প্রবন্ধ ১

দেশভক্তির ঝকমারি

কার্গিলের জওয়ান তো কখনও বলে না রাত্তিরবেলা যুদ্ধ করব না, বৃষ্টি পড়লে যুদ্ধে যাব না, জঙ্গলের আড়াল শেষ, আর এগোব না। পুঁজিপতিরা আমাদের আর্থিক নিরাপত্তারক্ষী। তাঁরা কী করে বলেন ঝুঁকি নেব না? শুনলেই হবে? বাজেট ভাষণ শুনছেন শিল্পবাণিজ্যের পরিচালকরা।হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুক-বাসীরা যে ইদানীং দেশপ্রেমের জোয়ারে ভাসছে, তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটালেই তা পরিষ্কার বোঝা যায়। ছোট, বড় নানান গল্প সারা দিনই ঘুরে ফিরে আসছে।

Advertisement

অর্ধেন্দু সেন

শেষ আপডেট: ০৬ মার্চ ২০১৬ ০০:১২
Share:

শুনলেই হবে? বাজেট ভাষণ শুনছেন শিল্পবাণিজ্যের পরিচালকরা।

হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুক-বাসীরা যে ইদানীং দেশপ্রেমের জোয়ারে ভাসছে, তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটালেই তা পরিষ্কার বোঝা যায়। ছোট, বড় নানান গল্প সারা দিনই ঘুরে ফিরে আসছে। বেশির ভাগ গল্পেই দেখছি হয় সিয়াচেন না-হয় কার্গিলের কথা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও গল্পের খাতিরে তার প্রয়োজন ছিল না। গল্পগুলি কাদের কর্মশালায় তৈরি, তা অনুমান করা যায়। তাতে আপত্তির কিছু নেই। দেশপ্রেম নিশ্চয়ই ভাল। কিন্তু অনেক গল্পে একটা সাব-টেক্সট থাকছে। বলা হচ্ছে যে অশিক্ষিত মানুষ যখন দেশকে অখণ্ড রাখতে চেষ্টা করছে, ‘শিক্ষিত’ ছেলেমেয়েরা তখন দেশকে ভাঙতে ব্যস্ত।

Advertisement

এই সেন্টিমেন্ট নেট-এ সীমাবদ্ধ নেই। কিছু প্রাতঃস্মরণীয় নেতাও দাবি করেছেন যে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ও ওই জাতীয় কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হোক। সুব্রমহ্মণ্যম স্বামী বলেছেন জেএনইউ মাস চারেক বন্ধ রেখে পাঠ্যসূচি বদলে আবার চালানো যেতে পারে। ছেলেমেয়েদের দোষ কী, তাদের যেমন শেখানো হবে তারা তো তেমনই শিখবে! শিক্ষা মন্ত্রক অবশ্য এখনও এই ধরনের বক্তব্য সমর্থন করেনি। মন্ত্রী জানেন যে উচ্চশিক্ষা তুলে দেওয়া সহজ, প্রতিষ্ঠান তুলে দেওয়া সহজ নয়। তাই অযথা রাজনৈতিক পুঁজির অপচয় না করে তিনি অন্য ব্যবস্থা নিয়েছেন। শুধু তো জেএনইউ নয়, আরও কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় আছে, আইআইটি আছে, আইআইএম আছে। এতগুলি লোকের চাকরি, এত টাকার বাজেট। বন্ধ করে দিলেই হল?

একটা উপায় কিন্তু আছে, যা নিলে বন্ধও করতে হয় না আবার, আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর সাবলীল ভাষায়, বাঁশও দিতে হয় না। সেটা হল: মেক ইন ইন্ডিয়া। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষায় ব্রতী হয় চাকরি পায়নি বলে। সময় মতো বাড়ির কাছে চাকরি পাওয়া গেলে ক’জন পড়তে আসবে? তাই আমার ধারণা প্রধানমন্ত্রীর মেক ইন ইন্ডিয়া প্রকল্প সফল হলে এই সমস্যা আর থাকবেই না। প্রতি বছর যদি কারখানায়, অফিসে ১৫০ লক্ষ চাকরি তৈরি হয়, তা হলে অধ্যাপকদের চাকরি যেতে বাধ্য। কিন্তু এই কাজ কি সহজ হবে?

Advertisement

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে কিছু দিন মনে হল পুঁজিপতিরা খুশি। এ বার লগ্নিও হবে, আর্থিক বৃদ্ধিও হবে। দু’বছর হতে চলল এখনও আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। অনেকে বলছেন নাকি জিএসটি না হলে হবে না। এর পর বলবেন জমি কেনার অধিকার চাই। তার পর বলবেন ব্যবসায় লাভ না হলে যে কারখানা বন্ধ করব, প্রস্থান-পলিসি কোথায়? পরিকাঠামো উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ কম কেন? রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি লোকসান করছে, আমাদের ঋণ দেবে কে? গ্রামের লোকের হাতে পয়সা নেই। জিনিসপত্র কিনবে কে?

সরকারের উচিত এই সমস্যার কড়া হাতে মোকাবিলা করা। এ তো সাধারণ সতর্কতা নয়, এ তো দেশদ্রোহিতার সমান। সিয়াচেনের প্রহরী কতখানি ঝুঁকি নেয় তা সে জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছে। কার্গিলের জওয়ান তো কখনও বলে না রাত্তিরবেলা যুদ্ধ করব না, বৃষ্টি পড়লে যুদ্ধে যাব না, জঙ্গলের আড়াল শেষ, আর এগোব না। এ কথা বললে তার শাস্তি অনিবার্য। পুঁজিপতিরা হলেন আমাদের আর্থিক নিরাপত্তারক্ষী। তাঁরা কী করে বলেন, আমরা কোনও ঝুঁকি নেব না? এক বছর আগে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো অঙ্ক কষে দেখিয়ে দিয়েছিল পরিবেশ নিয়ে এনজিও-দের মাতামাতির ফলে বৃদ্ধির হার ১-২ পারসেন্ট কম হয়েছে। গ্রিনপিস-কে পত্রপাঠ বিদায় করা হয়েছিল। বিনিয়োগকারীদের বেলায় অন্যথা হবে কেন? দেশ আগে না ডোনেশন?

আর গ্রামের লোকের হাতে টাকা না-ই বা থাকল। আমাদের শিল্প উৎপাদন করবে গোটা বিশ্বের জন্য। এ কি সেই প্রশান্ত মহলানবীশ-সুখময় চক্রবর্তী মার্কা আমদানি কমাবার জন্য শিল্পায়ন? এ হবে রফতানিমূলক শিল্পায়ন। হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন এক কথা, তাই বলে হিন্দু বৃদ্ধির হার ফিরিয়ে আনব না কি? রফতানি করতে হলে চাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর পৃথিবী জুড়ে বিক্রি করার নেটওয়ার্ক। এই জন্য আমরা গোড়া থেকেই চেয়েছি বিদেশি পুঁজিকে এই প্রকল্পে যুক্ত করতে। বিদেশিরাও সাড়া দিয়েছে আমাদের আমন্ত্রণে। ডাকলেই এসেছে। মিটিং করেছে। প্রেস কনফারেন্স করে বলেছে কে কত লগ্নি করবে। কিন্তু কাজ বিশেষ এগোয়নি। মুশকিল হল যে আমেরিকাও এখন আমাদের মতো উৎপাদনে মন দিয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এখন বলছেন মেক ইন আমেরিকা। এত দিন তারা জোর দিয়েছে ভোগের উপর। গাড়ি এসেছে জাপান থেকে, ইলেক্ট্রনিক্স চিন থেকে, লেবুর রস ব্রাজিল থেকে। পকেটে ডলার থাকায় কোনও জিনিস কিনতে অসুবিধা হয়নি। এখন তাদের খেয়াল হয়েছে যে এই ব্যাবস্থা সাসটেনেব্‌ল নয়— অনন্তকাল চলতে পারে না।

দেশে উৎপাদনে উৎসাহ দিতে আমদানি কমাতে হবে। আমেরিকায় রফতানি করতে হলে ভবিষ্যতে এমন শর্ত মেনে উৎপাদন করতে হবে যা উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে মানা কঠিন। আজকে যিনি ভারতে লগ্নি করবেন তিনি চাইবেন আগামী ১৫-২০ বছর আমেরিকা ও ইউরোপে তাঁর মাল বিক্রির সুযোগ থাকবে। সেটা নিশ্চিত করা আজকের দিনে বেশ কঠিন। এই অবস্থায় আমাদের কোন রাজ্য বিক্রয় কর মকুব করল, কে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক থেকে জমি দিল, তাতে কতটা লাভ হবে?

প্যারিসে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনাসভায় হাজার ক্যামেরার ঝলকানির সামনে উন্নত দেশগুলি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলিকে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে। এই পয়সা যদি এ বার উন্নয়নশীল দেশগুলি থেকেই তুলতে হয় তা হলে আমদানি করা পণ্যের ন্যায্য দাম দেওয়া যাবে না। কাজেই রফতানি যে করবে তাকে কম মুনাফায় কাজ করতে হবে। এমন সব দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে কে আসবে শিল্পস্থাপন করতে? আমাদের অবশ্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

ও দিকে আমেরিকা আমাদের প্রতিবেশী দেশকে আটটা বোমারু বিমান দেবে বলেছে। ভয় হয় নতুন খেলনা হাতে পেয়ে সে ভারতকে আক্রমণ না করে। আবার মনে হয় একটা যুদ্ধ হলে মন্দ হয় না। অনেক দিন হয়নি। ঠিক ৫০ বছর আগে যখন পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ হয়, দিল্লিতে সাইরেন বাজলেই লাইট নিভিয়ে দেওয়া হত। কেউ লাইট জ্বালালে পাড়াসুদ্ধু লোক রে রে করে তার দিকে ছুটত। পরে কখনও দেখিনি, ভেদাভেদজ্ঞান ভুলে, দেশবাসীকে ওই ভাবে একাত্ম হয়ে যেতে।

ভূতপূর্ব মুখ্য সচিব, পশ্চিমবঙ্গ সরকার

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement