সমীক্ষা এবং সাংগঠনিক রিপোর্টের ভূমিকা স্পষ্ট ধরা দিল বিজেপির প্রার্থিতালিকায়। সোমবার প্রথম দফায় ১৪৪টি আসনের জন্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে বিজেপি। তার মধ্যে ৪৮টি আসন এমন, যেগুলি বিজেপির দখলেই ছিল। কিন্তু সেই ৪৮ বিদায়ী বিধায়কের প্রত্যেকে এ বার আর টিকিট পেলেন না। ৪০ জন পেলেন। আট জন বাদ পড়লেন। বিজেপি সূত্রের খবর, দলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনে বিভ্রান্ত হতে চাননি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তাঁরা যে জনমত সমীক্ষা এবং সাংগঠনিক সমীক্ষার আশ্রয় নিয়েছিলেন, সে সব সমীক্ষাই মূল ভূমিকা নিয়েছে প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে। রাজ্যের ওজনদার নেতাদের পছন্দ-অপছন্দও বেশ কিছু ক্ষেত্রে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে সমীক্ষার ফলাফলের সামনে।
বিজেপির প্রার্থী তালিকা হিন্দিতে প্রকাশিত হওয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই শাসক তৃণমূলের কাছ থেকে কটাক্ষ শুনতে হচ্ছে বিজেপিকে। তৃণমূল আগাগোড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘বাঙালি-অবাঙালি’ ভাষ্য ব্যবহার করে এসেছে। এই বিধানসভা ভোটে ‘বাংলার বঞ্চনা-বাঙালির বঞ্চনা’ আখ্যান নিয়েই তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে ময়দানে নেমেছে। ভোটের প্রচারেও এই আখ্যানই গুরুত্ব পাবে। নিজেদের প্রার্থী তালিকা হিন্দিতে প্রকাশ করে বিজেপি প্রথমেই তৃণমূলের হাতে একটা রাজনৈতিক ‘অস্ত্র’ তুলে দিল বলে অনেকের অভিমত।
যে আটটি জেতা আসনে প্রার্থী বদল করা হয়েছে, তার মধ্যে তিনটি উত্তরবঙ্গে, তিনটি রাঢ়বঙ্গে, বাকি দু’টি রাঢ় ঘেঁষা দক্ষিণবঙ্গে। সবচেয়ে বড় চমক দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে! প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করা অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ী ২০২১ সালে বিজেপির টিকিটে জিতেছিলেন বালুরঘাট থেকে। তার পরে দিল্লি ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে এলেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ‘সুসম্পর্ক’ ছিল বলেই বিজেপির অন্দরে শোনা যেত। গত ১৪ মার্চ ব্রিগেড সমাবেশে ভাষণ শেষ করে মঞ্চ থেকে নামার আগে যে ক’জনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদী আলাদা করে কথা বলেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন অশোক। তবু তিনি এ বার বালুরঘাটে টিকিট পেলেন না। উত্তরবঙ্গে একই সিদ্ধান্ত হল শীতলকুচির বিধায়ক বরেনচন্দ্র বর্মণ এবং কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক সৌমেন রায়ের ক্ষেত্রেও। ওই দুই আসনেও বিজেপি প্রার্থী বদলে দিল।
রাঢ়বঙ্গে যে তিনটি জেতা আসনে বিজেপি প্রার্থীবদল করল, সেগুলি হল খড়্গপুর সদর, বলরামপুর এবং রঘুনাথপুর। খড়্গপুর সদরের বিধায়ক তথা খড়্গপুর পুরসভার বিজেপি কাউন্সিলর হিরণ চট্টোপাধ্যায় টিকিট পেলেন না। পরবর্তী তালিকায় অন্য কোনও আসনে তাঁর নাম থাকবে কি না, সে বিষয়ে রাজ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত নন। তবে হিরণকে সরিয়ে রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা ওই আসনের প্রাক্তন বিধায়ক দিলীপ ঘোষকে আসনটি ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে অনেকে নেতৃত্বের ‘বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত’ দেখছেন। পুরুলিয়ার বলরামপুরের বিধায়ক বাণেশ্বর মাহাতো এবং রঘুনাথপুরের বিধায়ক বিবেকানন্দ বাউরিও এ বার টিকিট পাচ্ছেন না।
গত তিনটি বড় নির্বাচনে দক্ষিণবঙ্গে বিজেপির অন্যতম ‘ঘাঁটি’ হিসাবে দেখা দিয়েছে যে আরামবাগ মহকুমা, সেখানে দু’টি জেতা আসনে প্রার্থী বদল হল। আরামবাগ সদরে মধুসূদন রায় এবং গোঘাটে বিশ্বনাথ কারক এ বার আর টিকিট পেলেন না।
দিলীপ নিজের পুরনো আসন খড়্গপুর সদর ফিরে পেতে অনেক দিন ধরেই আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু সেখানকার বিদায়ী বিধায়ক তথা বাংলা ছবির ‘হিরো’ হিরণ আসন ছাড়তে রাজি ছিলেন না। কয়েক মাস আগে পর্যন্ত মনে করা হচ্ছিল যে, দিলীপের পক্ষে খড়্গপুর সদর ফিরে পাওয়া কঠিন। কিন্তু সম্প্রতি হিরণের দ্বিতীয় বিবাহ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। তাঁর প্রথম স্ত্রী অভিযোগ করেন যে, তাঁর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ না হওয়া সত্ত্বেও হিরণ দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন। সে অভিযোগ হিরণও অস্বীকার করতে পারেননি। বিষয়টি যথেষ্ট সংবেদনশীল হওয়ায় বিজেপি আর ঝুঁকি নিল না বলেই অনেকে মনে করছেন। স্থানীয় সমীক্ষাতেও দিলীপের নামই বেশি সমর্থন পাচ্ছিল। ফলে দিলীপ সেই আসন ফিরে পেলেন, যেখান থেকে তিনি প্রথম বার জনপ্রতিনিধি হয়েছিলেন।
প্রথম দফায় হিরণ টিকিট না পাওয়ায় তাঁর প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা বলেন, ‘‘সম্প্রতি যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা সাধারণ মানুষ ভাল ভাবে নেননি। বিজেপি-ও যে তার এই কাণ্ড ভাল চোখে দেখেনি, প্রার্থী তালিকা থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।’’ অনিন্দিতার কথায়, ‘‘খড়গপুরের বহু মানুষ আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তাঁরাও আমার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। হিরণের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন।”
বলরামপুরের বাণেশ্বর বা রঘুনাথপুরের বিবেকানন্দের টিকিট না-পাওয়ার প্রধান কারণও সমীক্ষাই। পাশাপাশি, দু’জনের বিষয়েই ‘জনসংযোগে না-থাকা’ সংক্রান্ত অভিযোগ জোরালো ভাবে উঠেছিল। ঘটনাচক্রে, গত লোকসভা নির্বাচনে দু’টি বিধানসভা কেন্দ্রেই তৃণমূলের চেয়ে বিজেপি পিছিয়ে পড়েছিল। সেটিও বাণেশ্বর এবং বিবেকানন্দের টিকিট না-পাওয়ার অন্যতম কারণ বলে বিজেপি সূত্রের খবর। শালতোড়া এবং কাশীপুরের মতো জেতা আসনেও লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পিছিয়ে ছিল। তবু শালতোড়ার বিধায়ক চন্দনা বাউরি এবং কাশীপুরের বিধায়ক কমলাকান্ত হাঁসদা আবার টিকিট পেলেন। বিজেপি সূত্র বলছে, চন্দনার জনসংযোগ বা সাংগঠনিক কার্যকলাপে কোনও ঘাটতি ছিল না। কমলাকান্তের ক্ষেত্রেও সমীক্ষা রিপোর্ট খারাপ আসেনি। তদুপরি, একজন মহিলা বিধায়ক একজন জনজাতি বিধায়ক। তাই খুব ‘গুরুতর’ কারণ না-থাকলে তাঁদের সরানো জরুরি বলে দিল্লি মনে করেনি।
উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জে সৌমেন রায় বিজেপির টিকিটে জিতে একবার তৃণমূলে চলে গিয়েছিলেন। বছর দু’য়েক পরে তিনি আবার বিজেপিতে ফেরেন। তবে কালিয়াগঞ্জে তাঁর জনসংযোগ একেবারেই ছিল না। সংগঠনের সঙ্গেও তেমন নিবিড় সম্পর্ক রাখতেন না। তাই ভারত সেবাশ্রম সংঘের স্থানীয় শাখার প্রধান উৎপল মহারাজ বিজেপির টিকিটে লড়তে আগ্রহ প্রকাশ করায় নেতৃত্ব আর অন্য কোনও নাম নিয়ে বেশি ভাবতে চাননি। ভারত সেবাশ্রমের ওই সন্ন্যাসীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও কালিয়াগঞ্জে প্রার্থীবদলের নেপথ্যে অন্যতম কারণ হয়েছে।
কোচবিহারের শীতলকুচিতে ২০২১ সালের ধুন্ধুমার নির্বাচনে বরেণচন্দ্র বর্মণ জিতেছিলেন ঠিকই। কিন্তু তার পরে এলাকায় তাঁর সক্রিয়তা ‘সন্তোষজনক’ ছিল না বলে নেতৃত্ব মনে করেছেন। জেতা আসন আরামবাগ এবং গোঘাটে প্রার্থী বদলের মূল কারণ ‘গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব’ বলে বিজেপির একটি সূত্রের দাবি। মধুসূদন বা বিশ্বনাথের বিরুদ্ধে জনসংযোগে না-থাকা বা নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তেমন ছিল না। সাংগঠনিক কার্যকলাপে তাঁদের ভূমিকা ছিল না, তেমনও নয়। কিন্তু দলের অন্দরে ওই দুই বিধায়কের ‘বিরোধী’র সংখ্যাও ছিল যথেষ্ট। সেই ‘অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব’ এড়াতে এমন প্রার্থী বাছার চেষ্টা হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে দলের অন্দরে খুব বেশি ‘বিরোধিতা’ নেই।