— প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
বাম আমল থেকেই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা রাজ্যের সরকারি, সরকারপোষিত স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিল রান্নার দায়িত্বে ছিলেন। হিসাব বলছে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে ২০১০ নাগাদ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের হাতে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১১-এ ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয়নি। ২০২৬-এ এসে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ঘনাচ্ছে, দাবি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের একাংশের।
রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা করেন, কলকাতার স্কুলগুলির জন্য মিড-ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হবে ইসকন-কে। কলকাতাকে পাইলট প্রজেক্ট হিসাবেও ঘোষণা করেন তিনি। পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের কথায় স্পষ্ট হয়, কলকাতায় সফল হলে আগামী দিনে রাজ্যের অন্য এলাকায়ও মিড-ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে ইসকন বা তেমন কোনও সংগঠনের হাতে।
এরই সঙ্গে অনিবার্য ভাবে উঠছে যে প্রশ্নটি, তা হল— কী হবে গত ১৬ বছর মিড-ডে মিলের সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের? পরিসংখ্যান বলছে, কলকাতার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের জন্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার রাঁধুনি রয়েছেন মিড-ডে মিলের জন্য। গোটা রাজ্যে এই সংখ্যাটা প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজারের কাছাকাছি। কলকাতার দায়িত্ব ইসকনকে দেওয়ার ঘোষণায় মিড-ডে মিল কর্মী রোজগার হারানোর আশঙ্কায়।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত এই মহিলারা, তাঁদের রোজগারের নিশ্চয়তা আদায় করতে এ বারে পথে নামতে চলেছেন। সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটু অনুমোদিত ‘পশ্চিমবঙ্গ মিড ডে মিল কর্মী ইউনিয়ন’ আগামী ১০ জুলাই কলকাতায় বিক্ষোভ দেখাবে বলে জানান সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মধুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কলকাতার ৬৫টি কেন্দ্রে খাবার তৈরি হয়, তা পৌঁছে দেওয়া হয় স্কুলে স্কুলে। সরকারের অনুমতিক্রমে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ৩৬৬৯জন। সঙ্গে রয়েছেন সহযোগীরাও। সকলের রোজগার কি বন্ধ হয়ে যাবে? উঠছে প্রশ্ন। ইতিমধ্যে পথে নেমেছেন মিড-ডে মিল কর্মীরা। শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যের নানা প্রান্তেই চলছে বিক্ষোভ।
গত ২৩ জুন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু দিবসে রেড রোডে শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানে স্কুলশিক্ষা মন্ত্রী জানান, কলকাতায় ইসকনের পাইলট প্রজেক্ট সফল হল অন্যত্র তা চালু হতে পারে। কিন্তু রাঁধুনিদের চাকরি থাকবে কি না, এ প্রশ্নে উত্তরে প্রথমে স্কুলশিক্ষা মন্ত্রী জানান, তাঁদের তো বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাজেটে সত্যিই অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন মিড-ডে মিলের রাঁধুনিদের এক হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হবে। তবে, কলকাতার ক্ষেত্রে তাঁদের চাকরি আদৌ থাকছে কিনা সেই বিষয়ে সরকার কোনও স্পষ্ট নির্দেশ বা বিবৃতি দেয়নি।
মধুমিতা জানান, নিয়ম অনুযায়ী স্কুলের পড়ুয়াসংখ্যার উপর নির্ভর করে রাঁধুনির সংখ্যা। প্রতি ২৫ জন পড়ুয়ার জন্য একজন রাঁধুনি নিয়োগ করা হয়, তার উপর ৪১ জন পড়ুয়ার জন্য আরও এক জন এবং ১০০ জন পড়ুয়ার জন্য আরও একজন রাঁধুনি থাকেন। অর্থাৎ ১০০ জন পড়ুয়া রয়েছে এ রকম স্কুলে তিন জন রাঁধুনী থাকার কথা। তার পর প্রতি ১০০ জন পড়ুয়ার জন্য এক জন রাঁধুনি থাকেন। অর্থাৎ ৬০০ পড়ুয়া রয়েছে, এমন স্কুলে রাঁধুনির সংখ্যা হবে ৮। এটি অনুমোদিত সংখ্যা। কিন্তু এ বাইরে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন আরও সহযোগীরা। তবে, সহযোগীদের জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ হয় না। অনুমোদিত পদের ভিত্তিতে যে টাকা পাওয়া যায়, তার থেকেই ভাগ করে দেওয়া হয়।
গত শতকের সাতের দশকে জ্যোতি বসুর আমলেই মহিলা ক্ষমতায়নের স্বার্থে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছিল। ২০১০ নাগাদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে ওই গোষ্ঠীকে মিড-ডে মিলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তাঁরা বর্তমানে তাঁরা দু’হাজার টাকা করে পান। এই মুহূর্তে গোটা রাজ্যে প্রায় ৬-৭ লক্ষ মহিলা মিড-ডে মিলের সঙ্গে যুক্ত।
মিড-ডে মিল কর্মীদের দাবি, এক দিকে যেমন বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা হয়েছে, তেমনই বলে দেওয়া হয়েছে কলকাতার দায়িত্ব নেবে ইসকন। সে ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশিকা না থাকলে ধরেই নেওয়া যায় যে তাঁদের চাকরি থাকছে না। মধুমিতা জানান, এরই প্রতিবাদে আগামী ১০ জুলাই কলকাতায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। এরই পাশাপাশি দাবি থাকবে অসংগঠিত কর্মচারীদের অন্তত ৩৪০টাকা প্রতিদিন হিসেবে বেতন দেওয়ার দাবিও তুলবেন তাঁরা।