গতকাল উমবের্তো একো প্রয়াত হইলেন। তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, নিবন্ধকার, সাহিত্য সমালোচক, দার্শনিক ও ভাষাতত্ত্ববিদ। ইতালীয় এই মানুষটি ছিলেন প্রগাঢ় পণ্ডিত হইয়াও পপ তারকার ন্যায় বিখ্যাত, যে পাঠক কোনও কালে তাঁহার একটিও বই পড়েন নাই, তিনিও তাঁহার নামটি বিলক্ষণ জানিতেন। ১৯৩২ সালে জন্মাইয়াছিলেন উমবের্তো, বেনিতো মুসোলিনির জমানায় এক বার ‘শিশু ফাসিস্ত’দের জন্য আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কারও পাইয়াছিলেন। উমবের্তোর পিতা চাহিয়াছিলেন তিনি খ্যাত উকিল হইবার জন্য পড়াশোনা করুন, কিন্তু তিনি মধ্যযুগীয় সাহিত্য ও দর্শন লইয়া পড়িতে শুরু করেন তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে, এবং তাঁহার থিসিসটি লিখেন প্রখ্যাত যাজক-দার্শনিক টমাস অ্যাকুইনাস-কে লইয়া, পাশ্চাত্য বৌদ্ধিক চর্চায় যাঁহার অবদান ও প্রভাব অসীম। উমবের্তো ক্যাথলিক চার্চের উৎসাহী সদস্য ছিলেন, কিন্তু পরে তাহা ত্যাগ করেন। তিনি সরকারি সম্প্রচার কেন্দ্রে সাংস্কৃতিক সম্পাদকের পদে কাজ করেন, একটি পত্রিকার প্রবন্ধ সম্পাদকও ছিলেন, কিন্তু মূল কাজ হিসাবে বাছিয়া লন বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা ও লেখালিখিকে। বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়াইয়াছেন ও বহু বিশ্ববিদ্যালয় হইতে একাধিক সম্মান পাইয়াছেন। ভাষাতত্ত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ
পত্রিকার তিনি ছিলেন সহ-প্রতিষ্ঠাতা। উমবের্তো পাইয়াছেন ইতালীয় সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার, ফ্রান্সের ‘লেজঁ দ্য’নর’, এবং ছিলেন আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স-এর সাম্মানিক সদস্য।
যদিও তিনি সাধারণ্যে খ্যাতি লাভ করিয়াছেন মূলত সাহিত্যিক হিসাবে, উমবের্তো প্রথমত ছিলেন এক পণ্ডিত। প্রচুর প্রবন্ধের গ্রন্থে তো বটেই, তাঁহার সাতটি উপন্যাসেও সেই অগাধ পাণ্ডিত্যই প্রতিফলিত হইয়াছে। তাঁহার দুইটি বাড়ি ছিল দুইটি শহরে, উভয়ের গ্রন্থাগার মিলাইয়া ছিল পঞ্চাশ হাজার বই। তাঁহার সর্বাধিক সফল উপন্যাস দ্য নেম অব দ্য রোজ (বিক্রয় হইয়াছে এক কোটি কপিরও অধিক) এক রহস্য-কাহিনি, যেখানে হত্যা, চক্রান্ত, তদন্তকারী ও তাহার সহকারী— সকলই রহিয়াছে, কিন্তু তাহার মধ্যে উমবের্তো মিশাইয়াছেন ভাষাতত্ত্ব, বাইবেলের বিশ্লেষণ, মধ্যযুগের ইতিহাস, সাহিত্যতত্ত্ব। এই মিলাইবার কারিগর হিসাবে তিনি ছিলেন অতি নিপুণ। এক তুখড় ভাষাতাত্ত্বিক হিসাবে, মানুষের সংকেত ও চিহ্নের সন্ধানে পোশাক ব্যানার ফেস্টুন কার্টুনের নিকটেও সমান অনুসন্ধিৎসা লইয়া যাইতেন, যেমন সঞ্চরণ করিতেন জটিল শাস্ত্রের অন্দরে। তাঁহার সমালোচনা কিছু কম হয় নাই, কেহ বলিতেন, এ কেমন পণ্ডিত যাঁহার কাছে কোনও সাংস্কৃতিক কাণ্ডই তাৎপর্যহীন ও অকিঞ্চিৎকর বলিয়া গণ্য হয় না? আবার তাঁহার ফুকো’জ পেন্ডুলাম বইয়ের নিন্দা করিয়া সলমন রুশদি লিখিয়াছিলেন, বইটি সম্পূর্ণ নীরস, গুচ্ছের উদ্ভট তত্ত্ব কপচাইয়া হৃদয়কে আড়ষ্ট করিয়া রাখে। যখন একটি সাহিত্যসভায় রুশদি ও একো উভয়কেই আমন্ত্রণ জানানো হইয়াছিল নিজ রচনা হইতে পাঠ করিবার জন্য, একো পাঠ করিয়াছিলেন ফুকো’জ পেন্ডুলাম হইতেই। কট্টর পণ্ডিতদের বিপরীত অবস্থানে দাঁড়াইয়া একো বলিয়াছিলেন, মিকি মাউস একটি জাপানি হাইকুর ন্যায়ই নিখুঁত হইতে পারে। অ-পশ্চিমীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের নিরিখে পাশ্চাত্যকে দেখিবার প্রয়াস হিসাবে তিনি এক কার্যক্রম চালু করিয়াছিলেন বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাহার সেমিনারগুলি হইতে জন্ম লইয়াছে গ্রন্থ, যেখানে চিনা ও ইউরোপীয় পণ্ডিতরা আলোচনা করিয়াছেন তাঁহাদের এলাকায় জ্ঞানের সৃষ্টি লইয়া। আপাত-বিপ্রতীপ শ্রেণি ও মার্গের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল থাকিয়া, তাহাদের মিশ্রণ ও ঘর্ষণ দেখিতে উৎসুক ছিলেন বলিয়াই হয়তো এই ছুতমার্গহীন পণ্ডিত আরও বহু কাল প্রাসঙ্গিক থাকিবেন।
যৎকিঞ্চিৎ
দু’টাকায় চাল পাওয়া যাচ্ছে, ২৫১ টাকায় স্মার্টফোন। খুব সরু চোখও বৃহৎ বিস্ময়ে চড়কগাছ। তা হলে কি সত্যিই এমন দিন আসবে, যখন ভিখিরিরা গাড়ি চালিয়ে এসে ভিক্ষে নিয়ে আবার পোঁ করে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে যাবে? পাড়ার মাতাল অশেষ করুণায় নেড়িকে খাইয়ে দেবে শ্যাম্পেন? যখন সমাজতান্ত্রিক পার্টি ঝাড়েবংশে উঠে যাবে, কারণ সর্বহারারা শপিং মল সাফ করে লালচে দোলচে গাবানা কিনছে ব্রিগেড যাওয়ার জন্য? মিরাক্লের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ!