আমি পাকিস্তানি। আর বিরাট কোহলির ফ্যান। ২৬ জানুয়ারি, বিরাট এমন খেললেন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে, আবেগে উত্তেজনায় আমার বাড়ির ছাদে ভারতের তেরঙা পতাকা উড়িয়ে দিলাম। ব্যস, প্রতিবেশীদের নালিশ পেয়ে পুলিশ আমায় ধরে নিয়ে গেল। শুনছি, দশ বছর অবধি জেল হতে পারে। কোনও সন্দেহই নেই, যদি ভারতীয় হতাম, আর বাড়ির ছাদে পাকিস্তানি পতাকা ওড়াতাম, প্রতিবেশীরা আমার নামে অবশ্যই নালিশ করত, রাস্তায় বেরোলে টিটকিরি আর ঢিল মারত। পুলিশ ধরত কি না শিয়োর নই, কিন্তু বাছাই সংগঠনের সৈনিকরা এসে গলাটা কুচিয়ে কেটে নেওয়ার চেষ্টা করত। তাই আমার দেশকে আলাদা করে দুষছি না। তবে, এ সব দেখে হাসি পায়, ভয়ও করে। কী একখান চক্কর আমরা লাগিয়ে রেখেছি পৃথিবী জুড়ে। কুকুর-বেড়ালের মতো খেয়োখেয়ি, এর-ওর দিকে দাঁত বের করে তেড়ে যাওয়া। এই অভদ্রতার, খেঁকুরেপনার নাম আবার দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, জননী জন্মভূমিশ্চ।
আগে লোকে ম্যাপ-ফ্যাপ জানত না, প্লেন চড়ে এ দিক-সে দিক যাওয়া আদ্ধেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না, টিভিতেও বিদেশ-টিদেশ দেখা যেত না বেশি। তখন হয়তো অনেকেই ভাবত, এই পৃথিবীটা আসলে শুধু ন’মাসির বাড়ি অবধি ছড়ানো। কিন্তু এখন তো যে-সে ইন্টারনেটে মেমসায়েবের পর্নো দেখে হাল্লাক। সিনেমাতে প্রেম হলে লাহৌরের নায়ক লন্ডনে নাচবেই। সামান্য শপিং মল এসে গিয়ে যদি লোককে শেখায় কত ব্র্যান্ডের কত স্টাইলের কত কাটিং-এর জামাকাপড়ই না হয়, আর খদ্দেরের বাছবার স্বাধীনতা ও প্রবণতা সবই তক্ষুনি বেড়ে যায় হুহু করে, তা হলে কেন এ গরীয়ান গ্লোবাল গ্যাঁড়াকলে মানুষ এইটা বুঝছে না: কোন দেশকে সে ভালবাসবে, কোন দেশের কোন জিনিসটাকে শ্রদ্ধা করবে, তার ক্ষেত্রটাও প্রসারিত হল, তার সুযোগটাও বেড়ে গেল সমান ভাবেই? আমি যদি বলতে পারি, ধুর, চেলসি দেখার পর আর মোহনবাগানের ফুটবল দেখতে ইচ্ছে করে না, যদি বলতে পারি দেশি সিরিয়ালগুলোর চেয়ে একশো গুণ স্মার্ট ‘গেম অব থ্রোন্স’, কেন বলতে পারি না এই পাকিস্তান দেশটার চেয়ে হরেদরে অনেক ভাল দেশ আমেরিকা, কিংবা ভারতের চেয়ে ইংল্যান্ড অনেক বেশি মানবিক?
আমি একটা জায়গায় জন্মেছি মানে তাকে আমি ভালবেসে ফেলব, এটা কতকটা স্বতঃসিদ্ধ, যেমন আমরা মা-বাবাকে ভালবেসে ফেলি। কিন্তু তা বলে তাদের ছাড়া আর কাউকেই ভালবাসতে পারব না, বা, তাদের তুলনায় কাউকে ভাল বলতে পারব না, কোথাকার আবদার? মা’কে ভালবাসি মানে কি অন্ধ ভাবে বলে যেতে হবে, আমার মা-ই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবী? আমার বাবাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ? সেটা সেরেফ ভাঁড়ামো হয়ে যাবে না? আর, প্রত্যেকের বাবা-মা’ই যদি শ্রেষ্ঠ পুরুষ ও নারী হয়, তা হলে হিসেব মিলবে কোত্থেকে? আমি বলতেই পারি, আরিফের মা’কে অ্যাডমায়ার করি তাঁর স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বের জন্যে, আর সেলিমের বাবাকে মনে হয় দারুণ ডিসিপ্লিন্ড। এঁরা, ফ্র্যাংকলি, আমার বাবা-মা’র চেয়ে অনেক উন্নত, শিক্ষিত। তার মানে এই নয়, আমার বাবার হার্ট অ্যাটাক হলে আমি পড়িমরি করে আইসিউ দৌড়ব না।
আজকাল আসলে লোকের ব্যাকরণে একটু সমস্যা হয়ে গেছে। দেশদ্রোহিতা কাকে বলে? দেশের নিন্দে করাকে? আমরা কি আপনজনদের তোড়ে গালাগাল দিই না? তাদের ওপর রেগে থালা-গেলাস ছুড়ি না? তাদের শোধরানোর জন্যেই হয়তো তা করি, কিংবা তাদের সান্নিধ্যে বাধ্য হচ্ছি বলে নিজের গায়ের ঝাল ঝাড়ার জন্যে। আমার দেশ যদি অতি বদ হয়, নোংরা হয়, অপদার্থ হয়, অসৎ হয়, আমার পক্ষে ক্রমশ বিপজ্জনক হয়, তা নিয়ে কথা বলব না কেন? কোন অধিকারে দেশ আমাকে চুপ করাবে? গোঁড়া গেঁড়েরা বলে, যেখানকার ভাত খেয়েছ, তার নামে বাজে কথা বলছ কেন? আরে, এখানকার ভাত খেয়েছি বলেই তো এখানটা কুস্বাদ হয়ে গেলে আমি শোর মচাব। আমার বাড়ির সামনে নর্দমা খোলা থাকলে আমি তা নিয়ে চেঁচাব না তো চেঁচাবে কে? দেশ যেমনই হোক, মিথ্যে মিথ্যে গদগদ প্রশস্তি করে যাব শুধু? সে ভণ্ডামিটা দেশপ্রেম? আর দেশ যাতে আরও ভাল হয়ে ওঠে, সে জন্য চিৎকার করলে তা বিশ্বাসঘাতকতা? যে দেশে লোকে ঘুষ খেয়ে ফাটিয়ে দিচ্ছে, ধর্মবাজরা সর্বনাশ করে দিচ্ছে শিক্ষা আর শিল্পের, উগ্রপন্থীরা দিনেরাতে উড়িয়ে দিচ্ছে নাক চোখ হাত পা, সেই দেশকে বলব মিষ্টিসোনু? দেশপ্রেম তা হলে ন্যাংলা ন্যাকামির একটা শাখা? মা-ম্মা-মেলোড্রামা?
মা’কে এক্কেবারে না-ভালবাসার অধিকারও কিন্তু আমার আছে। মা’কে মারব বলছি না, কক্ষনও না, তার প্রতি ব্যবহারে নীতিও লঙ্ঘন করলাম না, কিন্তু অন্যকে মা পাতালাম। কেন নয়? যে গণ্ডিটায় পড়ে গেছি, সেটাকেই জাপটে বাঁচতে হবে— এ ফতোয়া তো আসলে একটা সংকীর্ণতা। মানুষ অমৃতের পুত্র, গ্লোবাল সিটিজেন। এই অফিস ছেড়ে যদি ওই অফিস জয়েন করতে পারে, এই প্রেম ভেঙে অন্য সম্পর্কে যেতে পারে, নিজের দেশকে অস্বীকার করে অন্য দেশকে ভালবাসারও অধিকার তার আলবাত আছে।
আমি অবশ্য পাকিস্তান-বিরোধী নই, কোহলির প্রতি ভক্তিতে ভারতীয় ফ্ল্যাগ উড়িয়েছি। আসলে, ঝামেলাটা হয়েছে ভারতের পতাকা বলেই। বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিলের পতাকা ওড়ালে কোনও বখেড়াই হত না। ভারত আর পাকিস্তান দুটো দেশই, দেশপ্রেম বলতে বোঝে অন্য দেশটাকে ঘেন্না করা, তার সর্বনাশ কামনা করা। একটা লোক এই দেশে থেকে ওই দেশকে ভালবাসবে কেন, এটাই বৃহৎ ঘোটালা। কী অপূর্ব এই আবহাওয়া, অ্যাঁ, যেখানে গোটা দেশ তোমার কাছে ঘৃণা প্রত্যাশা করে, আর ভালবাসা দেখলে জেলে ধরে নিয়ে যায়!
লেখাটির সঙ্গে বাস্তব চরিত্র বা ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত, কাকতালীয়