সম্পাদকীয় ২

খাদ্য, কিন্তু দুর্লভ

ডালের দাম আকাশ ছুঁইবার পর তাহা রাজনীতিকদের আলোচ্যসূচিতে ঠাঁই পাইয়াছে। বিশেষত, বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে প্রশ্নটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। অনুমান করা চলে, নির্বাচন মিটিলে এবং ডালের দাম কোনও ক্রমে নামাইয়া আনিতে পারিলেই রাজনীতিকরা প্রসঙ্গান্তরে চলিয়া যাইবেন। এবং, মূল প্রশ্নগুলি যেমন অন্ধকারে ছিল, তেমনই থাকিয়া যাইবে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০১৫ ০০:০৩
Share:

ডালের দাম আকাশ ছুঁইবার পর তাহা রাজনীতিকদের আলোচ্যসূচিতে ঠাঁই পাইয়াছে। বিশেষত, বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে প্রশ্নটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। অনুমান করা চলে, নির্বাচন মিটিলে এবং ডালের দাম কোনও ক্রমে নামাইয়া আনিতে পারিলেই রাজনীতিকরা প্রসঙ্গান্তরে চলিয়া যাইবেন। এবং, মূল প্রশ্নগুলি যেমন অন্ধকারে ছিল, তেমনই থাকিয়া যাইবে। যাবতীয় অর্থনৈতিক উন্নতি, ভারত উদয়, ভারত নির্মাণ এবং ভারতে নির্মাণের যাবতীয় স্লোগান পার হইবার পরেও দেশের অধিকাংশ মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস এখনও ডাল— মাছ-মাংস দূরস্থান, তাঁহাদের পক্ষে নিয়মিত ডিম জোগাড় করাও দুষ্কর। এমন গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যের উৎপাদন কেন বছরের পর বছর কমিতেছে, সেই প্রশ্নটি রাজনীতিকরা করিবেন না। প্রশ্ন উঠিবে না, কেন গত পাঁচ দশকে মাথাপিছু ডালের জোগান অর্ধেক হইয়া গিয়াছে? মানুষ কেন ডাল কম খাইতেছেন, সেই প্রসঙ্গ উঠিলে প্রচলিত জবাবটি পাওয়া যাইবে— আর্থিক অবস্থার উন্নতির কারণে মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলাইয়াছে, এবং মানুষ প্রোটিনের উন্নততর উৎসের দিকে সরিয়া গিয়াছে। এই জবাবটি সমাজের উপর মহলের। যাঁহারা আর্থিক সিঁড়ির নীচের তলার অধিবাসী, তাঁহারা ডাল কিনিতে পারেন না বলিয়াই আর খান না। বর্তমান অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে ডাল তাঁহাদের আয়ত্তের বাইরে চলিয়া যায় নাই। কিলোগ্রামপ্রতি ১০০ টাকার ‘স্বাভাবিক’ দরও তাঁহাদের নাগালের বাহিরে।

Advertisement

অতএব, ডালের বর্তমান আকাশ ছোঁওয়া দাম নিয়ন্ত্রণে আনিলেই কাজ ফুরাইবে না। দাম কমাইতে কেন্দ্রীয় সরকার যে উদ্যোগ করিয়াছে, তাহা যথাযথ। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাইতে জোগান বাড়াইবার জন্য আমদানির পথে হাঁটা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। বৃষ্টির স্বল্পতার কারণে এই বৎসর ডালের উৎপাদন গত বৎসরের তুলনায় ১২ শতাংশ কমিয়াছে। জোগান কম থাকিবার প্রত্যাশায় বাজারে দাম বাড়িয়াছে। যথেষ্ট ডাল আমদানি করিলে এই সমস্যার সমাধান হইবে। প্রশ্ন উঠিতে পারে, ভারতে ঘাটতির সংবাদে আন্তর্জাতিক বাজারে যে ভাবে ডালের দাম বাড়িয়াছে, তাহাতে আমদানির পথে হাঁটা কি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হইবে? স্বল্পমেয়াদে আমদানি ভিন্ন উপায় নাই। তবে, তাহা সুস্থায়ী সমাধান নহে। বাজারের সংস্কারও জরুরি— অন্যায্য মজুতদারির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। কিন্তু, সব মিলাইয়া তাহাতে জোগান যেটুকু বাড়িবে, তাহা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ঘুচাইতে পারিবে না।

ডালকে যদি গরিব মানুষের পাতে পাকাপাকি ভাবে ফিরাইয়া আনিতে হয়, তবে তাহার উৎপাদন বৃদ্ধি ভিন্ন গতি নাই। যে জমি ডাল চাষের জন্য আদর্শ, সেখানেও কৃষক ভিন্নতর ফসল চাষ করিতেছেন। সেই চাষ অপেক্ষাকৃত ভাবে অধিক লাভজনক বলিয়াই। অতএব, ডাল চাষে ইনসেনটিভ বা অর্থনৈতিক প্রণোদনা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াইতে হইবে। গত দুই দশকে উৎপাদনশীলতার কার্যত কোনও অগ্রগতি হয় নাই। নেতারা নূতন সবুজ বিপ্লবের কথা বলিয়াছেন, কিন্তু মুখের কথা মাঠে প্রভাব ফেলিতে পারে নাই। তৃতীয়ত, কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করিতে হইবে। দুইটি ফসলের অন্তর্বর্তী সময়কালে ডাল চাষ করিলে যে জমির উর্বরতা বাড়ে, এই কথাটি কৃষকদের স্মরণ করাইয়া দেওয়া বিধেয়। অবশ্য, ভোটের দামামা থামিবার পরেও নেতাদের যদি গরিব মানুষের পুষ্টির প্রসঙ্গটি স্মরণে থাকে, তবেই এই কাজগুলি সম্ভব।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement