দ্বাদশ শ্রেণি পাশ অটোচালক গড়ে তুলেছেন ৯০০ কোটি টাকার ব্যবসা! সেই প্রাক্তন অটোচালক অধুনা শিল্পপতির নাম সত্যশঙ্কর কে। বিখ্যাত পানীয় সংস্থার মালিক। পেপসি এবং কোকা-কোলার দাপট থাকা বাজারে কী ভাবে দেশি ব্র্যান্ডকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে গেলেন সত্যশঙ্কর?
১৯৮৪ সাল। সে সময় সত্যশঙ্কর কোনও সংস্থার সিইও ছিলেন না। ছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সি এক তরুণ, যাঁকে অর্থের অভাবে দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়েছিল।
কর্নাটকের বেল্লারেতে জন্ম সত্যশঙ্করের। তাঁর বাবা ছিলেন গ্রামের এক দরিদ্র পুরোহিত। পুত্রের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য তাঁর ছিল না। কিন্তু সত্যশঙ্কর তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হওয়াকে পথের শেষ হিসাবে দেখেননি। বরং তিনি দেখেছিলেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি পথ।
পড়াশোনা না হওয়ায় অটো চালানোর লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন সত্যশঙ্কর। তরুণ সত্যশঙ্করের কাছে সেই লাইসেন্স কেবলই এক টুকরো সাধারণ কাগজ ছিল না, তাঁর কাছে তা ছিল দারিদ্র থেকে মুক্তির ছাড়পত্র। সরকারি একটি প্রকল্পের আওতায় ঋণ নিয়ে তিনি তাঁর প্রথম অটো কেনেন।
এক বছর অটো চালান সত্যশঙ্কর। কঠোর পরিশ্রম করে খুব তাড়াতা়ড়ি শোধ করে দেন ঋণের টাকা। টাকা জমিয়ে দ্রুতই অটো বদলে একটি অ্যাম্বাসাডর গাড়ি কিনে কেনেন তিনি। শুধু নিজের জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ট্যাক্সিচালক হিসাবে রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য রাজ্যেও যাত্রী নিয়ে যাওয়া শুরু করেন সত্যশঙ্কর।
ওই ট্যাক্সিতেই জীবনে সফল হওয়ার প্রথম বড় সূত্রটি খুঁজে পেয়েছিলেন সত্যশঙ্কর। প্রায়শই গাড়ি করে বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে যেতেন তিনি। এর মাঝেই তিনি এক দিন লক্ষ করেন, পর্যটকেরা যেখান থেকেই আসুন না কেন, সবার আগে তাঁরা এক বোতল পানীয় জল কিনতেন।
গাড়ি চালানোর সময় সত্যশঙ্করের মনোযোগ যেমন রাস্তার দিকে থাকত, তেমনই বিদেশি পর্যটকদের মনোযোগ থাকত তাঁদের স্বাস্থ্যের দিকে। তখনই ওই পানীয় জল নিয়ে ব্যবসা ফাঁদার কথা মাথায় আসে সত্যশঙ্করের। তবে তখন সেই ব্যবসা শুরু করতে পারেননি তিনি।
১৯৮৮ সালের মধ্যে সাধের গাড়িটি বিক্রি করে দেন সত্যশঙ্কর। তাঁর কাছে গাড়ি চালানোর চেয়ে গাড়ির খুচরো যন্ত্রাংশ বিক্রি করা ছিল অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং লাভজনক ব্যবসা। ফলে পুত্তুরে গাড়ির যন্ত্রাংশের একটি ছোট দোকান খোলেন তিনি।
শীঘ্রই সত্যশঙ্কর লক্ষ্য করেন, যে গ্রাহকেরাই যন্ত্রাংশ কিনছেন, তাঁদের টায়ারেরও প্রয়োজন হচ্ছে। তাই তিনি একটি টায়ারের দোকানও খুলে ফেলেন। তবে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত পর্যবেক্ষণটি এসেছিল তাঁর দোকানে মানুষের অর্থ প্রদানের ধরন দেখে। কৃষক এবং স্থানীয়েরা ধারে যন্ত্রাংশ কিনতেন এবং ছোট ছোট কিস্তিতে দাম শোধ করতেন। সত্যশঙ্কর বুঝতে পারেন, গ্রাহকেরা যদি তাঁকে এ ভাবে অল্প অল্প করে টাকা দিতে পারেন, তবে কোনও ব্যাঙ্ককেও একই ভাবে টাকা দিতে পারবেন।
১৯৯৪ সালে একটি অর্থলগ্নি বা ফিন্যান্স সংস্থা চালু করেন সত্যশঙ্কর। অন্য ঋণদাতারা যখন পুরনো গাড়িকে গুরুত্ব দিতেন না, তখন সত্যশঙ্কর সেকেন্ড-হ্যান্ড অটো এবং গাড়ি কেনার জন্য ঋণ দেওয়া শুরু করেন। চালকদের সংগ্রামের কথা ভাল ভাবেই বুঝতেন সত্যশঙ্কর। কারণ তিনিও একসময় ওই পেশার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন।
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে পানীয় জলের ব্যবসার কথা কিছুতেই সত্যশঙ্করের মাথা থেকে বেরোচ্ছিল না। অবশেষে ২০০০ সালে তিনি এ বিষয়ে প্রথম পদক্ষেপ করেন। পুত্তুরের কাছে ভারী বৃষ্টিপাতপ্রবণ গ্রাম নারিমোগেরুতে একটি বিশুদ্ধ পানীয় জলের কারখানা তৈরি করেন তিনি।
কিন্তু শুধু জল দিয়ে যে ব্যবসা চলবে না তা ভাল করেই বুঝেছিলেন সত্যশঙ্কর। তিনি বেড়াতে ভালবাসতেন। উত্তর ভারতে ভ্রমণের সময় তিনি সোডা বিক্রি করা একটি ছোট দোকানে এক বার এক বিক্রেতাকে ঝাঁঝালো সোডাযুক্ত পানীয়ের সঙ্গে জিরের গুঁড়ো এবং লবণ মিশিয়ে বিক্রি করতে দেখেছিলেন।
সত্যশঙ্কর তাঁর সঙ্গে ভ্রমণ করা বন্ধুদের নাকি বলেছিলেন যে, ‘‘আমি এর চেয়ে ভাল কিছু তৈরি করতে পারব। আমি এতে নতুনত্ব বা বিশেষ কোনও স্বাদ যোগ করব।’’ এর পরেই পুত্তুরে ফিরে আসেন সত্যশঙ্কর। তৈরি করেন বিশেষ ধরনের নরম পানীয়।
তবে নরম পানীয় তৈরি করেও সমস্যার মুখে পড়েছিলেন সত্যশঙ্কর। শুরুতে কেউই ওই পণ্য কিনতে চাননি। কিন্তু সেখানেই আসে তাঁর গল্পের আসল মোড়। সত্যশঙ্কর স্বীকার করেছিলেন, ‘‘আমরা বাজারে ২০০ বাক্স পাঠাতাম, আর ১০০ বাক্সই ফেরত আসত।’’ তখন বাজারে বড় বড় সংস্থা যেমন কোক এবং পেপসির একছত্র আধিপত্য ছিল।
কিন্তু ঘাবড়ে যাননি সত্যশঙ্কর। তিনি আগে অভাবের দিন দেখেছিলেন। তাই সামান্য বাধা তাঁকে থামাতে পারেনি। হালও ছাড়েননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষ একঘেয়ে পানীয়ে ক্লান্ত এবং তারা অন্য স্বাদের কিছু খুঁজছে।
সত্যশঙ্করের বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনী বাজেট ছিল না। তাই তিনি বড় বড় রাস্তার ধারের দেওয়ালগুলিতে বিজ্ঞাপন আঁকতেন। ধীরে ধীরে মানুষের মুখে মুখে তাঁর পণ্যের কথা ছড়িয়ে পড়ে। মশলায় পরিপূর্ণ খাবারের সঙ্গে সত্যশঙ্করের সংস্থার এক বোতল ঠান্ডা পানীয় কর্নাটকের মানুষের পছন্দ হয়ে ওঠে শীঘ্রই। আর ফিরে তাকাতে হয়নি সত্যশঙ্করকে।
সত্যশঙ্করের বয়স এখন ষাটের কোঠায়। তবে এখনও তাঁকে দেখে মনে হয় না যে তিনি থামার পাত্র। তাঁর প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেন বা টার্নওভার এখন ৯০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে পানীয় এবং ভাজাভুজি খাবারের সংস্থা থেকে আসে ৫৭০ কোটি টাকা। ফিন্যান্স সংস্থা থেকে আসে ৩৩০ কোটি টাকা।
বর্তমানে সত্যশঙ্করের সংস্থাগুলি ৫৫ ধরনের পণ্য বিক্রি করে। তালিকায় রয়েছে বিখ্যাত জিরে সমৃদ্ধ পানীয় থেকে শুরু করে আমের জুস এবং ভাজাভুজি খাবার। কর্নাটক এবং তেলঙ্গানায় একাধিক কারখানা রয়েছে তাঁর। অন্ধ্রপ্রদেশেও নতুন কারখানা গড়ে উঠছে।
প্রাক্তন অটো, ট্যাক্সিচালক সত্যশঙ্কর এখন বিলাসবহুল রোলস রয়েস গাড়ির মালিক। তবে সেই গাড়ি তাঁর কাছে কোনও শৌখিনতার প্রতীক নয়, বরং বেল্লারের মতো ছোট একটি গ্রামের মানুষ পরিশ্রমের জোরে কতটা দূর যেতে পারেন, তা বোঝতেই তিনি এটি কিনেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পশ্চিমি পণ্যের নকল করে এই সাফল্য পাননি সত্যশঙ্কর। বরং, সাধারণ মানুষের পছন্দ-অপছন্দ পর্যবেক্ষণ করেই তিনি এগিয়েছিলেন।