ভিয়েতনামের গত শতাব্দীর ‘বোট-পিপ্ল’দের কথা মনে পড়িবেই। এই শতাব্দীতে মায়ানমার হইতে নিরাপত্তার খোঁজে সমুদ্রে ভাসিয়া পড়া রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের কথাও। এ বার ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়া ইউরোপীয় সৈকতের নিরাপত্তায় ভিড়িবার জন্য মরিয়া আরব ও উত্তর আফ্রিকার উদ্বাস্তুদের একই ভাবে মাঝসমুদ্রে মারা পড়িতে দেখা যাইতেছে। কখনও অতিরিক্ত আরোহীর চাপে, কখনও জাহাজের ঢেউয়ের ধাক্কায় বা সরাসরি সংঘর্ষে নৌকারোহী উদ্বাস্তুরা তলাইয়া যাইতেছেন। এই ভাবে প্রায় দুই হাজার শরণার্থীর মৃত্যুর পর ইউরোপীয় বিবেক নড়াচড়া করিতেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্ণধারগণ এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হইয়া আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়া হইতে ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী উদ্বাস্তুদের সাগর পাড়ি দেওয়া হইতে নিরস্ত করিবার ও কিছু উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিবার সিদ্ধান্তে পৌঁছাইয়াছেন। এই উদ্বাস্তুরা প্রধানত গৃহযুদ্ধ-জর্জরিত সিরিয়া, এরিট্রিয়া বা সোমালিয়া হইতে ইউরোপযাত্রী, বাকিরা লিবিয়া, আলজিরিয়া, মিশর হইতে। ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ অর্থাৎ আফ্রিকার উপকূলে এই মুহূর্তে দশ লক্ষ আরব ও আফ্রিকান শরণার্থী সাগর পাড়ির অপেক্ষায়। প্রথম সুযোগেই কুড়ি জন আরোহীর জন্য তৈয়ার ডিঙিতে গাদাগাদি করিয়া দেড়শো জন উঠিয়া পড়িবেন। অতঃপর নিরুদ্দেশ-যাত্রা।
যে সব দেশ হইতে মানুষ পালাইতেছে, সেগুলির বর্তমান দশার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী পশ্চিম দুনিয়াই। হয় এই দেশগুলি ইউরোপের সাবেক উপনিবেশ, নতুবা তাহাদের অভ্যন্তরীণ গৃহবিবাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার বিবিধ ইউরোপীয় সহযোগী অস্ত্র ও রসদ লইয়া হস্তক্ষেপ করিয়া পরিস্থিতি জটিলতর করিয়াছে অথবা লিবিয়ার মতো কোনও কোনও দেশে সরাসরি জমানা-বদল ঘটাইয়া চরম অরাজকতা, নৈরাজ্য ও অস্থিরতা সৃষ্টি করিয়া নিরীহ, নিরস্ত্র নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিঘ্নিত করিয়াছে। এই উদ্বাস্তুদের দায় তাই ইউরোপ এড়াইতে পারে না। প্রত্যক্ষ দায় ছাড়াও শরণার্থীদের আশ্রয় দিবার যে নৈতিক দায় সভ্যতার থাকে, তাহার কথা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি নিয়ত স্মরণ করাইতেছে।
অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মনোভাবটি হইল: কিছু লোককে আশ্রয় দিলে অন্যরাও উৎসাহিত হইয়া ডিঙা ভাসাইবে, বরং কয়েকটি ডিঙি মাঝদরিয়ায় উল্টাইলে সেটা অপেক্ষমাণ শরণার্থীদের সমুদ্র পাড়ি দিতে নিরুৎসাহিত করিবে। কোনও কোনও দেশ আবার অপেক্ষমাণ শরণার্থীদের জন্য সৈকতে শিবির গড়িয়া ইউরোপে অভিবাসনের অনিশ্চয়তা এবং সমুদ্র-পাড়ির বিপদ সম্পর্কে প্রচার চালাইবার পক্ষপাতী। লক্ষ্য একটাই: শরণার্থীর সংখ্যা যথাসম্ভব সীমিত রাখা। জার্মানি সর্বাধিক সংখ্যক শরণার্থী গ্রহণের অঙ্গীকার করিয়াছে। শুরুর দিকে ইতালীয় নৌবহর অগণিত শরণার্থীকে রক্ষা করিয়া নিজ দেশে পুনর্বাসনও দিতেছিল। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য সদস্যরা এমন পাইকারি পুনর্বাসন নীতির বিরোধিতা করে। ফলে এই শরণার্থীদের আশ্রয় দিবার ব্যাপারে ইউরোপ ক্রমশ কৃপণ হইতেছে। শরণার্থীদের ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়াও এই কার্পণ্যের কারণ। রাজনৈতিক ইসলামের যে জেহাদি অবয়বটি সম্প্রতি ইউরোপের দেশে-দেশে প্রকট হইতেছে, তাহাতে সৃষ্ট আতঙ্ক যে আরব শরণার্থীদের আশ্রয়দানের প্রশ্নে দ্বিধাগ্রস্ত হইবে, সেটা আশ্চর্যের নয়।