দিনে ডাকাতি

তিনটি বহুজাতিক প্রকাশনা সংস্থা যখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি ছোট দোকানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই হইতে পিছাইয়া আসে, মামলা প্রত্যাহার করিয়া লয়, তখন সামাজিক পরিসরের চরিত্রটি স্পষ্ট হইয়া উঠে। মামলাটি ছিল গোটা বই বা তাহার বড় অংশ ফোটোকপি করিয়া বিক্রি করিবার বিরুদ্ধে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০১৭ ২৩:২২
Share:

তিনটি বহুজাতিক প্রকাশনা সংস্থা যখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি ছোট দোকানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই হইতে পিছাইয়া আসে, মামলা প্রত্যাহার করিয়া লয়, তখন সামাজিক পরিসরের চরিত্রটি স্পষ্ট হইয়া উঠে। মামলাটি ছিল গোটা বই বা তাহার বড় অংশ ফোটোকপি করিয়া বিক্রি করিবার বিরুদ্ধে। প্রকাশনা সংস্থাগুলির দাবি ছিল, ইহাতে তাহাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হইতেছে, লেখকরাও তাঁহাদের মেধাস্বত্বের দাম পাইতেছেন না। দিল্লি হাইকোর্টে গোড়ায় মামলাটি খারিজ হইয়া যায়। পরে ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটিকে স্বীকার করিলেও ফোটোকপির দোকানটির উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নাই। প্রকাশনা সংস্থাগুলি আর ঝামেলা বাড়ায় নাই, তাহারা মামলা ফিরাইয়া লইয়াছে। ক্যাম্পাসের, এবং বৃহত্তর সমাজের জনমত তাহাদের দিকে ছিল না। কাহারও মতে, এই মামলা ধনতন্ত্রের লোভের নির্লজ্জ প্রকাশ; কেহ আবার ছাত্রদের সস্তায় বই পড়িবার অধিকার লইয়া সরব। অথচ, যে কথাটি স্বাভাবিকতম হইতে পারিত, কেহ ভুলিয়াও তাহা উচ্চারণ করে নাই— ছাত্রদের বই পড়িবার সুবিধা করিয়া দেওয়ার দায় প্রকাশনা সংস্থার নহে। সেই দায় সরকারের। তাহার জন্য পাঠাগারে আরও বই কিনিবার ব্যবস্থা করা যাইত, ছাত্রদেরও বই কিনিতে এককালীন টাকা দেওয়া যাইত। কিন্তু, কাহারও মেধাস্বত্ব চুরি করিয়া তাহাকে ছাত্রদের মধ্যে ‘বণ্টন’ করিবার রবিনহুডি সাম্যবাদ অতি বিপজ্জনক।

Advertisement

ফোটোকপি চুরিই, তাহাকে অন্য কোনও নামে ডাকিবার উপায় নাই। বই বস্তুটি তাহার বাহ্যিক রূপ মাত্র নহে— বস্তুত, তাহা নিতান্ত গৌণ, বই আসলে তাহার পাতায় পাতায় থাকা কথাগুলি। বইয়ের যখন বাণিজ্যিক বিনিময় হয়, তখন বাহ্যিক রূপটির হাতবদল ঘটে, মালিকানা হস্তান্তরিত হয়, কিন্তু ক্রেতা বইয়ের ভিতরের কথাগুলির মালিক হইয়া বসেন না। তাঁহার অধিকার শুধুমাত্র ব্যবহারের, অর্থাৎ জ্ঞান আহরণের— সেই জ্ঞান আত্মস্থ করিয়া তাহাকে প্রবাহিত করিবারও বটে— কিন্তু সেই বইয়ের পাতাগুলির নকল করিয়া তাহার বাণিজ্য করিবার অধিকার ক্রেতার নাই। কারণ, জ্ঞান মেধাস্বত্ব, বই কিনিলেই সেই মেধাস্বত্ব কেনা হয় না। যাহা নিজের নহে, তাহা বিক্রয় করাকে চুরিই বলে। সভ্য দেশে ফোটোকপির উপর কড়া বাধানিষেধ থাকে। ভারতীয় সমাজ এই চুরিকে প্রশ্রয় দেয়। ।

যে ছাত্র দোকান হইতে বই চুরির কথা ভাবিবেও না, সেও নির্দ্বিধায় ফোটোকপি করা বই ব্যবহার করে— আচরণগত অর্থনীতির তাত্ত্বিকরা বলিবেন, এই অসঙ্গতির মূল কারণ, বইকে মানুষ এখনও তাহার বাহ্যিক রূপেই চেনে। সেই রূপটি না বলিয়া হাতাইয়া লওয়া চুরি, কিন্তু তাহাকে অক্ষত রাখিয়া কেবলমাত্র ফোটোকপি করিয়া লইলেও যে চুরিই হয়, সেই কথাটি এখনও ভারতীয় মনস্তত্ত্বে ঠাঁই পায় নাই। লেখকের ও প্রকাশকের মেধাস্বত্ব স্বীকার করিয়া লইয়া ফোটোকপির অনৈতিকতার কথাটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়া প্রচার করাই সরকারের কর্তব্য ছিল। কিন্তু নেতারাও সম্ভবত এই কথাটি বোঝেন না। অবশ্য, ভারত রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এর দেশ, মেধাস্বত্বকে গুরুত্ব দেওয়া এই দেশের সংস্কৃতিই নহে। ফলে, সমাজ যে দিকে টানিয়াছে, প্রশাসনও সেই স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়াছে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement