ED I-PAC Raid Case

ইডির বিরুদ্ধে তদন্তে স্থগিতাদেশ, ফুটেজ ও নথি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বলল, দলের কাজকর্মে এজেন্সি-হস্তক্ষেপ নয়

আইপ্যাক-কাণ্ডে সিবিআই তদন্ত চাইছে ইডি। অন্য দিকে, রাজ্যের শাসকদলের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই হানা দিয়েছিল ইডি। সেখানে শাসকদলের সংবেদনশীল, নির্বাচনী তথ্য ছিল বলেও জানানো হয় এজলাসে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৫৮
Share:

সবুজ ফাইল হাতে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে এই ফাইলটি নিয়ে আসেন তিনি। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আইপ্যাক-কান্ডে সুপ্রিম কোর্টে প্রথমদিনের পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশ কার পক্ষে গেল? পশ্চিমবঙ্গ সরকার? পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল? নাকি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)? বৃহস্পতিবার দিনের শেষে এই হল প্রশ্ন। যে প্রশ্নের জবাব নিজেদের মতো করে দিয়েছে যুযুধান দুই রাজনৈতিক পক্ষ।

Advertisement

প্রথমদিনের শুনানির শেষে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ দৃশ্যতই রাজ্য সরকার এবং পুলিশের বিপক্ষে গিয়েছে। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণগুলির কারণে এই মুহূর্তে ‘হতোদ্যম’ হচ্ছে না রাজ্য সরকার। যেমন হাল ছাড়ছে না তৃণমূলও। দলের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়ে থাকলে ঠিক আছে। কিন্তু মামলা তো শেষ হয়ে যায়নি। ইডি অভিযআন শেষ করার পরে যে ‘পঞ্চনামা’ লিখেছে, সেটা আমাদের হাতে আছে। প্রয়োজনে সেটা এবং আরও তথ্য আমার সুপ্রিম কোর্টে জমা দেব। আদালতে আইনি লড়াই হবে।’’ তাঁর আরও প্রশ্ন, ‘‘আইপ্যাকের অফিস তো হায়দরাবাদেও আছে। আরও অন্য শহরেও আছে। এই রাজ্যএই কেন অভিযান করা হল?’’

রাজ্যের প্রধান বিরোধীদল বিজেপি বলেছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরাজয় হয়েছে। কারণ, শীর্ষ আদালত ইডির বিরুদ্ধে কলকাতা এবং বিধাননগর পুলিশের করা চারটি এফআইআরের উপর আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দিয়েছে। অর্থাৎ, ওইদিন পর্যন্ত পুলিশ ইডির বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে না। আবার রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের বক্তব্য, মোটেই তা নয়। কারণ, শুনানি পর্বের শেষে রাজ্যের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “(শীর্ষ আদালত) বলেছে, এখানে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উঠে আসছে। কেন্দ্রীয় সংস্থা কাজ করার সময়ে বিভিন্ন রাজ্য হস্তক্ষেপ করছে। এটা যেমন একটা প্রশ্ন আছে, তেমনই নির্বাচনের সময়ে কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘ইন্টারেস্টিং স্টেপ’ নিচ্ছে বিরোধীশাসিত রাজ্যে। এটিও একটি বিষয়। এটিও শোনা দরকার বলে মনে করছে আদালত।”

Advertisement

সুপ্রিম কোর্টে ইডি বনাম রাজ্য সরকারের মামলায় কী হয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে দিনভর কৌতূহল ছিল। ঘটনাচক্রে, বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারদিনের সফরে শিলিগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার তাঁর শিলিগুড়ির উপকণ্ঠে মহাকাল মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার কথা। কিন্তু মমতা বৃহস্পতিবার যাননি। তিনি শুক্রবার সকালে যাবেন বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর।

আইপ্যাক-কান্ডে সিবিআই তদন্ত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিল ইডি। রাজ্য সরকার সেই খবর পেয়েই শীর্ষ আদালতে ক্যাভিয়েট দাখিল করেছিল। ফলে বৃহস্পতিবার উভয়পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতেই শুনানি হয়।

প্রথমদিন শুনানির পর ইডির বিরুদ্ধে পুলিশের এফআইআরের উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আপাতত স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে পুলিশি তদন্তও। আবার একই সঙ্গে আদালত এ-ও মনে করেছে যে, কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থারই। প্রথমদিনের শুনানির ভিত্তিতে (পরবর্তী শুনানি ৩ ফেব্রুয়ারি) ইডির তল্লাশি অভিযান ঘিরে আইনি যুদ্ধে দু’পক্ষই নিজেদের এগিয়ে রাখছে। এক পক্ষ দেখছে আদালতের নির্দেশ। অন্য পক্ষ দেখছে আদালতের পর্যবেক্ষণ।

শুনানির শেষে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছে সুপ্রিম কোর্ট। ইডি বা অন্য কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তে রাজ্য সরকারগুলি হস্তক্ষেপ করতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছে আদালত। পাশাপাশিই সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থারই কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। কিন্তু যদি কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘সৎ’ উদ্দেশ্যে কোনও গুরুতর অপরাধের তদন্ত করে, তা হলেও কি শুধুমাত্র ‘দলের কাজ’ বলে তা আটকানো যেতে পারে? সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেছে আদালত।

আইপ্যাক-কাণ্ড ঘিরে এই আইনি যুদ্ধে কেন্দ্র এবং রাজ্যের দুই তদন্তকারী সংস্থা জড়িয়ে রয়েছে। ইডির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেছে কলকাতা ও বিধাননগর পুলিশ। আবার পুলিশের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়েছে ইডি। তবে সুপ্রিম কোর্ট মনে করছে, কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয়ের সংস্থাই যাতে ‘স্বাধীন’ ভাবে নিজেদের কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই কারণেই মামলাটি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট এ-ও জানিয়েছে, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা (পুলিশ)-র সংস্থার আড়ালে লুকিয়ে যেন কেউ পার না পেয়ে যান, তা-ও দেখা দরকার। এই প্রশ্নগুলির মীমাংসা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। অন্য রাজ্যগুলিতেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে আদালত।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র এবং বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলির বেঞ্চে সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ শুনানির জন্য ওঠে মামলাটি। মাঝে এক ঘণ্টার মধ্যাহ্নবিরতি ছিল। শুনানি চলে প্রায় বেলা তিনটে পর্যন্ত। দীর্ঘ শুনানিতে দু’পক্ষকেই বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেয় আদালত। শুনানি পর্বে মুখ্যমন্ত্রী মমতা এবং রাজ্যের পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ইডি। ইডির অন্যতম দাবি ছিল, এই ঘটনার সিবিআই তদন্ত হোক। এবং সেই তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হোক পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থেকে। ওই দাবির পক্ষে সওয়ালের সময়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এসি রাজু বলেন, “এই মামলা একেবারেই ব্যতিক্রমী। কারণ, এখানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই অভিযুক্ত। চুরির কাজটি মুখ্যমন্ত্রীই করেছেন। আর এই ঘটনা ঘটেছে পুলিশ কমিশনার ও রাজ্য পুলিশের ডিজিপি-র উপস্থিতিতে।” বস্তুত, পুলিশ আধিকারিকদের শাস্তির দাবিও তোলা হয় ইডির তরফে।

ইডির অভিযোগের বিরোধিতায় নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ পায় রাজ্য সরকার এবং পুলিশও। রাজ্য সরকারের আইনজীবী কপিল সিব্বল সওয়াল করেন, মমতা ‘মুখ্যমন্ত্রী’ হিসাবে নন, ‘তৃণমূলের চেয়ারপার্সন’ হিসাবেই সেখানে গিয়েছিলেন। যা ঘটনার পরদিন সর্বসমক্ষে বলেছিলেন মমতাও। তৃণমূলনেত্রীর যে তা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, তা-ও দুই বিচারপতির বেঞ্চকে বোঝানোর চেষ্টা করেন তিনি। সিব্বলের সওয়াল, মমতা সব ‘ডিজিটাল ডিভাইস’ (মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি) নিয়ে গিয়েছেন বলে ইডি যে অভিযোগ করছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য। তিনি শুধু একটি ল্যাপটপ এবং একটি আইফোন নিয়েছিলেন (যেগুলি আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের ব্যক্তিগত সামগ্রী বলেই বলা হচ্ছে তৃণমূল ের তরফে)। এর বাইরে আর কিছুই নেওয়া হয়নি। তল্লাশিতে কোনও বাধাও দেওয়া হয়নি। ভিডিয়ো ফুটেজ দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে জানান সিব্বল।

পাশাপাশি, ইডি কেন আইপ্যাক দফতরে হানা দিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সিব্বল। আইপ্যাক বর্তমানে রাজ্য সরকার এবং তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা। আদালতে সিব্বলের সওয়াল, “আইপ্যাকের কাছে রাজনৈতিক দলের বিপুল পরিমাণ তথ্য থাকে। যখন ইডি সেখানে গিয়েছিল, তখন তারা জানত, যে দলের বহু গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল তথ্য সেখানে থাকবে। নির্বাচনের ঠিক মাঝখানে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন কী ছিল?” সিব্বল উল্লেখ করেন, ইডি যে কয়লাকাণ্ডের তল্লাশি চালাচ্ছে, সেই মামলায় শেষ বয়ান সংগ্রহ হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। প্রশ্ন করেন, “এত দিন ইডি কী করছিল? হঠাৎ করে নির্বাচনের সময় এত তৎপরতা কেন? ইডি ওই সব তথ্য নিলে আমরা (তৃণমূল) নির্বাচনে লড়ব কী ভাবে?”

ওই তল্লাশি অভিযানের সময়ে রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারও গিয়েছিলেন আইপ্যাকের দফতরে। তাঁর বিরুদ্ধেও সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ তুলেছে ইডি। কেন ডিজি গিয়েছিলেন সেখানে, সেই ব্যাখ্যাও আদালতে দিয়েছেন তাঁর আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি। তাঁর সওয়াল, “কিছু অচেনা লোক ওই জায়গায় ঢুকেছেন। সেই খবর শুনে সেখানে গিয়েছিলেন ডিজিপি।” বস্তুত, মুখ্যমন্ত্রী ‘জ়েড প্লাস’ নিরাপত্তা পান এবং তিনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথা উল্লেখ করে সিঙ্ঘভি বলেন, “এই ধরনের তথ্য পেলে ডিজিপির সেখানে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।”

ইডির তরফে রাজ্যকে তল্লাশি অভিযানের বিষয়ে জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়েও বৃহস্পতিবার বিস্তারিত সওয়াল-জবাব চলে এজলাসে। রাজ্যের তরফে প্রথমে জানানো হয়, কিছু না জানিয়েই অভিযান চালায় ইডি। তাতে আপত্তি জানান সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তাঁর দাবি, ইডি জানিয়েছিল রাজ্যের আধিকারিকদের। তখন সিঙ্ঘভি বলেন, “ভোর ৬টা ৪৫ মিনিটে তল্লাশি শুরু হয়েছিল। আর ইডির তরফে অভিযানের কথা জানিয়ে ইমেল পাঠানো হয়েছিল তার অনেক পরে সকাল সাড়ে ১১টায়। আসলে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টায় পরে ওই ইমেলটি করা হয়েছিল। ইডি অফিসারেরা অনেক দেরিতে নিজেদের পরিচয় দেন।” তিনি আরও জানান, খুবই সাধারণ ইমেল করে জানানো হয়েছিল। তবে ইডির দাবি, ইমেল কখনও ‘ক্যাজ়্যুয়াল’ বা ‘গুরুত্বহীন’ হতে পারে না। ইমেল করা হয়েছে মানেই তা আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হয়েছে।

দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার পরে আদালত জানায়, ইডির আধিকারিকেরা আইন মেনে প্রয়োজনীয় অনুমোদনপত্র নিয়ে তল্লাশি চালালে তাঁরা সৎ উদ্দেশ্যে কাজ করছিলেন বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি এই মামলার পরবর্তী শুনানি। তার আগে দু’সপ্তাহের মধ্যে ইডির বিরুদ্ধে মামলাকারী সব পক্ষকে হলফনামা দিয়ে নিজেদের বক্তব্য জানাতে বলেছে আদালত। তল্লাশি অভিযানের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ডিজিটাল তথ্য এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘পুলিশকেই বলেছে সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করতে। অর্থাৎ, তাদের অপকর্মের সাক্ষ্য তাদেরই সংরক্ষণ করতে হবে। তারা অবশ্য তা মুছে দিতে পারে। কিন্তু সেটা করলেও তা বোঝা যাবে। আমি এই পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানাচ্ছি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরাজয় হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। সরকারের আইনজীবীরা চেষ্টা করেছিলেন মামলা কলকাতা হাই কোর্টে ফিরিয়ে আনার। সুপ্রিম কোর্ট তাতে কান দেয়নি!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement