চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত।
শেষ হল উচ্চ মাধ্যমিক ২০২৬-এর লিখিত পরীক্ষা। এখনও বাকি প্র্যাকটিক্যাল। দেশের মধ্যে এ রাজ্যেই প্রথম সেমেস্টার পদ্ধতিতে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা হয়েছে এ বার। শুক্রবার, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানালেন, মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ভাবেই শেষ হয়েছে চতুর্থ সেমেস্টার এবং তৃতীয় সেমেস্টারের সাপ্লিমেন্টারি। একই সঙ্গে শেষ হয়েছে পুরনো পদ্ধতিতে উচ্চ মাধ্যমিকও।
এ দিকে এ দিনই জানা গিয়েছে, সভাপতি পদে আসছেন পার্থ কর্মকার। সরে যাচ্ছেন চিরঞ্জীব। উচ্চ মাধ্যমিকের ফলপ্রকাশের আগে এই রদবদল কার্যত নজিরবিহীন বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। চিরঞ্জীব নিজেও বলেছেন, “ভেবেছিলাম ধন্যবাদ পাব, কিন্তু পেলাম সরে যাওয়ার চিঠি।” শুধু তা-ই নয়, সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে চিরঞ্জীব জানিয়েছেন, আপাতত এ বিষয়ে কোনও কথা বলতে বা কিছু ভাবতে রাজি নন তিনি। মানসিক শান্তির জন্য ছুটি কাটাতে চান। তিনি বলেন, “নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল। সেটা আমরা খুব ভাল ভাবে করেছি। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিষয়টা দুর্ভাগ্যজনক। রাজ্য শিক্ষানীতি মেনে আমরা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদকে এক নতুন জায়গায় আনতে পেরেছি। আমি মনে করি ফলপ্রকাশ পর্যন্ত আমার থাকা দরকার ছিল।”
দীর্ঘ টালবাহানার পর সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে গত নভেম্বরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যোগ দিয়েছিলেন চিরঞ্জীব। সে সময় তিনি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি। যদিও তাঁর মেয়াদ শেষের পর আরও ছ’মাস তা বর্ধিত করেছিল শিক্ষা দফতর। আগামী অগস্ট পর্যন্ত ছিল কার্যকালের মেয়াদ। কিন্তু তার অনেক আগেই নজিরবিহীন ভাবে সরিয়ে দেওয়া হল তাঁকে। শুক্রবার জানা যায়, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি পদে আসছেন পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সহ-সচিব পার্থ কর্মকার।
এ দিকে গত কয়েক দিনে ফের উত্তাল হয়ে উঠেছে যাদবপুর। চিরঞ্জীব দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। গত ডিসেম্বরে সমাবর্তন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর এক দল পড়ুয়া অভিযোগ করেন, ইংরেজি বিভাগের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের এক সংখ্যালঘু ছাত্রীর ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছেন বিভাগীয় প্রধান। এ বিষয়ে তদন্ত করতে গড়া হয় পাঁচ সদস্যের তথ্যানুন্ধান কমিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেন রাজ্য সংখ্যালঘু কমিশনের সদস্যেরা। বিভাগীয় প্রধানকে কিছু দিন ছুটিতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও পরবর্তী কালে তাঁর কাজে যোগ দেওয়া নিয়ে কোনও সমস্যা থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন কর্মসমিতির সদস্যেরা।
এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিতে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন ঘিরে শুরু হয়েছে উত্তেজনা। গত ২০ ফেব্রুয়ারি এসএফআই এবং উই দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর পড়ুয়াদের সংঘর্ষের মাঝে পড়ে প্রহৃত হন দুই অধ্যাপক। এর প্রেক্ষিতে তিন ছাত্রকে দু’সপ্তাহের জন্য বহিষ্কার করেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত বুধবার, ওই ছাত্রদের শাস্তি প্রত্যাহারের দাবি নিয়ে উপাচার্যের গাড়ির সমানে বিক্ষোভ দেখান একদল পড়ুয়া। বৃহস্পতিবারও তাঁরা বিক্ষোভ দেখান উপাচার্যের ঘরের সামনে।
শুধু তাই নয়, এর আগে একটি অডিয়ো টেপ ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। চিরঞ্জীব কাজে যোগ দেওয়ার পরই ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মনোজিৎ মণ্ডলের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটি টেপ ভাইরাল হওয়া। অভিযোগ, সেখানে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে কোনও মন্তব্য করেছিল দুই কণ্ঠ। সেগুলি কার তা অবশ্য প্রমাণ হয়নি। কণ্ঠস্বরটি তাঁর নয় বলে দাবি করেছিলেন উপাচার্য। সে সময়ই এগ্জ়িকিউটিভ কাউন্সিলের সরকার মনোনীত সদস্য পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল মনোজিৎকে। যদিও এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু।
চিরঞ্জীব নিজে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির প্রাক্তনী। ২০২১-এর অগস্টে তিনি সংসদ সভাপতি পদে যোগ দেন। ২০২৫-এর অগস্টে তাঁর কার্যকালের মেয়াদ পূর্ণ হলেও দু’দফায় সে মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এই সময়ই তাঁর নেতৃত্বে সেমেস্টার পদ্ধতিতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হয়েছে। পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অডিও ভাইরাল নিয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না, মানসিক ভাবে আমি এখন বিপর্যস্ত। আমি কিছুদিনের জন্য ছুটিতে থাকব। যাদবপুরের উপাচার্য পদ নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেব।”
উল্লেখ্য, আগামী ২ মার্চ মেয়াদ শেষ হচ্ছে চিরঞ্জীবের। এ দিকে উচ্চ মাধ্যমিকে লিখিত পরীক্ষা শেষ হলে প্র্যাকটিক্যাল বাকি রয়েছে। ২ থেকে ২৩ মার্চের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে।