কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় । ছবি: সংগৃহীত।
উচ্চমাধ্যমিকে পডুয়াদের মধ্যে বিজ্ঞানে ভর্তির আগ্রহ কমছে। ইতিমধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক বৃদ্ধি করতে কর্মশালার আয়োজন করেছে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও কি ভুগছে বিজ্ঞান-বিমুখতায়?
হিসাব বলছে, গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়নের মতো বিষয়ে অকৃতকার্যের সংখ্যা সব থেকে বেশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে। তবে এই পরিসংখ্যান মেজর বিষয়ের ক্ষেত্রে নয়। বরং মাইনর হিসাবে যে সব পড়ুয়া এই বিষয়গুলি বেছে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যেই অসাফল্য বেশি। ৫০ শতাংশ পরীক্ষার্থীও পাশ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ।
প্রশ্ন উঠেছে সত্যিই কি জগদীশচন্দ্র বসুর বাংলায় বিজ্ঞানের প্রতি পড়ুয়াদের আগ্রহ কমছে?
শিক্ষকদের একাংশ আঙুল তুলছেন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এবং পড়ুয়াদের অনাগ্রহের দিকে। তবে কোনও কোনও শিক্ষক মনে করেন, এই পরিস্থিতির দায় কিয়দাংশে তাঁদেরও।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, স্নাতকে ‘মাইনর’ বিষয়ে অকৃতকার্যের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এমনও দেখা গিয়েছে কোনও পড়ুয়া চতুর্থ বা পঞ্চম সেমেস্টারে মেজর বিষয়ে ৭৫ শতাংশের উপরে নম্বর পেলেও মাইনের উত্তীর্ণ হতে পারেননি। সে ক্ষেত্রে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং গণিতেই অনুত্তীর্ণের হারই বেশি। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ অনুযায়ী, ষষ্ঠ সেমেস্টারে কোনও পড়ুয়ার মেজর বিষয়ে ৭৫ শতাংশ নম্বর থাকলে তিনি চতুর্থ বর্ষে ‘অনার্স উইথ রিসার্চ’ করার যোগ্যতা অর্জন করবেন। কিন্তু ওই পড়ুয়া যদি কোনও মাইনর বিষয়ে পাশ না করে থাকেন, তা হলে তিনি ওই কোর্সে যোগ দিতে পারবেন না। তাঁর বছর নষ্ট হবে। এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের উপায় খুঁজতেই সম্প্রতি বৈঠকে বসেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সূত্রের খবর, একের পর এক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রফাসূত্র পাওয়া যায়নি।
কারণ খুঁজতে গিয়ে একের পর এক মতামত উঠে আসছে শিক্ষকদের মধ্যে থেকেই। অধিকাংশ শিক্ষকই জানাচ্ছেন, পাঠ্যক্রমের অসমাঞ্জস্যের জন্যই এই পরিস্থিতি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক দেবাশিস সরকার বলেন, “গণিতের ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় সেমেস্টারের সঙ্গে অন্য সেমেস্টারের খুব একটা সামঞ্জস্য নেই। জাতীয় শিক্ষানীতির নিয়ম মানতে হলে এমনটাই করতে হবে।” তিনি জানিয়েছেন, প্রথম বছর অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় সেমেস্টারে ক্যালকুলাসের খুব সাধারণ বিষয়গুলিই রয়েছে পাঠ্যক্রমে। কিন্তু হঠাৎ করেই তৃতীয় সেমেস্টার অর্থাৎ দ্বিতীয় বর্ষ থেকে গণিতের নানা ব্যাখ্যা, জটিল বীজগণিতের বিষয়গুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত গণিত পড়তে গেলে এই বিষয়গুলি নিয়ে পড়তে হয়। ফলে প্রথম বছরের থেকে দ্বিতীয় বর্ষেই পাঠ্যক্রমের ব্যাপক পার্থক্য। এতেই পড়ুয়ারা দিশা হারাচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ, জাতীয় শিক্ষানীতির নিয়মে অনুযায়ী যাঁরা এক বছর পড়াশোনা করেই কোর্স শেষ করতে চান, তাঁদের ‘সার্টিফিকেট কোর্স’-এর শংসাপত্র দেওয়া হবে। দু’বছর হলে ডিপ্লোমা। তাই প্রথমেই জটিল গণিতের অন্তর্ভুক্তি ঘটালে হিতে বিপরীত হতে পারে।
ফলে শিক্ষকেরা মনে করছেন, পড়ুয়ারা সচেতন না হলে এবং শিক্ষকেরা আরও দায়িত্ব না নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। গণিতের মতো পরিস্থিতি পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের ক্ষেত্রেও। যদিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ অবশ্য ইতিমধ্যে পাঠ্যক্রম পরিমার্জনের কথা ভেবেছেন।
শিক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, পড়ুয়ারা মাইনর এবং মেজরের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারছেন না। মাইনর বিষয়ের নম্বরও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাতে প্রয়োজনে কর্মশালা করতে হবে বলে মনে করছেন তাঁরা। অভিযোগ, কলেজে এসেই পড়ুয়ারা দেখছেন পাঠ্যক্রমের চাপ কম, অপেক্ষাকৃত সহজ বিষয় পড়তে হচ্ছে। এতেই তাঁরা খানিক স্বস্তিতে থাকছেন। আখেরে ক্ষতি হচ্ছে তাঁদেরই। অভিযোগ, কোনও কোনও শিক্ষকও মাইনর বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারছেন না। ফলে তার প্রভাব পড়ছে শিক্ষাদানেও।
২০২৩-এ সব পড়ুয়া স্নাতকে ভর্তি হয়েছিলেন, ২০২৬-এ প্রথম তাঁরা অনার্স উইথ রিসার্চ করতে যাবেন। সেখানেই মাইনর বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়াকে একপ্রকার ধাক্কা বলেই মনে করছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। সে ক্ষেত্রে প্রথমেই হাল ধরতে না পারলে আখেরে পড়ুয়াদের ক্ষতি বলেই মনে করছেন শিক্ষকদের একাংশ।