সম্পা়দকীয় ১

ভদ্রাসন

বহু দিন মনে ছিল আশা/ দিল্লির এক কোণে, রহিব আপন মনে... এতটুকু বাসা, করেছিনু আশা।’ রবীন্দ্রনাথকে খানিক বদলাইয়া আবৃত্তি করিতেই পারেন অধীর চৌধুরী। কিছু কাল রেল দফতরের প্রতিমন্ত্রী থাকিবার সুবাদে তিনি যে বাংলোটির মালিক হইয়াছিলেন, তাহা ধরিয়া রাখিবার অত্যুৎসাহে তিনি চক্ষুলজ্জা বিসর্জন দিয়াছেন। বারংবার নোটিস পাইবার পরেও তিনি বাংলো ছাড়িবার নাম করেন নাই।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:২৬
Share:

বহু দিন মনে ছিল আশা/ দিল্লির এক কোণে, রহিব আপন মনে... এতটুকু বাসা, করেছিনু আশা।’ রবীন্দ্রনাথকে খানিক বদলাইয়া আবৃত্তি করিতেই পারেন অধীর চৌধুরী। কিছু কাল রেল দফতরের প্রতিমন্ত্রী থাকিবার সুবাদে তিনি যে বাংলোটির মালিক হইয়াছিলেন, তাহা ধরিয়া রাখিবার অত্যুৎসাহে তিনি চক্ষুলজ্জা বিসর্জন দিয়াছেন। বারংবার নোটিস পাইবার পরেও তিনি বাংলো ছাড়িবার নাম করেন নাই। উৎখাত হইবার পরেও এক বার আদালতের দ্বারস্থ হইতেছেন, সেখানে বিফলমনোরথ হইয়া স্পিকারকে চিঠি লিখিতেছেন। অনুমান করা চলে, বাড়িটি জম্পেশ। সাংসদ হিসাবে যে বা়ড়ি তাঁহার প্রাপ্য, তাহার তুলনায় অনেক ভাল। কিন্তু, সব ভালই ফুরায়। অধীরবাবুর বাড়িভাগ্যও বদলাইয়াছে। দৃশ্যত, সেই সত্যকে সহজে লইবার মতো মনের জোর অথবা প্রবৃত্তি বহরমপুরের সাংসদের নাই। বাড়ি না ছাড়িবার জন্য যে জেদ তিনি ধরিয়াছেন, তাহা শিশুদের মানাইলেও মানাইতে পারে, কোনও সাংসদের পক্ষে তাহা অশোভন। মন্ত্রিত্ব ঘুচিবার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িটি ছাড়িয়া দেওয়া তাঁহার কর্তব্য ছিল। তিনি সম্ভবত সে কথা ভাবিয়াও দেখেন নাই। অর্ধচন্দ্র জুটিবার পর অন্তত ভাবুন। রাজনৈতিক বাহুবলীর সহিত দেশের আইনসভার সদস্যের যে ফারাক আছে, এই কথাটি তিনি স্মরণে রাখিলে তাঁহার নির্বাচনী ক্ষেত্রের, এবং রাজ্যের, সম্মান খানিক হইলেও বাঁচে।

Advertisement

তবে, অধীর চৌধুরী উদাহরণমাত্র। এক বার বাড়ি পাইলে তাহা ছাড়িতে অনেকেরই বুক ফাটিয়া যায়। তাঁহাদের স্বভাব সংশোধন অপেক্ষা বৃহত্তর প্রশ্ন হইল, সাংসদ অথবা মন্ত্রীদের আদৌ বাংলো বা ফ্ল্যাট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকিবে কেন? নবাবি আমল বহু কাল পূর্বেই ফুরাইয়াছে, কিন্তু অভ্যাসটি মরে নাই। এখনও মন্ত্রী-অমাত্যদের জন্য বাড়ির ব্যবস্থা করিয়া দেওয়া সরকারের কর্তব্য হিসাবেই গণ্য হইতেছে। বিশ্বের অধিকাংশ সভ্য দেশ এই রীতিটিকে ইতিহাসের পাতায় ত্যাগ করিয়া আধুনিকতার পথে হাঁটিয়াছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দফতরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হইয়া থাকে। তাঁহাদের প্রতি অবান্তর সম্মান প্রদর্শনের জন্য নহে, বরং নিরাপত্তা ইত্যাদির কারণেই সেই ব্যবস্থা জরুরি। কিন্তু, পদের ওজনে যাঁহারা ততখানি গুরুতর নহেন, তাঁহাদের বাসস্থানের জন্য সরকার অথবা রাষ্ট্র উতলা হইবে কেন? আর পাঁচ জন লোক কর্মসূত্রে দিল্লিপ্রবাসী হইলে যে ভাবে মাথা গুঁজিবার ঠাঁই জুটাইয়া লহেন, সাংসদ এবং ছোট মন্ত্রীরাও তাহাই করিবেন। নিজের জন্য বাড়ি খুঁজিবার মতো সহজ কাজও যদি তাঁহাদের দ্বারা না হয়, তবে দেশের আইন প্রণয়নের গুরুদায়িত্ব তাঁহাদের স্কন্ধে ন্যস্ত করা যায় কি?

সংগঠিত ক্ষেত্রের অধিকাংশ চাকুরিতেই বেতনের সহিত একটি আবাসন ভাতা দেওয়া হইয়া থাকে। সাংসদরা যখন বাড়ির কাপড় কাচাইবার জন্যও ভাতা পাইয়া থাকেন, আবাসন ভাতাও পাইবেন। দিল্লিতে বাড়িভা়ড়ার বাজার দরের সহিত সঙ্গতি রাখিয়াই সেই ভাতা স্থির করা যাইবে। এইখানেই সরকারের দায়িত্ব ফুরাইয়া যায়। কোন সাংসদ কোথায় থাকিবেন, কত টাকা ভাড়ায় বাড়ি লইবেন, সিদ্ধান্তগুলি একান্তই তাঁহাদের। অধীর চৌধুরী যে দুঃখ পাইলেন, অতঃপর অন্য কোনও সাংসদকে আর সেই মনঃকষ্টে ভুগিতে হইবে না। যেখানে ইচ্ছা, সেখানেই থাকিতে পারিবেন। দিল্লির প্রাণকেন্দ্র মন্ত্রী-সাংসদদের বাংলো ও ফ্ল্যাটের জন্য যে জমি দখল হইয়া আছে, সরকারও তাহা বেচিয়া এই পাট চুকাইয়া দিতে পারিবে। অনেক কাজ বকেয়া পড়িয়া আছে। সরকার সে দিকে মন দিক। মন্ত্রীদের বাড়ির কথা না ভাবিলেও চলিবে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement