সম্পাদকীয় ১

জলের ন্যায় কঠিন

সওয়া শতাব্দী পার হইয়াও কাবেরীর জলবণ্টন বিতর্ক অমর। সমস্যাটি বাস্তব ও জটিল, সংশয় নাই। তবে, মৌলিক নহে। তিস্তার জল লইয়া ভারত-বাংলাদেশের দ্বন্দ্ব অথবা শতদ্রুর জলের অধিকার লইয়া পঞ্জাব-হরিয়ানার টানাপড়েনের সহিত কাবেরী জলবণ্টন বিতর্কের বস্তুগত তফাত নাই। কর্নাটকের কৃষি যেমন কাবেরীর জলের উপর নির্ভরশীল, তামিলনাড়ুর বিপুল অঞ্চলও তেমনই এই নদীর মুখ চাহিয়া থাকে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০০:০৯
Share:

সওয়া শতাব্দী পার হইয়াও কাবেরীর জলবণ্টন বিতর্ক অমর। সমস্যাটি বাস্তব ও জটিল, সংশয় নাই। তবে, মৌলিক নহে। তিস্তার জল লইয়া ভারত-বাংলাদেশের দ্বন্দ্ব অথবা শতদ্রুর জলের অধিকার লইয়া পঞ্জাব-হরিয়ানার টানাপড়েনের সহিত কাবেরী জলবণ্টন বিতর্কের বস্তুগত তফাত নাই। কর্নাটকের কৃষি যেমন কাবেরীর জলের উপর নির্ভরশীল, তামিলনাড়ুর বিপুল অঞ্চলও তেমনই এই নদীর মুখ চাহিয়া থাকে। তামিলনাড়ুকে তাহার চাহিদা অনুযায়ী জল দিলে কর্নাটকের ভাগে টান পড়ে, আর কর্নাটক নিজেরটা বুঝিয়া লইলে তামিলনা়ড়ুর যথেষ্ট হয় না। আপসরফা না করিলে এবং প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা না মানিলে এহেন সংকট কাটিবার নহে। বস্তুত, আপসরফাভিত্তিক চুক্তিকে তাহার প্রাপ্য মর্যাদা দিলে যে সমাধান সম্ভব, তাহার চমৎকার উদাহরণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু চুক্তি। মধ্যস্থতা না মানিলে কী হয়, কর্নাটক ও তামিলনাড়ু তাহার উদাহরণ পেশ করিয়া চলিয়াছে। ট্রাইবুনাল হইতে সুপ্রিম কোর্ট, কাহারও সমঝোতাসূত্রই সমস্যা মিটাইতে পারে নাই। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিকতম নির্দেশকে কেন্দ্র করিয়া কর্নাটকে যে অস্থিরতা চলিতেছে, তাহাতে স্পষ্ট যে, অদূর ভবিষ্যতে সমস্যা মিটিবারও নহে। একটি সমস্যা যখন রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন উত্তরোত্তর জটিলতর ও সমাধানের অযোগ্য হইয়া উঠাই তাহার নিয়তি। কর্নাটক ও তামিলনাড়ু সেই নিয়তির পাশে বাঁধা পড়িয়াছে।

Advertisement

এই রাজনীতি খণ্ড-জাতীয়তার, প্রাদেশিক অস্মিতার। রাজনীতির সমীকরণে সমস্যাটি আর জলের নহে, জলের অপ্রতুলতার ফলে কৃষকের দুরবস্থার নহে— কাবেরীর জল উপলক্ষ। প্রশ্নটি এখন রাজ্যের সম্মানের। যুদ্ধ জয়ের। সেই যুদ্ধে ফয়সলা হউক আর না-ই হউক, তাহাতে রাজনৈতিক লাভ বিলক্ষণ আছে। ফলে, এক বিন্দু জল না দেওয়ার হুঙ্কারটি রাজনৈতিক ভাষ্যে স্থায়ী আসন পাইয়াছে। এখন যেমন শাসক হউন বা বিরোধী, কর্নাটকে রাজনীতিকমাত্রেই বন্‌ধ এবং তামিলবিরোধী হাঙ্গামার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থক হইয়া গিয়াছেন। লড়াই যে আসলে জলের ভাগের নহে, বরং তামিলনাড়ুর বিরুদ্ধে, কর্নাটকে তামিল টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার, তামিল ছবির প্রদর্শন বন্ধ হইয়া যাওয়ায় তাহা স্পষ্ট। জলবণ্টনের সমস্যা যদিও বা যুক্তিতে মিটিতে পারে, এই অস্মিতার দ্বন্দ্ব মিটিবার নহে। এবং, এই দ্বন্দ্বই জলবণ্টন সমস্যার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য সমাধানে উপনীত হওয়াকে অসম্ভব করিয়াছে।

কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রী সঞ্জীব বালিয়াঁ প্রস্তাব করিয়াছেন, নদীর জলের বিষয়টিকে সংবিধানের রাজ্য তালিকা হইতে সরাইয়া সংযুক্ত তালিকায় লইয়া আসা হউক, যাহাতে এই গোত্রের বিতর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের খানিক জোর থাকে। প্রস্তাবটি যুক্তিগ্রাহ্য। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ঘাড়ে কেন্দ্রীয়তা চাপাইয়া দেওয়ার প্রবণতা সব কেন্দ্রীয় সরকারেরই ছিল ও আছে, এবং সেই প্রবণতাটি নিন্দনীয়ও বটে, কিন্তু নদীর জলের চরিত্রই এমন যে তাহা শুধুমাত্র রাজ্যের অধীনে থাকিলে আন্তঃরাজ্য বিরোধও কার্যত অনিবার্য— কারণ রাজ্যের রাজনৈতিক সীমানা মানিবার দায় নদীর নাই। কাবেরীর জল লইয়া বিতর্কের দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত রহিয়াছে, ভৌগোলিক কারণ রহিয়াছে। দীর্ঘ সত্তর বৎসর যুযুধান রাজ্য দুইটি সেই কারণগুলির অপরিবর্তনীয়তা স্বীকার করিয়া কোনও সমাধানসূত্রে সহমত হইতে পারে নাই। যুযুধান রাজ্য দুইটি যদি বোঝে, নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকিলে অপ্রিয় সিদ্ধান্ত মানিয়া লইবার বাধ্যতা তৈরি হইতে পারে, তবে হয়তো তাহারা নমনীয় হইবে। খেলার চরিত্রটি না পাল্টাইলে ফলাফল পাল্টাইবারও আশা নাই।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement