US Oil Smuggling

আলো নিবিয়ে, ট্র্যাকার বন্ধ করে হরমুজ় অতিক্রম! ইরানি কায়দাতেই তেহরানের কোটি কোটি ব্যারেল তেল লুট করেছে আমেরিকা?

যুদ্ধের মধ্যেই পশ্চিম এশিয়া থেকে কয়েক কোটি ব্যারেল তেল নিজের ঘরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে আমেরিকা। ইরানি চালেই তাদের অবরুদ্ধ করা হরমুজ় পেরিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাঙ্কার।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ ১৫:২৩
Share:
০১ ১৯

ইরান যুদ্ধে ইতি টেনে শান্তি সমঝোতার পথে আমেরিকা। ১৯ জুন, শুক্রবার, সুইৎজ়ারল্যান্ডের জেনেভায় দু’তরফে সই হবে সংঘর্ষবিরতির চুক্তি। এ-হেন পরিস্থিতিতে ফের খনিজ তেল নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, লড়াই চলাকালীন হরমুজ় প্রণালী দিয়েই কয়েক কোটি ব্যারেল ‘তরল সোনা’ নিজের ঘরে নিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র! চোখের সামনে সেই ‘চোরাচালান’ দেখেও কিছু করতে পারেনি তেহরান!

০২ ১৯

মার্কিন প্রশাসনের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ চলাকালীন ১০ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ় প্রণালী দিয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে আমেরিকা। এর জন্য কমপক্ষে ২০০টি ট্যাঙ্কারকে কাজে লাগায় তারা। সম্প্রতি, ইরানি ‘শাহিদ’ ড্রোনের হামলায় হরমুজ় সংলগ্ন এলাকায় ভেঙে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাপাচে সামরিক হেলিকপ্টার। ওই ঘটনার সঙ্গে তেল ‘চোরাচালানের’ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Advertisement
০৩ ১৯

পশ্চিম এশিয়ার তেল বাণিজ্যে হরমুজ় প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ ওই সামুদ্রিক রাস্তা দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তরল সোনা পরিবহণ করে প্রায় সমস্ত আরব রাষ্ট্র। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইজ়রায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সামরিক অভিযানে নামলে হরমুজ় অবরুদ্ধ করে তেহরান। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাপিয়ে যায় খনিজ তেলের দাম।

০৪ ১৯

তরল সোনার মূল্যবৃদ্ধিতে প্রায় সমস্ত দেশে ঊর্ধ্বমুখী হয় মুদ্রাস্ফীতির হার। এতে কূটনৈতিক স্তরে যুক্তরাষ্ট্রের উপর বাড়তে থাকে চাপ। ফলে কিছুটা বাধ্য হয়ে হরমুজ় নিয়ে বড় ঘোষণা করেন ট্রাম্প। বলেন, ‘‘ওই সামুদ্রিক রাস্তা দিয়ে সমস্ত ট্যাঙ্কারকে নিরাপদে বার করে আনবে মার্কিন নৌসেনা।’’ এই অভিযানের পোশাকি নাম রাখা হয় ‘অপারেশন প্রজ়েক্ট ফ্রিডম’। কানে যেতেই পাল্টা হুমকি দেয় ইরানি ফৌজ।

০৫ ১৯

এ বছরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। কিন্তু, মাত্র দু’দিনের মাথায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণের ভয়ে সেটা বন্ধ করা হচ্ছে বলে সরকারি ভাবে জানিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। এই নিয়ে বিবৃতি জারি করে কাতারে অবস্থিত মার্কিন ফৌজের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম। সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এই চালেই ইরানকে মাত দেয় আমেরিকার বাহিনী।

০৬ ১৯

রয়টার্স জানিয়েছে, এর পরই আসল অভিযান শুরু করে মার্কিন নৌবাহিনী। হরমুজ়ে চলাচল করা তেলের ট্যাঙ্কারগুলির ট্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে রাতের অন্ধকারে ওই সামুদ্রিক রাস্তা পার হওয়ার নির্দেশ দেয় তারা। সেইমতো আলো নিবিয়ে হরমুজ় পেরিয়ে আরব সাগরে আসতে থাকে তারা। সেখানে আগে থেকেই একটি খালি ট্যাঙ্কার দাঁড় করিয়ে রাখছিল যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। ফলে সমস্ত তেল তাতে ভরে দিতে ওই জাহাজগুলির খুব একটা সমস্যা হয়নি।

০৭ ১৯

জানা গিয়েছে, ট্যাঙ্কার থেকে ট্যাঙ্কারে তেল ভরার কাজ শেষ হলে খালি জাহাজটিকে ফের হরমুজ় দিয়ে আরব রাষ্ট্রগুলির কোনও না কোনও বন্দরে ফিরিয়ে দেয় মার্কিন নৌসেনা। সেখানে পরবর্তী যাত্রার জন্য নতুন করে তেল নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে তারা। অন্য দিকে আরব সাগর থেকে আমেরিকার উদ্দেশে রওনা হয় তেলভর্তি জাহাজ। হরমুজ় অবরুদ্ধ থাকাকালীন এই প্রক্রিয়া আমেরিকা লাগাতার চালিয়ে গিয়েছে বলেই জানিয়েছে রয়টার্স।

০৮ ১৯

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃত্রিম উপগ্রহের তোলা ছবিতে ১১ মে হরমুজ় দিয়ে নির্বিঘ্নে তেল সরবরাহ করতে ১৭ জোড়া ট্যাঙ্কার নামায় যুক্তরাষ্ট্র। তাদের ইরানি ফৌজ নিশানা করছে কি না, সেটা বুঝতে ড্রোন ও কপ্টারে লাগাতার নজরদারি চালিয়ে গিয়েছে মার্কিন নৌসেনা। গোটা প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে দু’টি জায়গা বেছে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। সেগুলি হল, আমিরশাহির ফুজাইরাহ উপকূল এবং ওমানের সোহার চৌকির নিকটবর্তী আর একটি উপকূল।

০৯ ১৯

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই দুই জায়গায় ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালানো ইরানি ফৌজের পক্ষে মোটেই কঠিন ছিল না। আর তাই তেল নিয়ে হরমুজ় পার হওয়ার সময় জাহাজগুলির মধ্যে ৩-৪ কিলোমিটারের দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দেয় মার্কিন নৌসেনা। আরব সাগরে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছোনোর পর খালি ট্যাঙ্কারে তেল ভরতে তাদের ২৪ থেকে ৪০ ঘণ্টা সময় লাগত। এর জন্য জাহাজগুলিকে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াতে হচ্ছিল।

১০ ১৯

জুনের গোড়ায় এই ইস্যুতে গণমাধ্যমে মুখ খোলে আমেরিকার প্রভাবশালী আর্থিক সংস্থা জেপি মর্গ্যান। তাদের কথায়, ‘‘অবরুদ্ধ হরমুজ় দিয়ে তেল পরিবহণ কিন্তু দিব্যি চলছে। সেই অঙ্ক দৈনিক ২০ লক্ষ ব্যারেল হতে পারে।’’ এর পরই ট্রাম্প জানিয়ে দেন, ইরানের নাকের ডগা দিয়ে ২০০ তেলবাহী জাহাজ বার করে এনেছে আমেরিকা। ফলত, জ্বালানির কোনও সমস্যা নেই।

১১ ১৯

ট্রাম্প ২০০ তেলবাহী জাহাজের কথা বলতেই একটি প্রশ্ন তোলে মার্কিন গণমাধ্যম। তবে কি ইরান থেকে তরল সোনা লুট করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী? সঙ্গে সঙ্গে এর জবাব দেন আমেরিকার জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট। তিনি বলেন, ‘‘তেহরান নয়, তেল এসেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত এবং ইরাক থেকে। আরব রাষ্ট্রগুলিকে বিশ্ব বাজারে তেল বিক্রিতে সাহায্য করেছি আমরা।’’

১২ ১৯

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দীর্ঘ দিন ধরেই ইরানের উপর বিপুল নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে আমেরিকা। যুদ্ধ বাধলে তাতে আরও কড়াকড়ি শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। এই পরস্থিতিতে অর্থনীতি বাঁচাতে খনিজ তেলের ব্যবসা চালিয়ে যায় তেহরান। ওয়াশিংটনকে বোকা বানাতে ঠিক এই পদ্ধতিই অবলম্বন করেছিল তারা। অবস্থার ফেরে যা এ বার তাদের উপরেই প্রয়োগ করল মার্কিন নৌসেনা, বলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।

১৩ ১৯

গত ৯ জুন ইরানি ড্রোন হামলায় হরমুজ়ে ভেঙে পড়ে মার্কিন সামরিক অ্যাপাচে হেলিকপ্টার। সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, ওই সামুদ্রিক রাস্তায় আরও কিছু ট্যাঙ্কার গোপনে নিয়ে আসার ছক ছিল আমেরিকার। কিন্তু, কোনও ভাবে ফাঁস হয়ে যায় তাদের চাল। তখনই অ্যাপাচে কপ্টারটিকে ধ্বংস করে তেহরান। এর পর ওই রাস্তায় আর তেল আনা যাবে না বুঝতে পেরে গোটা বিষয়টি গণমাধ্যমে জানিয়ে দেন ট্রাম্প।

১৪ ১৯

যদিও এর উল্টো যুক্তি রয়েছে। প্রথমত, হরমুজ় দিয়ে এই পদ্ধতিতে তেল পরিবহণ করা গেলে লড়াই পর্বে আন্তর্জাতিক বাজারে কেন কমল না এর দাম? যুদ্ধ থামতেই তরল সোনার দর ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারে নেমে আসে। সংঘাত পরিস্থিতিতে সেটা একটা সময় ১২০ ডলারে উঠে গিয়েছিল।

১৫ ১৯

দ্বিতীয়ত, ইরানকে লাগাতার তথ্য জুগিয়ে গিয়েছে রাশিয়া ও চিনের কৃত্রিম উপগ্রহ। তাদের নজর এড়িয়ে ২০০ ট্যাঙ্কারের পক্ষে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল সরবরাহ করা এক রকম অসম্ভব। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, অল্প কিছু ট্যাঙ্কারে ওই পদ্ধতিতে তেল ঘরে এনেছেন ট্রাম্প। পরে লড়াইয়ে জয়ের কৃতিত্ব দাবি করতে সংখ্যা বাড়িয়ে বলছেন তিনি।

১৬ ১৯

ফিন্যান্সিয়াল টাইম্‌স ও রয়টার্স আবার জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হয়ে গেলে সেখানে বিনিয়োগের জন্য ৩০ হাজার কোটি ডলারের তহবিল তৈরির কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন, এই ধরনের কিছু করা হচ্ছে না। তার পরেও এই ইস্যুতে জল্পনা থামেনি।

১৭ ১৯

আমেরিকা-ইরান চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে কী কী বিষয় উল্লেখ থাকছে, তা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের দাবি, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার আগেই তা জানানো হবে। অন্য দিকে ইরান পরমাণু অস্ত্র রাখতে রাজি নয় বলে স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প। এই ইস্যুতে সম্পূর্ণ উল্টো বিবৃতি দিয়েছে তেহরান। তাদের দাবি, এই নিয়ে দু’তরফে আলোচনা চলবে।

১৮ ১৯

১৯ জুন জেনেভায় শান্তিচুক্তিতে সই হলে হরমুজ় প্রণালী পাকাপাকি ভাবে খুলে যাবে বলে ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। ইরান আবার জানিয়েছে, আগামী দিনে ওই সামুদ্রিক রাস্তা দিয়ে জাহাজ নিয়ে যেতে হলে, টাকা দিতে হবে তাদের। তবে সেটা টোল নয়। জাহাজের বিমা, প্রাকৃতিক পরিস্থিতি-সহ অন্যান্য নানা কারণে ওই টাকা নেবে তেহরান।

১৯ ১৯

ইরান-মার্কিন শান্তিচুক্তিতে সবচেয়ে বড় কাঁটা হল ইজ়রায়েল। বর্তমান পরিস্থিতিতে লেবানন থেকে বাহিনী সরাতে রাজি নন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তেহরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজ়বুল্লার গড় হিসাবে পরিচিত পশ্চিম এশিয়ার ওই দেশ। ফলে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা ভেস্তে গেলে ফের সাবেক পারস্যকে বোকা বানিয়ে তেল ‘চোরাচালানে’ মার্কিন নৌবাহিনী নামে কি না, সেটাই এখন দেখার।

ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement