নানা ভাবনায় সজ্জিত স্কুলের সরস্বতী পুজো। নিজস্ব চিত্র।
কোথাও ভারত-আফ্রিকার লোকশিল্পের সংমিশ্রণ, কোথাও নারী ক্ষমতায়ন। আবার কোনও কোনও স্কুল মেতে রয়েছে সহজপাঠের ভাবনায়। কোথাও আবার ‘পল্লিসমাজ’— প্রাচীন বাংলার রূপায়ন।
এক সময়ে স্কুলের সরস্বতী পুজো ছিল নবম ও একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের দায়িত্ব। পুজোর বাজার, প্রতিমা থেকে মণ্ডপ সজ্জা—সবই হত নিয়ম মেনে। সঙ্গে থাকত বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে স্কুলে স্কুলে বাণী বন্দনা রূপও। এখন সেখানেও থিমের ছড়াছড়ি।
ভারত-আফ্রিকার লোকশিল্পের সংমিশ্রণ—
ফেলে দেওয়া জিনিস পত্র নিতান্তই ফেলে দেওয়ার নয়। সে কথাই বুঝিয়ে দিচ্ছে বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। ফেলে দেওয়া সে সব জিনিসই তৈরি করছে শিল্পসামগ্রী। শুধু তা-ই নয়, তারা তুলে আনছে সুদূর আফ্রিকার শিল্প। সঙ্গে থাকছে ভারতীয় লোকশিল্পের ছোঁয়া।
শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এ বার তাদের স্কুলের সরস্বতী পুজো একটু অন্য রকম তো বটেই।
‘কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র’—
সার্ধশতবর্ষে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই স্তম্ভকে শ্রদ্ধা জানাতেই সরস্বতী পুজোর মণ্ডপে বিশেষ ছোঁয়া। শরৎচন্দ্র রচিত গল্প-উপন্যাসের শ্রীকান্ত, ইন্দ্রনাথ, সব্যসাচীর মতো নানা চরিত্র উঠে এসেছে মণ্ডপ সজ্জায়। স্কুলের খুদেরাই তুলির টানে ফুটিয়ে তুলছে সব ক’টি চরিত্র। দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্ক বয়েজ় স্কুলের থিম ‘কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র’।
‘বাংলার নারী পথিকৃৎদের স্মরণ’—
বাংলার মহীয়সী নারীদের স্মরণ করার জন্য বেছে নেওয়া সরস্বতী পুজোর মণ্ডপ। শিক্ষা থেকে সাহিত্য— বাংলার নারীদের অবদান নিয়েই মণ্ডপ গড়ে ফেলেছে উত্তর কলকাতার পার্ক ইনস্টিটিউশন। সদ্য শতবর্ষপূর্তি উদ্যাপন করেছে তারা। তবে এই প্রথম নয়, গত কয়েক বছর ধরেই এ স্কুলের পুজোয় থিমের ভাবনা শুরু হয়েছে। চলতি পড়ুয়ারা ‘বাংলার নারী পথিকৃৎদের স্মরণ’ করছে। আদিবাসী শিল্পধারার অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে মণ্ডপ।
‘গৃহকোণে তুমি মূর্তিমতি লক্ষ্মী, জগতের মাঝে তুমি মুক্তিময়ী জ্ঞানদায়ী’—
নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে ভেবেছে যাদবপুর বিদ্যাপীঠও। সমাজে নারীদের দাবি, তাঁদের অধিকারের কথাই তুলে ধরা হচ্ছে স্কুলের মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে। থিমের নাম ‘গৃহকোণে তুমি মূর্তিমতি লক্ষ্মী, জগতের মাঝে তুমি মুক্তিময়ী জ্ঞান দায়ী’। অর্থাৎ লক্ষ্মী হয়ে আলো দাও ঘরে সরস্বতী হয়ে জয় কর বিশ্বকে।
‘পল্লি সমাজ’—
কুলো, ঢেঁকি, গামছা, হাত পাখা দিয়ে মণ্ডপ সাজবে পাণ্ডবেশ্বর জেলা বালিকা বিদ্যালয়ে। থিমের নাম ‘পল্লি সমাজ’। কিছুটা একই আদলে তৈরি হচ্ছে চেতলা বয়েজ় স্কুলের মণ্ডপও। প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
‘সহজপাঠ’—
ঢাকুরিয়া রামচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের এ বছরের ভাবনা সহজপাঠ। আর কয়েক বছর পরই শতবর্ষে পা দিতে চলেছে এই স্কুল। বর্তমানে বেশির ভাগ পড়ুয়াই প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। পঠনপাঠনের পাশাপাশি মেতে উঠেছে স্কুলের পুজো মণ্ডপের সাজসজ্জায়। স্কুলের পড়ুয়ারা নিজে থেকেই পাটকাঠি-সহ আরও সামগ্রী নিয়ে সহজপাঠ ভাবনায় সাজিয়ে তুলছে স্কুলের মণ্ডপ।
সত্যজিৎ : সৃষ্টি ও স্রষ্টা—
উত্তর কলকাতার শ্যামবাজার এভি স্কুলের এ বছরের ভাবনায় সত্যজিৎ রায়। তাঁর হাতে তৈরি ‘গুপী গাইন, বাঘা বাইন’, ‘ভূতের রাজা’-সহ নানা ছবি দিয়েই তৈরি হচ্ছে স্কুলের মণ্ডপ। স্কুলের পড়ুয়ারা তো আছেই, তাদের সঙ্গে শিক্ষকরাও যোগ দিয়েছেন পুজোর সকল দায়িত্বে।
‘ঋতুরঙ্গ’—
বরিশা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এ বছরের ভাবনা ঋতুরঙ্গ। স্কুলের খুদেরা নিজে হাতে ছবি এঁকে তৈরি করছে মণ্ডপ। নানা রঙের হাতে আঁকা ফুলের ছবি দিয়েই সেজে উঠবে বীণাপাণির মণ্ডপ।