সম্পাদকীয় ২

নূতন নাট্যশালা

প্রতিবেশী শিশুর নূতন খেলনা আসিলে নিজের জন্যও তাহা চাই, কচিকাঁচাদের এই দাবির সহিত কাহার পরিচয় নাই? ভারতের গণতন্ত্র যে এখনও নাবালক, তাহা সংশয়াতীত। অতএব, আফগানিস্তানের শিশু-গণতন্ত্রের জন্য যদি নূতন পার্লামেন্ট নির্মিত হয়, ভারতেরও একটি চাই বইকী।

Advertisement
শেষ আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:৫৫
Share:

প্রতিবেশী শিশুর নূতন খেলনা আসিলে নিজের জন্যও তাহা চাই, কচিকাঁচাদের এই দাবির সহিত কাহার পরিচয় নাই? ভারতের গণতন্ত্র যে এখনও নাবালক, তাহা সংশয়াতীত। অতএব, আফগানিস্তানের শিশু-গণতন্ত্রের জন্য যদি নূতন পার্লামেন্ট নির্মিত হয়, ভারতেরও একটি চাই বইকী। আফগান পার্লামেন্টটি আবার ভারতেরই টাকায় নির্মিত। নূতন দিল্লিতে নূতন সংসদ ভবনের প্রস্তাব দিয়া নগরোন্নয়ন মন্ত্রী বেঙ্কাইয়া নাইডুকে লোকসভার স্পিকার চিঠি লিখিয়াছেন। অনুমান করা চলে, অদূর ভবিষ্যতে জোরকদমে কাজও আরম্ভ হইবে। নরেন্দ্র মোদীর আমলে আর্থিক সংস্কার অপেক্ষা স্বচ্ছ ভারত-এর ন্যায় বিষয়ের গুরুত্ব ঢের বেশি। গণতন্ত্রের নূতন খেলনাও গুরুত্ব পাইবে বলিয়াই আশা।

Advertisement

নূতন সংসদ ভবনের দাবিটি, ভাবিয়া দেখিলে, ভুঁইফোঁড় নহে। যোজনা কমিশনের নূতন নামকরণ হইয়াছে ‘নীতি আয়োগ’। দুর্জনের মতে, যোজনা কমিশনের গায়ে জওহরলাল নেহরুর গন্ধ বড় প্রবল ছিল। নয়াদিল্লির সংসদ ভবনের গায়েও নেহরুর ছবি অনপনেয়। ভবনটি তাঁহার শাসনকালের পূর্বেই নির্মিত বটে, কিন্তু ১৯৪৬ সালের গণপরিষদে সংবিধান কমিটির প্রধান হিসাবেই হউন বা স্বাধীন ভারতের প্রথম ১৭ বৎসরের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে, বর্তমান সংসদ ভবন হইতে নেহরুর স্মৃতি মুছিয়া ফেলা কঠিন। সহজতর কাজ, সংসদ ভবনটিকেই মুছিয়া ফেলা। ইতিহাস কী ভাবে পুনঃরচিত হয়, দীননাথ বাত্রা নিশ্চিত ভাবেই সেই পথ দেখাইতে পারিবেন। এই কথাও ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, বর্তমান সংসদ ভবনটি ঔপনিবেশিক শাসনের নিদর্শন। এ়ডউইন লাটিয়েন্স যতই খ্যাতনামা নগর পরিকল্পক হউন, তিনি ব্রিটিশ সরকার দ্বারা নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ভবনটির উদ্বোধন করিয়াছিলেন লর্ড আরউইন। ভারতে এখন জাতীয়তাবাদের বসন্ত চলিতেছে, বেমক্কা মুখ খুলিলে ওয়াগার অপর প্রান্তে ছুঁড়িয়া ফেলার হুমকিই দস্তুর। এই ঝোড়ো হাওয়ায় ঔপনিবেশিক সংসদ ভবনটি উড়িয়া যাইবে, স্বাভাবিক।

লোকসভার স্পিকার অবশ্য এই যুক্তিগুলির উল্লেখ করেন নাই। তিনি বলিয়াছেন, পুরাতন ভবনটিতে এখনই স্থান সংকুলান হইতেছে না, ভবিষ্যতে সংসদ-সংখ্যা বৃদ্ধি পাইলে আরও হইবে না। অর্বাচীনরা স্পিকারের যুক্তিতে বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিতে পারে, সাংসদরা সভায় উপস্থিত থাকেন কখন যে বসিবার জায়গা লইয়া টানাটানি পড়িবে? বহু সাংসদেরই উপস্থিতির হার যে প্রকার, তাঁহারা স্কুল-কলেজের ছাত্র হইলে কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের তলব করিতেন। এই যুক্তিটির গোড়ায় গলদ। আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার প্রক্রিয়াই গণতন্ত্র, ভারতে এ-হেন সংজ্ঞার মৃত্যু হইয়াছে বহু পূর্বেই। সাংসদদের দেখিলে অনুমান হয়, বিচিত্র মেঠো নাটকই এখন গণতন্ত্রের মূল পথ। সংসদ ভবন প্রকৃত প্রস্তাবে একটি বৃহৎ নাট্যশালা। কাণ্ডজ্ঞান বলিবে, নাট্যশালায় প্রত্যহ হাজিরা দেওয়া অনর্থক। যে দিন নাটক জমিবে, সে দিন উপস্থিত হইলেই চলে। জমজমাট নাটকের দিন সদর দরজায় ‘হাউস ফুল’ লেখা বোর্ড টাঙাইবার ব্যবস্থা না থাকিলে ভিড় উপচাইয়া পড়িবেই। বৃহত্তর রঙ্গমঞ্চের ব্যবস্থা করিলে মন্দ কী? এবং, নাট্যশালা একাধিক হওয়াই স্বাভাবিক। গ্রীষ্মকালে দিল্লির পরিবর্তে সিমলায় সংসদ বসানো যায় কি না, সেই ভাবনাও চলিতে পারে। দেশের দায়িত্ব যাঁহাদের স্কন্ধে, তাঁহাদের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবা প্রয়োজন বইকী।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement