জনসংখ্যার চাপে যখন দিল্লির নাভিশ্বাস উঠিতেছে, যখন শহরটিকে ছাঁটিয়া ছোট করা ভিন্ন নিস্তারের পথ নাই (‘অতি সামান্য হইল’, আবাপ সম্পাদকীয়, ২০ অগ্রহায়ণ), তখন কলিকাতাবাসী নতমস্তকে কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁহার দুই রক্ষাকর্তা, দুই মসিহাকে স্মরণ করিতে পারেন। প্রকৃতি তাঁহাদের ভিন্ন রূপে গড়িয়াছিল। প্রথম জনের মিতভাষিতা তাঁহার মুখনিঃসৃত বিরল বাক্যগুলিকেও সমাপ্ত করিতে দিত না। দ্বিতীয় জনের বাগ্বাহুল্যের সহিত তাল মিলাইয়া চলা মুশকিল। প্রথম জনের নিখুঁত পরিচ্ছদের সহিত দ্বিতীয় জনের যত্নলালিত যত্নহীনতার বৈপরীত্যও তীব্র। কিন্তু, কলিকাতা নামক মহানগর, এবং পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ রক্ষায় সেই দুই নেতা— জ্যোতি বসু ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— এক বিন্দুতে উপনীত হইয়াছিলেন। তাঁহাদের দূরদৃষ্টি সমস্যার কারণটিকে চিনিতে ভুল করে নাই। তাঁহারা বুঝিয়াছিলেন, শিল্পই সব অশান্তির মূল। শিল্প না থাকিলে চাকুরিও নাই, ব্যবসাও নাই। অর্থনীতিতে চিরশান্তি বিরাজ করিবে। ভিন্ রাজ্য হইতে কেহ শহরে আসিবেন না তো বটেই, যাঁহারা জন্মসূত্রে এই শহরের, তাঁহারাও পলাইবার পথ খুঁজিবেন। লোক না থাকিলে তাহার চাপও নাই, গাড়িও নাই, দূষণও নাই। আজ যখন দিল্লি কাঁদিতেছে, জ্যোতি বসু ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণেই কলিকাতার হাসি অক্ষয়।
পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করিতে তাঁহাদের অবদান অবিস্মরণীয়। শিল্প ধ্বংস করিবার কাজটি বিরোধীসত্তায় জ্যোতি বসুদের করিতে হইয়াছিল। মুখ্যমন্ত্রী হইয়াও তিনি অতীতবিস্মৃত হন নাই। ট্রেড ইউনিয়নের দাপটের মধ্যে হয়তো তিনি ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পদধ্বনি শুনিতেন। কম্পিউটারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তাঁহার নিকট হয়তো শ্রেণিসংগ্রাম ছিল। প্রতি বৎসর গ্রীষ্মে তিনি বিদেশ সফরে যাইতেন বটে, কিন্তু সেখানকার কোনও পুঁজি যাহাতে পথ ভুলিয়া পশ্চিমবঙ্গে না আসিয়া পড়ে, নিজের অটুট ঔদাসীন্যে তাহা নিশ্চিত করিতে কখনও ভোলেন নাই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ঐতিহ্য বহন করিতেছেন। দুর্জনের মুখ বন্ধ করিতে তিনি মাঝেমধ্যে শিল্পসম্মেলন করেন বটে, কিন্তু তাঁহার লৌহবাসরে যেন শিল্পের কালসর্প প্রবেশ না করে, তাহা নিশ্চিত করিতে কখনও ভোলেন নাই। তিনি শিল্পের জমি দেন না, সিন্ডিকেটের দাপট বজায় রাখেন, আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে ছোট ছেলেদের ছোট ভুলকে ধর্তব্য জ্ঞান করেন না। শিল্পের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য রাজ্যের পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ যে বিসর্জন দেওয়া চলে না, ঔচিত্যের এই বোধটিই তাঁহাকে বঙ্গবাসীর কৃতজ্ঞতাভাজন করিয়াছে।
এক হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মুখ্যমন্ত্রীকেও পশ্চিমবঙ্গ দেখিয়াছে। সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গের অচলায়তনে শিল্পের খোলা হাওয়া আনিতে চাহিয়াছেন। এমনই স্পর্ধা ও দুঃসাহস, তিনি ভাবিয়াছিলেন, বাঙালি বুঝি অর্থনীতির ছলনায় নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলিবে। ভাবিয়াছিলেন, রাজ্যে বড় কারখানা আসিলে কর্মসংস্থান হইবে, এবং তাহাতে রাজ্যবাসীর লাভ হইবে। বাঙালির শক্তিকে ছোট করিয়া দেখা যে কত ব়ড় ভুল, বুদ্ধদেববাবু টের পাইয়াছেন। বহু চেষ্টায় যে শিল্পকে রাজ্য হইতে কুলার বাতাস দিয়া বিতাড়ন করা হইয়াছে, তাহাকে ফিরাইয়া আনিবার অপচেষ্টা বাঙালি সহ্য করে নাই। টাকা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু নির্মল শ্বাসবায়ু চিরন্তন। বাঙালি পরিবেশের স্বার্থে শিল্প ছাড়িয়াছে। বুদ্ধদেববাবুকে সরাইয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। বাঙালি নিজের স্বার্থ বোঝে। এই বাংলার মাটিতে যে শিল্পাভিলাষী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্থান নাই, এই বাংলা যে জ্যোতি বসু আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, বাঙালি প্রমাণ করিয়া দিয়াছে। বঙ্গবাসীর সেই দূরদৃষ্টিই আজ কলিকাতাকে রক্ষা করিল।