Saraswati Puja 2026

ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গের ভেদচিহ্ন মুছে যাচ্ছে বসন্ত পঞ্চমীর সকালে! বাগ্‌দেবীর আরাধনায় পুরোধা নারী

সময় বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে সরস্বতীপুজোও। স্কুলে-কলেজে এখন বিদ্যাদেবীর আরাধনা করছেন মেয়েরা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০১
Share:

বাগ্‌দেবী সরস্বতী, ভূভারতে সেই সরস্বতীই আবার অন্তঃসলিলা, ত্রিবেণী সঙ্গমে সে স্বচ্ছতোয়ার পবিত্র উপস্থিতি। বেদ-পুরাণে শ্বেতপদ্মাসনা দেবীর পরিচয়, পরিমণ্ডল নিয়ে যত আলোচনাই থাক না কেন, এ বঙ্গে দেবী একান্তই বিদ্যা ও বুদ্ধিদাত্রী। স্কুলে স্কুলে তাঁর আরাধনা। ভক্তদলের বয়স পাঁচ থেকে পঁচিশ। পুজোর অনুষঙ্গে তাই উঠে আসে দোয়াত-খাগের কলম, বই, কখনও হারমোনিয়ম বা তানপুরা থেকে ঘুঙুরও। স্নিগ্ধ শীতল মাঘের সকালখানি বাসন্তী রঙে ছোপানো।

Advertisement

প্রজন্মের পর প্রজন্ম পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে বেদ বেদাঙ্গ বেদান্ত, বিদ্যাস্থানে ভদ্রকালী সরস্বতীর উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছে, বিনা প্রশ্নে। সেই ‘ট্র্যাডিশন’ সমানে চলেছে। অথচ, যাঁর বরাভয়ে বিদ্যালাভ, সর্বশক্তি স্বরূপ বাক্‌-এর অধিশ্বরী এক দেবী, নারী। সেই নারীরই নাকি নেই পূজামন্ত্রে অধিকার!

শিক্ষার আলোয় সে নিদান কাটিয়ে উঠছে সমাজ।

Advertisement

২০০৬, পুরোহিতের নিষ্ঠায় প্রশ্ন তুললেন সদ্য স্কুলের গণ্ডি পেরোনো কয়েক জন ছাত্রী। বসন্ত পঞ্চমীর সকালে যেন অন্য যাত্রা শুরু হল পুরুলিয়ায়। নিস্তারিণী মহিলা মহাবিদ্যালয়ে তার পর থেকে আর কোনও দিন সরস্বতীপুজো করেননি কোনও পুরুষ। বরং তাঁরা পাশে থেকে হাতেখড়ি দিয়েছেন পৌরোহিত্যে। ছাত্রীরাই দেবী আরাধনা করছেন গত ১৮ বছর ধরে। এ বছরও হবে না ব্যতিক্রম, জানিয়েছেন বর্তমান অধ্যক্ষা অজন্তা দাস।

ব্যতিক্রমী ভাবনায় শান দিচ্ছেন নবীন থেকে প্রবীণ সকলেই। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

কলেজের তরফে জানা গিয়েছে, ২০০৬-এই ছাত্রীদের সরস্বতীপুজোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন অধ্যক্ষ নীলিমা সিংহ। সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক ইন্দ্রাণী দেব। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কোনও আগ্রহী ছাত্রী পৌরোহিত্য করার সুযোগ পান এই কলেজে। শর্ত একটাই— শ্রদ্ধা এবং মন্ত্রোচ্চারণের দৃঢ়তা থাকতে হবে। সে জন্য চলে প্রশিক্ষণও।

পরবর্তী কালে অধ্যক্ষার পদে আসেন ইন্দ্রাণী দেব। বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত। জানালেন, প্রাথমিক ভাবে পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের সদস্যেরা প্রশিক্ষণ দিতেন ছাত্রীদের। পরবর্তীকালে সে দায়িত্ব তুলে নেন পৌরোহিত্যের বিশেষজ্ঞ ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। বাছাই করা ছাত্রীদের মধ্যে থেকে একটি দল তৈরি করে দেওয়া হয়। মূল পূজা, নৈবেদ্য অর্পণ, হোমযজ্ঞ, পুষ্পাঞ্জলি— একে একে তাঁরাই সম্পন্ন করেন।

বর্তমান অধ্যক্ষা অজন্তা দাসের কথায়, “মেয়েরা এ বিষয়ে আগ্রহী। আমি নিজেও গর্বিত। এই প্রথা যাতে বছরের পর বছর একই ভাবে চলতে থাকে, তা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।” ইন্দ্রাণী বলেন, “এখানে পুজো শুধু মাত্র ধর্মাচরণ নয়। বরং নিষ্ঠা ও ভক্তির মিশেলে এক উদ্‌যাপন। যাঁরা পুজো করেন সকলেই যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী তা-ও নয়। কিন্তু তাতে পুজোয় ত্রুটি ঘটে না। আসলে এ হল বিদ্যার আরাধনা। তাই জ্ঞানই হোক ছাত্রীদের একমাত্র অভীষ্ট।”

শুধু পুরুলিয়া নয়। এই একই ছবি হাওড়ার বালিতেও। গত কয়েক বছর ধরেই বালির বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয়ের সরস্বতীপুজোর ভারও স্কুলের ছাত্রীদের উপরই ন্যস্ত। গত চার বছর ধরে এখানে পুজো করছে দেবারতি এবং দেবদত্তা চক্রবর্তী। জন্মপরিচয়ে তারা ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। তাই পৌরোহিত্যের প্রারম্ভিক পাঠ বাবাই দিয়েছেন। কিন্তু সেখানেই আটকে নেই বঙ্গশিশু বালিকা বিদ্যালয়। ২০২৪ থেকে শুরু হয়েছে আর এক প্রথা। স্কুলের আর এক ছাত্রী অনিন্দিতা দাস করেছিলেন সংস্কৃত মন্ত্রের বঙ্গানুবাদ। অনিন্দিতা এখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। দেবারতি প্রথম বর্ষের। আর দেবদত্তা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। তাঁদের সম্মিলিত উচ্চারণে পুজো পাবেন বাগীশ্বরী। সঙ্গে থাকবে উপনিষদের স্তোত্র আর রবীন্দ্রনাথের গান। টিচার-ইন-চার্জ সোনালি দত্ত বলেন, “এই প্রথা ওদের হাত ধরেই এগিয়ে চলুক। শিক্ষার আলো আর জ্ঞানের প্রসাদ ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র। সেই তো সরস্বতী আরাধনার প্রকৃত স্বরূপ।”

আলিপুরদুয়ার নিউ টাউন গার্লস স্কুলেও ভেঙেছে অচলায়তন। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির বেড়া টপকে ছাত্রীদের দিয়ে পুজোর আয়োজন করাতে চেয়েছিলেন ইংরেজির শিক্ষিকা অপির্তা সেন। সেই প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করেছিল স্কুল। তার পর দশম শ্রেণির সুমেধা ঘোষ, পূর্বাশা দেবনাথ, প্রিয়াঞ্জলি পাল, পৃথা করদের বেছে নেওয়া হয়। এ বারের পুজোয় পুরোহিত ওরাই। স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা শ্রেয়সী দত্ত বলেন, “প্রথা তৈরিই হয় ভাঙার জন্যই। মেয়েরা মাকে পুজো দেবে, তাতে আমরা যদি উৎসাহ না দিই, তা হলে শিক্ষার উদ্দেশ্যই বৃথা।”

স্কুলের আঙিনা থেকেই শুরু নতুন প্রথায় মন্ত্রোচ্চারণ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

কলকাতার যোগমায়াদেবী কলেজে অবশ্য ছবিটা খানিক বিপরীত। ছাত্রীদের আবদারে এখানে পৌরোহিত্য করেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষিকা পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায়। সারাজীবন সংস্কৃত পড়িয়েছেন যাঁদের, তাঁদের অনুরোধ ফেলে দেওয়ার প্রশ্নই নেই। তাই গত চার-পাঁচ বছর ধরে তিনিই মন্ত্রোচ্চারণে ছাত্রীদের পুজো পৌঁছে দিচ্ছেন বাগ্‌দেবীর কাছে। বুঝি হোমের আগুনে আহুতি দিচ্ছেন অজ্ঞান সংস্কারের অন্ধকার। পাঞ্চালী বলেন, “অবসর নেওয়ার পরও ছাত্রীরা আমাকে ছাড়েনি। আসলে আমিও ছাড়তে চাইনি। এ যে অনেকখানি পাওয়া। এক সময় বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে কুল না খেয়ে অঞ্জলি দিতাম। এখন পৌরোহিত্য করি। সময় বদলেছে, উৎসবের আমেজ বদলায়নি।” এ কলেজের কেউ কখনও বিরোধিতা করেননি।

মাঘ মাসের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে শুভ্রবসনা দেবীর আরাধনায় ছক ভাঙার স্পর্ধা দেখাচ্ছেন মেয়েরাই। চিরায়ত নিয়মেই পুজো করে পৌরহিত্যের লিঙ্গভেদ মুছে ফেলছেন সকলেই। হংসাসনা দেবী যেন স্মিত হাসেন। জ্ঞান-সলিলে মরালগমনের মতোই এই পরিবর্তন ধীর অথচ, দুর্বার তার গতি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement