ জন। ঘটনা হল, টাকা ফেরত পাওয়ার আন্দোলন বন্ধ হলে বা টাকা ফেরতের আশা জলাঞ্জলি দিতে হলে রাজ্য জুড়ে অপ্রতিরোধ্য মৃত্যুমিছিল শুরু হবে।

Advertisement

বেআইনি লগ্নি সংস্থার সংখ্যা নিয়েও অনেক ধোঁয়াশা। এই আলোচনায় প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটি সংস্থার নাম আসে, তাদের মধ্যে গোটা পঁচিশেকের নাম বেশি আসে। অথচ হাইকোর্টেই নথিভুক্ত হয়েছে ৫৭২টি সংস্থা, সুনির্দিষ্ট এফআইআর হয়েছে ৫২৭টির নামে। আসলে নিত্যনতুন সংস্থা বাজারে নেমে পড়েছে এবং এদের অনেকেই পনেরো-কুড়ি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে হাওয়া হয়ে গিয়েছে। এই দুর্নীতি অভূতপূর্ব। সাধারণ দুর্নীতিকাণ্ডে প্রতারিত হন সচ্ছল মানুষজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রতারিতদের আশি শতাংশই সমাজের সর্বনিম্ন স্তরের শ্রমজীবী মানুষ: মুটে, মজুর, রিকশা-ভ্যান-ঠেলা চালক, রাস্তার সবজিওয়ালা, গৃহপরিচারিকা, রাঁধুনি, ইত্যাদি। এই অতি গরিব মানুষদের টাকা মেরে প্রতারণার কারবারিদের এত রমরমা এবং তাদের মাধ্যমে শাসকদের মেলা-খেলা-উত্‌সব, মোচ্ছব, নির্বাচনী প্রচারের জাঁকজমক, বিভিন্ন ধরনের অনুদান, বাহুবলী তোষণ মহাসমারোহে চলেছে।

অথচ এক দিকে লক্ষ লক্ষ আমানতকারী সর্বস্বান্ত হয়েছেন, হাজার হাজার এজেন্ট ঘরছাড়া হয়েছেন, শতাধিক আমানতকারী-এজেন্ট আত্মঘাতী হয়েছেন, অন্য দিকে প্রতারক মালিকদের অধিকাংশই লুঠের টাকায় সুখে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই আশা করেছিলেন, এই অবস্থায় সস্তা জনবাদিতায় আচ্ছন্ন মুখ্যমন্ত্রী এই সর্বস্বান্ত হতদরিদ্র মানুষদের পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু মমতাদেবী মালিকদের পক্ষ নিয়েছেন। তিনটি ঘটনায় এই সত্য স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।

ঘটনা এক, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার যে দায় সংশ্লিষ্ট লগ্নি সংস্থার মালিকদের, শ্যামল সেন কমিশন গঠন করে জনসাধারণের টাকায় সেই দায় ঘাড়ে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মালিকদের পক্ষে দাঁড়ালেন। সুপ্রিম কোর্টে সিবিআই তদন্ত ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমিশন গুটিয়ে দিয়ে স্পষ্ট করে দিলেন এই সত্য যে, আমানতকারীদের রিলিফ দেওয়া নয়, বরং মালিকদের স্বার্থে সিবিআই তদন্ত যেন তেন প্রকারেণ আটকানোর তাগিদেই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ঘটনা দুই, সিবিআই তদন্ত আটকানোর লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন যে চিটফান্ড কাণ্ডের তদন্তভার গ্রহণের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা রাজ্যের রয়েছে এবং সেই জন্য সাততাড়াতাড়ি বিশেষ তদন্তকারী দল (‘সিট’) গঠন করেন তিনি, যার বিরুদ্ধে সত্য উন্মোচনের বদলে সত্য গোপন করা ও সাক্ষ্যপ্রমাণাদি লোপাট করার অভিযোগ উত্তরোত্তর প্রবল হয়ে ওঠে। অথচ সিবিআই তদন্তে সহযোগিতার প্রশ্নে তিনিই সামর্থ্যের অপ্রতুলতার কথা বলে সেই দায় এড়িয়ে যান। ঘটনা তিন, মালিকদের পক্ষে মুখ্যমন্ত্রীর সবচেয়ে উত্‌কট পদক্ষেপ হল, সিবিআই তদন্ত আটকানোর জন্য জনসাধারণের করের টাকায় বারো কোটি টাকা ব্যয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে রাজ্য সরকারের সিবিআই তদন্ত রোধের প্রাণপণ প্রয়াস। এই সব ঘটনা এবং তার অন্তর্নিহিত কার্যকারণসূত্রগুলি থেকেই উত্‌সারিত হয়েছে বেআইনি লগ্নি সংস্থাগুলির রাজনৈতিক তাত্‌পর্য। এখানে তিনটি কথা বলা জরুরি।

এক, বেআইনি লগ্নি কারবারের টাকাতেই শাসক দল রাজ্যে ক্ষমতাসীন হয়েছে, এ কথা যেমন সত্য, তেমনই মহাসত্য হল এটাই যে, রাজ্যে এখন যে লুম্পেন রাজত্ব কায়েম হয়েছে, তার অর্থনৈতিক ভিত্তি হল এই কারবারের লুম্পেন পুঁজি। উত্‌পাদনের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত আহরণ করে সনাতন পুঁজির বৃদ্ধি ঘটে, তা হল ‘ভার্টিকাল’ বা উল্লম্ব বৃদ্ধি। কিন্তু এই লুম্পেন পুঁজির ক্ষেত্রে উত্‌পাদনের কোনও গল্প নেই, আরও বেশি বেশি মানুষকে প্রতারণার আওতায় এনে এই পুঁজির বৃদ্ধি ঘটে— ‘হরাইজন্টাল’ বা অনুভূমিক বৃদ্ধি। কোনও উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরির ক্ষমতা এই পুঁজির নেই, এতে কোনও শিল্প গড়ে ওঠে না, শুধু বিলাসব্যসনে, ফাটকাবাজিতে, অনুদানের বদান্যতায় বা বাহুবলী পোষণে এই পুঁজি ব্যয়িত হয়। সেই কারণেই এই পুঁজি হল লুম্পেন পুঁজি। এই পুঁজিতে কামান দাগাই বিদ্যমান লুম্পেন রাজত্ব অবসানের আবশ্যিক শর্ত। অন্যথা, শুধু তোলাবাজি, মারদাঙ্গা, ধর্ষণ, সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে হাজার গর্জনও ফলদায়ী হবে না। গোড়া না কেটে আগা ছেঁটে লাভ নেই।

দুই, চিটফান্ড প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সিবিআই তদন্ত নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘টাকা কোথায় গেল, কার পকেটে গেল’ জানতে হবে, ‘এই টাকা উদ্ধার করে আমানতকারীদের ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা’ করতে হবে এবং প্রয়োজনে এর পশ্চাতে যে ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ রয়েছে তার উন্মোচন করতে হবে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না হলে এই ‘মানি ট্রেল’ শাসক দলের, এমনকী খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দরজায় পৌঁছে যেতেই পারে। সে ক্ষেত্রে যা যা ঘটবে, তার পরিণামে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা তো বটেই, তার অস্তিত্বই বিপন্ন হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী এই সত্য বোঝেন, সে কারণেই সিবিআই তদন্ত ধামাচাপা দিতে বা বন্ধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। সে চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি মোদীর প্রতি অনুকূল হয়ে ওঠেন, যে মোদীকে কোমরে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর কথা তিনি কিছু দিন আগেই ঘোষণা করেছিলেন। প্রথমে মোদী সাড়া দেননি, বিজেপি তখন রাজ্যে ক্ষমতার গন্ধে মশগুল ছিল। কিন্তু পুরনির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, এ রাজ্যে বামপন্থীরাই বিকল্প হবে, বিজেপি নয়। বিজেপির এই উপলব্ধি, কর্পোরেট পুঁজির দাবি মোতাবেক, মমতা-মোদীর সমঝোতাকে অনিবার্য করে তুলেছে, সিবিআই তদন্তও গতি হারিয়েছে।

তিন, পুঁজিবাদী সমাজ গঠনে ‘প্রাইমারি অ্যাকিউমুলেশন’-এর যে ভূমিকা, আমাদের লুম্পেন রাজত্ব কায়েম করার ক্ষেত্রে সেই ভূমিকা পালন করেছে লুম্পেন পুঁজি। এই জন্মচিহ্ন শাসক দলের কর্মকাণ্ডে ছাপ ফেলেছে। রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে চিটফান্ড পুঁজির সহায়তায় তৃণমূল কংগ্রেসের যে মেটামরফসিস, যার জোরে শীর্ণকায় উপদল সম টিএমসি হঠাৎ মেগা সংগঠনের নির্বাচনী প্রচারের জৌলুস অর্জন করে, এই বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা সেখানেই। অন্য রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পার্থক্য লক্ষ করা দরকার। অল্পবিস্তর সব দলেই বাহুবলীরা রয়েছে, কিন্তু অন্য কোনও দলের ক্ষেত্রে লুম্পেনদের হাতে এতটা নিয়ন্ত্রণ নেই, তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে যতটা আছে। তারই বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে রাজ্য রাজনীতিতে। আইনের শাসন বজায় রাখার প্রশ্নে গণতন্ত্রের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ এখানেই। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে বলা যায়, চিটফান্ডের রাজনৈতিক তাৎপর্য এই সব ঘটনাবলিতেই ক্রমান্বয়ে উন্মোচিত হয়ে চলেছে।

আশার কথা হল, মানুষজন এই মাৎস্যন্যায় মেনে নিচ্ছেন না। আইনের শাসনের বদলে মর্জির শাসন, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার পদদলিত করে গুন্ডাদের তাণ্ডব, সংবিধানের তোয়াক্কা না করে খেয়ালখুশির অনাচার, এ সবের বিরুদ্ধে জনসক্রিয়তা ক্রমদৃশ্যমান। আপাতত আলোকরেখা এটাই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement