পাঠ্যবইয়ে ঢাকছে ইতিহাস? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
“বয়স খুব বেশি হলে ১৫ হবে মেয়েটির। তার বেশি অন্তত আমার মনে হয়নি। কব্জি থেকে বাহু পর্যন্ত গোছা গোছা বালা পরে দাঁড়িয়ে আছে সে। গলায় হার। তা বাদে আর কিছু নেই শরীরে। তবে তা নিয়ে মেয়েটির ভাবনা নেই। এক হাত কোমরে আর অন্য হাতটি ঝুলিয়ে রেখে সে দিব্যি দাঁড়িয়ে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে! যেন দুনিয়ায় কোথায় কী হচ্ছে, সে ব্যাপারে পরোয়াই নেই। ওর মতো সুন্দর জিনিস দু’টি দেখিনি...’’ চার ইঞ্চির ছোট্ট এক ব্রোঞ্জমূর্তি নিয়ে লিখেছিলেন ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ মর্টিমার হুইলার। যে মূর্তি ‘ডান্সিং গার্ল অফ মহেঞ্জোদারো’ নামে শিল্পের দুনিয়ায় সমাদৃত। সিন্ধু সভ্যতার সেই শিল্প নিদর্শনই আপাতত ভারতীয় শিক্ষাবিদদের ‘লজ্জা’র কারণ!
নবম শ্রেণির সরকারি ইতিহাস বইয়ে ‘হিস্ট্রি অফ আর্টস’ শীর্ষক অধ্যায়ে ওই মূর্তির ছবিটিকে ডিজিটাল ‘বসন’ পরানো হয়েছে। নতুন ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মূর্তির অনাবৃত শরীরের অনেকটাই (বুকের উপর থেকে উরু পর্যন্ত) কালো ডিজিটাল পর্দায় ঢাকা। যা দেখে মূর্তিটিকে কালো পোশাক পরানো হয়েছে বলে ভ্রম হতে পারে। আর তা থেকেই বিতর্কের শুরু।
সিন্ধু সভ্যতার সেই কিশোরীর মূর্তি। ছবি: সংগৃহীত।
ছোটবেলার ইতিহাস বইয়ে মহেঞ্জোদারোর ওই কিশোরীমূর্তির ছবি নতুন কিছু নয়। বহু যুগ ধরে স্কুলের পড়ুয়ারা ওই ছবি দেখেছে ইতিহাস বইয়ে। আগে তাকে আবৃত করার প্রয়োজন মনে হয়নি। এখন কেন হল?
দেশের সরকারি পাঠ্যপুস্তকে পড়ুয়ারা কতটা পড়বে, জানবে এবং শিখবে, তার দায়িত্ব থাকে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং-এর (এনসিইআরটি) হাতে। পাঠ্যপুস্তকে ছবি ঢাকার এই সিদ্ধান্তও তাদেরই। কেন সিদ্ধান্ত, সে ব্যাপারে কোনও সরকারি ঘোষণা না হলেও এনসিইআরটি সূত্রে খবর, ছবিটিকে নগ্নতার প্রকাশ বলে মনে করা হয়েছে বলেই ঢেকে দেওয়া হয়েছে। সে ব্যাখ্যা শুনে শিল্পী, ইতিহাসবিদ, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস চর্চাকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, তবে কি দেশের বিভিন্ন মন্দিরে, স্থাপত্যে যত নগ্ন মূর্তির ভাস্কর্য রয়েছে, সেগুলিও ঢেকে দেওয়া হবে?
খাজুরাহোর মন্দিরের গায়ের ভাস্কর্য। ছবি: সংগৃহীত।
কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ দীপালি ভট্টাচার্য। ছাত্রাবস্থায় নিজে পড়েছেন, পরে ছাত্রছাত্রীদেরও পড়িয়েছেন মহেঞ্জোদারোর ওই ব্রোঞ্জমূর্তি নিয়ে। আর্ট কলেজের একটি অধ্যায়ই ছিল ওই ‘ডান্সিং গার্ল অফ মহেঞ্জোদারো’ বিষয়ে। দীপালি বলছেন, ‘‘আমরা তো ওই মূর্তিকে ভাস্কর্য হিসাবেই দেখেছি বরাবর। কখনও মনে হয়নি নগ্ন নারী। তা ছাড়া, তেমন নগ্নতার বহু প্রদর্শন তো ওড়িশার কোণার্কের সূর্য মন্দির, বাংলার অনেক টেরাকোটার মন্দিরেও রয়েছে। খাজুরাহোতেও রয়েছে। সেই সব শিল্পকে যদি শুধু নগ্নতার নিরিখে বিচার করা হয়, তবে তো তার শিল্পগুণ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বকেও অস্বীকার করা হয়। সেটা হলে তো বলতে হবে, দেশের শিল্পীদের জন্য অন্ধকার দিন আসতে চলেছে।’’
বিস্ময়ের কথা হল, পূর্বতন এনডিএ সরকার যখন ছিল, যখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন মুরলী মনোহর যোশী, তখনও সিন্ধু সভ্যতার ওই কিশোরীর ব্রোঞ্জমূর্তির ছবি ঢাকার দরকার পড়েনি। এনসিইআরটি-রই বইয়ে ইউপিএ সরকারের আমলেও ‘পর্দানসীন’ না হয়েই থেকেছে ডান্সিং গার্ল অফ মহেঞ্জোদারোর ছবি। তা হলে হঠাৎ তফাত হল কিসে? কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়-এর অধ্যাপিকা অন্বেষা সেনগুপ্তর মতে, তফাত হয়েছে মানসিকতায়। তিনি বলছেন, ‘‘এটা আসলে ইতিহাসমনস্কতার অভাব। প্রত্যেক সরকারই ইতিহাসকে নিজের মতো নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কারণ, ইতিহাস সরকারের দরকার। সরকার নিজের পরিচিতি তৈরি করে ইতিহাসের মাধ্যমে। তাদের সুবিধাজনক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে নিয়ন্ত্রিত ইতিহাস পেশ করা হয়। তবে এনসিইআরটি-র বইগুলো আগে ভাল ছিল। ইউপিএ অনুমোদিত বইয়ে কংগ্রেস নিজের কথা গৌরবান্বিত করে বললেও কিছু বিষয় পক্ষপাতহীন ভাবে রাখা হয়েছিল। দেশের পড়ুয়াদের ইতিহাসমনস্ক করার একটা চেষ্টাও ছিল তাতে। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে সেই ইতিহাস ক্রমাগত যে ভাবে বদলানো হচ্ছে, তাতে এক বিশেষ আদর্শের প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে।’’
টেরাকোটা মন্দিরের ভাস্কর্য। ছবি: সংগৃহীত।
ঠিক কী রকম বদল চোখে পড়ছে? অন্বেষা জানাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের পড়ার ভার কমানোর নামে বিভিন্ন অধ্যায় ছোট করে দেওয়া হয়েছে। সুলতানি আমলের ইতিহাস কমানো হয়েছে। অন্য দিকে, হরপ্পা সভ্যতাকে হিন্দুদের সভ্যতা হিসাবেও দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কোথাও কোথাও। তবে মহেঞ্জোদারোর কিশোরী মূর্তির নগ্নতা ঢাকার চেষ্টা করে খানিক জোর করে যৌনতা আরোপ করা হল বলেও মনে হচ্ছে তাঁর। তিনি বলছেন, ‘‘এতে একটি বিশ্ববন্দিত শিল্পের নগ্নতা নিয়েই বেশি সচেতন করে তোলা হল।’’ এ ব্যাপারে একই মত দীপালিরও। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘গোটা দুনিয়া যেখানে ছোট থেকেই যৌনতার শিক্ষা দেওয়ার পক্ষে কথা বলছে, সেখানে ওই ছোট্ট ব্রোঞ্জমূর্তিকে ঢাকা দিয়ে কী বোঝাতে চাইল ওই সংস্থা? তবে কি ছোটদের নিয়ে ওড়িশার মন্দিরে যাওয়া যাবে না, অজন্তা-ইলোরায় যাওয়া যাবে না?’’
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর দেবজিৎ দত্ত অবশ্য মনে করছেন, ক্লাস নাইনের এক জন ছাত্র/ছাত্রীর মানসিক বা শারীরিক বিকাশ যে স্তরে থাকে, তার উপর ওই ভাস্কর্যের উপস্থাপনার সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনা করেই সম্ভবত সংশ্লিষ্ট মূর্তিটির প্রকাশে কিছু পরিবর্তন আনা হয়ে থাকতে পারে। যদিও এক জন ইতিহাসবিদ হিসাবে তিনিও মনে করেন, ‘‘ইতিহাসের তথ্য একজন গবেষক বা ইতিহাসবিদ যে ভাবে পান, সেই তথ্যকে ঠিক সেই আলোকেই গ্রহণ করা প্রয়োজন। ইতিহাসের ব্যাখ্যা অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের তথ্য বা উপাদানের সঙ্গে কোনও ধরনের কাটাছেঁড়া বা পরিবর্তনের সুযোগ নেই।’’
টেরাকোটা মন্দির গাত্রের শিল্পকলা। ছবি: সংগৃহীত।
এনসিইআরটি আবার ওই বদল এনেছে শিল্পকলার ইতিহাসের অধ্যয়েই যে প্রসঙ্গে সংস্কৃত কলেজের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক কণাদ সিংহ বলছেন, ‘‘শিল্পকে যদি সত্যিই বুঝতে হয়, তবে তো শিল্পকর্মটি প্রকৃত যে রকম, সে ভাবেই দেখাতে হবে।’’ অর্থাৎ যুক্তি যা-ই থেকে থাকুক, ইতিহাসকে আড়াল করার পক্ষে নন কেউ। ‘নগ্নতার প্রকাশ’ নিয়ে দ্বিমত থাকলেও ইতিহাস বিকৃতির ঘোরতর বিপক্ষে বিশিষ্টরা। এখন দেখার এনসিইআরটি এবং তার নিয়ন্ত্রণকারী সরকারের ওই প্রয়াস কত দূর যেতে পারে!