জা দু-কার্পেট তৈরি করতে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা জরুরি। বছর পাঁচেক আগে সলমন রুশদি এক বার বলেছিলেন, উপন্যাসে আরব্য রজনীর উড়ন্ত কার্পেট আনা তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু কত ফুট ওপর দিয়ে, হেলিকপ্টার বা প্লেনের সঙ্গে ধাক্কা না খেয়ে কী ভাবে কার্পেট ওড়ানো উচিত সেটাই ভেবে উঠতে পারছেন না।
সদ্য বেরিয়েছে তাঁর দ্বাদশ উপন্যাস: টু ইয়ার্স এইট মান্থস অ্যান্ড টোয়েন্টি এইট নাইটস। হাজার এক রাত ধরে নিউ ইয়র্ক থেকে লাতিন আমেরিকা, ইরাক, ইরান সর্বত্র তুমুল বিপর্যয়। কেউ মাটি থেকে তিন ফুট ওপরে উঠে ঝুলে থাকে, কেউ বা নীচে ডেবে যায়। বড় বড় জলচর দানব নদীতে ভেসে উঠে আস্ত জাহাজ গিলে খায়। জিন-রাজকন্যা দুনিয়া উড়ন্ত কার্পেটে এসে নিউ ইয়র্কের এক ফ্ল্যাটবাড়িতে জেরোনিমো মেঞ্জেস নামে এক মালির খোঁজ করে। বাসিন্দারা বলে, এক তলায়। ‘এই কারণেই কার্পেটে চড়ে আসি না। পজিশনিং সিস্টেমটা ঠিকঠাক থাকে না,’ রাগে গজগজ করে দুনিয়া।
আরব্য রজনী অবশ্য তাঁর হারুন অ্যান্ড দ্য সি অব স্টোরিজ ইত্যাদি অনেক লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু এই নতুন উপন্যাস শুধু সহস্র এক রজনীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নয়। ফার্সি উপকথা আমির হামজা, ভলতেয়ার থেকে শোপেনআওয়ার সবাইকে নিয়ে রুশদির নতুন উপন্যাস যেন বেঠিক রাজনীতি বা পলিটিকালি ইনকারেক্টনেস-এর মহোৎসব। জিন, পরি, হুরিদের জগৎ এত দিন আলাদা ছিল, আচমকা সেখানে ভাল বনাম মন্দের লড়াই, তার ঢেউ আছড়ে পড়ছে পৃথিবীতেও। ঝড়, বিদ্যুৎ আর বজ্রপাতে তছনছ পৃথিবী, এসেছে অদ্ভুত সময়। মানুষ মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিন ফুট ওপরে, লেখকের সঙ্গে লেখা, কারণের সঙ্গে কার্য, শব্দের সঙ্গে অর্থ, সবই বিচ্ছিন্ন। ধনী-গরিব, স্বামী-স্ত্রী সবাই বিচ্ছিন্নতার নতুন মহামারীর শিকার। আগে বলা হত, ব্যক্তিস্বাধীনতাই সব। এখন বাচ্চাদেরও রিয়ালিটি শো-তে নিয়ে যাওয়া হয়, তিন মিনিটের খ্যাতির মোহে তাদের ব্যক্তিজীবন ছিঁড়েখুড়ে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গে ঝুলতে থাকে। লোকে সময়টাকে বলছে, স্ট্রেঞ্জনেস! সমাজবিজ্ঞানী এবং জাদুবাস্তবতার লেখকরা আবার ভুল ধরিয়ে দিচ্ছেন, ‘অদ্ভুত একটা নয়, অনেক। ফলে বহুবচন। স্ট্রেঞ্জনেসেস!’ মহামারীটা এশিয়া বা আফ্রিকা থেকে ছড়াচ্ছে না তো? মার খাওয়ার ভয়ে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় এশীয়, আফ্রিকান ট্যাক্সি ড্রাইভারেরা গাড়ির গায়ে পোস্টার লটকেছেন, ‘আমি অদ্ভুত নই। স্বাভাবিকতাই মার্কিন জীবন।’ ঝড়ে এক মার্কিন ধনকুবেরের বাগানবাড়ি বিধ্বস্ত। শিকড়গুলি আকাশে উঁচিয়ে, মাটিতে ফুলপাতার জঙ্গল। এস্টেটের দাড়িওয়ালা ব্রিটিশ ম্যানেজার পর দিন সকালে সেই বাগান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন, ‘ঠিক যেন কমিউনিজমের পতনের পর কারণ খুঁজতে নেমেছেন কার্ল মার্ক্স।’
কিন্তু রুশদি তো অদ্ভুততন্ত্রে আচ্ছন্ন দুই মেরুর কথা বলে থেমে যাওয়ার বান্দা নন। তাঁর জিন-রাজকন্যা তাই তৃতীয় একটি দেশের গল্প শোনায়। সেখানে সদ্য ভোটে জিতে এক জন রাজা হয়েছে। রাজার আদেশ, এ বার সবাইকে যন্ত্রে কাজ করতে হবে। যন্ত্রটির মহিমা অপার। বাড়িঘর, হাসপাতাল, কলকারখানা, সব ঢুকে যায়। চাষিরা লাঙল কাঁধে, মজুরেরা বেলচা হাতে আসে, তারাও সবসুদ্ধ যন্ত্রস্থ হয়। আগ্রহ চেপে রাখতে না পেরে এক বোকা এক দিন জিজ্ঞেস করেও ফেলল, এত বড় যন্ত্রে কী তৈরি হবে? ওভারসিয়ারের উত্তর, ‘ভবিষ্যৎ। সম্মান, মহিমা, গরিমা এগুলিই আমাদের প্রোডাক্ট।’ প্রায় সাত বছর বাদে উপন্যাস লিখে সলমন রুশদি বুঝিয়ে দিলেন, কেন তিনি আজও ভারতীয় সাহিত্যে জাদু-বাস্তবতার মাস্টার ব্লাস্টার!
বছর তিনেক আগে বেরিয়েছিল তাঁর জোসেফ অ্যান্টন। ফতোয়ার দিনগুলিতে ওই নামেই লুকিয়েছিলেন রুশদি, তা নিয়েই স্মৃতিকথা। খাজা মহম্মদ দিন খিলাকি দেহলভির পৌত্র সেখানে রোমন্থন করেছিলেন,‘লেখক সঠিক নামেই যুদ্ধে গিয়েছিল।’ খাজা মহম্মদের কেমব্রিজ-পাশ ব্যারিস্টার পুত্র আনিস আহমেদ দ্বাদশ শতকের আরব দার্শনিক ইবন রুশ্দ-এর ভক্ত ছিলেন। ইবন রুশ্দ গ্রিক থেকে আরবি ভাষায় পুরো আরিস্ততল অনুবাদ করেছিলেন। সলমনের বাবা আনিস তাই নিজের নাম বদলে রেখেছিলেন আনিস রুশদি।
এই অদ্ভুত সময়ের উৎস কবরে ধুলো বনে-যাওয়া দুই কঙ্কাল। এক জন ইবন রুশ্দ, অন্য জন তাঁর প্রতিপক্ষ দার্শনিক আলি গজলি। ইবন কার্যকারণ, যুক্তির কথা বলতেন। গজলি ভাবতেন, ঈশ্বরের ইচ্ছাই সব। জীবদ্দশায় গজলি এক দিন বোতলবন্দি জিন জমরুদ শাহকে মুক্তি দিয়েছিলেন। জমরুদের চেহারা স্বভাব ভয়ঙ্কর, সে প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, ‘বান্দা হাজির। কী করব?’ গজলি জানালেন, পরে বলব। মৃত্যুর কয়েক সহস্রাব্দ পরে তিনি সেই জিনকে ডেকে পাঠালেন, ‘মানুষকে ভয় দেখাও। ভয় পেয়ে সবাই ঈশ্বরের শরণ নেবে।’ জিন তত দিনে একটু-আধটু দর্শন পড়েছে। সে জিজ্ঞেস করল, ‘সব কিছুর যদি কার্যকারণ থাকে, ঈশ্বরের কারণ কী? তিনি কী ভাবে সৃষ্টি হলেন?’ গজলি ধমক দিলেন, ‘আহ, ঈশ্বরের কোনও শুরু নেই, শেষ নেই। তিনি আছেন। just-is বলতে পারো। যাও, সবাইকে ভয় দেখাও, স্বর্গীয় ন্যায় তথা just-is’কে স্মরণ করিয়ে দাও।’ পলিটিকালি ইনকারেক্ট হয়েই তিনি জাস্টিস তথা ন্যায় শব্দে নিয়ে আসেন জাদু-ব্যঞ্জনা।
কিন্তু গজলি ও তাঁর পোষা জিনই তো পৃথিবীর একমাত্র শক্তি নয়। ইবন রুশ্দ-এর বউ দুনিয়া ছিল কোয়াফ পর্বতের জিন রাজকন্যা। ইবন রুশ্দ আর দুনিয়ার সন্তানসন্ততিদের কানের লতি নেই, সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তারা, তাদের নাম দুনিয়াজাদ। জেরোনিমো মেঞ্জেস নামক মালিটি এ রকমই এক জন। বাগানে মাটি কোপানো মানেই অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ! আর এক দুনিয়াজাদ জিমি কপূর গ্রাফিক নভেলিস্ট, নিউ ইয়র্কে থাকে। তার তৈরি সুপারহিরো নটরাজের ছদ্মবেশে জমরুদ শাহ হানা দেয়, জিমি হ্যারি পটারের মতো মাথায় অ্যান্টেনা নিয়ে দুনিয়া বাঁচানোর যুদ্ধে যায়।
ভয় নয়, জিতল ভালবাসা। কিন্তু যুদ্ধজয়ের পর? জিন, পরি নেই। কেউ আর স্বপ্ন দেখে না। এত দিন লোকে জানত, এর কাছে যা বিশ্বাস, ওর কাছে সেটাই রূপকথা। নতুন পৃথিবীতে শান্তি, উন্নয়ন সবই আছে। কিন্তু স্বপ্ন নেই, রূপকথা নেই!
এখানেই রুশদির বহুস্বর। স্বপ্নের জন্য আর্তির এক দিকে আরব্য রজনী, অন্য দিকে কোয়াফ পর্বত, জিন রাজকন্যা, মানুষের ভালবাসা। সবই উঠে এল ফার্সি উপকথা হামজানামা থেকে। মুঘল সম্রাট বাবর বইটা দু’চক্ষে দেখতে পারতেন না, বলতেন ‘গাঁজাখুরি’। তাঁর পৌত্র আকবর আবার এই বইয়ের প্রবল ভক্ত, চোদ্দো বছর ধরে অলঙ্কৃত রঙিন পুঁথি তৈরি করান।
পলিটিকালি ইনকারেক্ট সলমন রুশদি দুনিয়াকে জানিয়ে গেলেন, বাবর হোয়ো না। বরং আকবরের মতো স্বপ্ন দেখতে শেখো।