সম্পাদকীয় ২

স্থূল সমস্যা

ন ধর শিশু লইয়া বাবা-মা গর্ববোধ করেন। ক্যালেন্ডারের ছবি হইতে ছড়ার বইয়ের পাতা: সহাস্য শিশুরা নাদুসনুদুস। কিন্তু চিকিৎসকরা বহু দিনই সতর্ক করিয়াছেন, শৈশবে স্থূলত্ব সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নহে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:১৬
Share:

ন ধর শিশু লইয়া বাবা-মা গর্ববোধ করেন। ক্যালেন্ডারের ছবি হইতে ছড়ার বইয়ের পাতা: সহাস্য শিশুরা নাদুসনুদুস। কিন্তু চিকিৎসকরা বহু দিনই সতর্ক করিয়াছেন, শৈশবে স্থূলত্ব সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নহে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক সমীক্ষা বলিতেছে, ভারতে ৫ হইতে ১৯ বৎসরের ২২ শতাংশ শিশু স্থূলকায়। উদ্বেগের কথা। শৈশবের স্থূলতা হইতে অল্প বয়সেই নানা রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। ডায়াবিটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, বাত প্রভৃতি যে সব অসুখ প্রৌঢ়ত্বে প্রত্যাশিত, শৈশবের স্থূলতা সেগুলিকে যৌবনেই আহ্বান করিয়া আনে। মেয়েদের হরমোন-জনিত নানা সমস্যাও দেখা দেয়। এক কথায়, শৈশবে ওজন বাড়িলে আয়ু কমিবে, জীবনের মানও কমিবে, এ বিষয়ে গবেষক ও চিকিৎসকেরা এখন নিশ্চিত। কথাগুলি বহু-আলোচিত, কিন্তু যথেষ্ট দাগ কাটিতে পারে নাই। হয়তো তাহার কারণ, সরকারি ভাবে বিষয়টি লইয়া যথেষ্ট হেলদোল হয় নাই। কেন, তাহা বোঝা কঠিন নহে। আজও দেশের তিন জন শিশুর এক জনেরই বয়সের অনুপাতে ওজন কম। শিশু-অপুষ্টির সমস্যা লইয়া সরকার নাজেহাল। ফলে সরকারি নানা সমীক্ষাতেও শৈশবে স্থূলত্ব সম্পর্কিত প্রশ্নগুলি রাখা হয় না। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষায় প্রাপ্তবয়স্কদের স্থূলত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইলেও, শিশুদের ক্ষেত্রে প্রশ্ন কেবল অপুষ্টির বিষয়ে। অতএব শৈশবে স্থূলত্বের প্রকোপ কতটা বাড়িতেছে, সে বিষয়ে তেমন তথ্য হাতে নাই। এ বার বিশ্ব স্বাস্থ্য সমীক্ষার ফল ইঙ্গিত দিল যে, অবিলম্বে শিশু ও কিশোরদের স্থূলত্বকে স্বাস্থ্যনীতির বিষয় করা প্রয়োজন। না হইলে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবিটিসের চিকিৎসায় দেশের অপরিমিত ব্যয় হইবে।

Advertisement

উন্নত দেশগুলিতে ইতিমধ্যেই শৈশবের স্থূলত্বকে জনস্বাস্থ্যের সমস্যা বলিয়া স্বীকার করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট-পত্নী মিশেল ওবামা শৈশবের স্থূলত্ব রোধে রীতিমত প্রচার করিতেছেন। কিন্তু ভারত-সহ উন্নয়নশীল দেশগুলির হুঁশ হয় নাই। ইহার ফলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সূচনা হইয়াছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলিতেছে, উন্নত দেশগুলিতে দরিদ্র শিশুরা স্থূল হয়। আর উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ধনী পরিবারের শিশুরা স্থূল হয়। ইহার কারণ, পশ্চিমের দেশগুলিতে সস্তা খাবারে অতিরিক্ত চিনি এবং স্নেহপদার্থ থাকে। স্বাস্থ্যকর, তাজা খাবার মহার্ঘ, তাহা ধনীরাই খাইতে পারে। অপরপক্ষে ভারতে তেল, ঘি, মিঠাই খাওয়া ধনী পরিবারগুলির জীবনযাপনের অঙ্গ। প্যাকেটজাত মুখরোচক খাবারেও চিনি-তেল অধিক। এই সকলই শিশুদের বিপন্ন করিতেছে।

বস্তুত অপুষ্টি ও অতিপুষ্টি একই সমস্যার এ পিঠ-ও পিঠ। এ দেশে এত শিশু যে অপুষ্ট, তাহা খাদ্যের অভাবের কারণে নহে। তিন-চার বৎসরের একটি শিশুর জন্য যেটুকু খাদ্যের প্রয়োজন হয়, দরিদ্র পরিবার তাহা জোগাড় করিতে না পারিলেও সরকারি প্রকল্প হইতে সেটুকু মেলে। তবু যে অপুষ্টি রহিয়াছে, তাহা অনেকাংশে খাদ্যাভ্যাসে ত্রুটির কারণে। কখন, কতটা খাওয়া প্রয়োজন, অল্প খরচে কী করিয়া পুষ্টি মিলিতে পারে, সে বিষয়ে অভিভাবকরা অবহিত নন। একই সমস্যা ধনী পরিবারেও। সব্জি, ফল, শস্য ও আমিষের যে সুসংহত মিশ্রণ শিশুর পক্ষে উপকারী, শিশু-কিশোরদের যে নিয়মিত ছোটাছুটি করিয়া খেলা প্রয়োজন, বহু শিক্ষিত পরিবার তাহা জানিয়াও মানে না। শিশুর পরীক্ষার নম্বর বাড়াইতে তাঁহারা আগ্রহী, ওজন বাড়িবার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। ইহা ভুল। অসুস্থতা সাফল্যকে ব্যর্থ করিয়া দেয়।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement