প্রায় ১৫ দিন ধরে চলা গোপন বৈঠক ও বিদ্রোহে যবনিকা পতন। রবিবার, ১৪ জুন, নামগোত্রহীন ত্রিপুরার ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েনস পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় (এনসিপিআই) মিশলেন তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ সাংসদ। লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার বাসভবনে আলোচনার পর এ কথা ঘোষণা করেন তাঁরা। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে বিবৃতি দেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলি ঘোষদস্তিদার।
ঘাসফুল শিবিরের সাংসদেরা বিদ্রোহী হতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের প্রতীক ও নাম তাঁদের দখলে যেতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ উল্লেখ করে লোকসভার অধ্যক্ষকে আলাদা চিঠি দেবেন তাঁরা। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে যাতে সেটা করা যায় সেই ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দিয়েছেন কলকাতা উত্তরের সাংসদ সুদীপ।
১৪ জুন, রবিবার, দিল্লিতে অধ্যক্ষের বাসভবন থেকে বেরিয়ে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আমরা এনসিপিআইতে যোগ দিয়েছি। এটা নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত রাজনৈতিক দল। আমরা এই দলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছি। আগামী দিনে আদালতে ফয়সলা হবে কে আসল তৃণমূল।’’ মমতার দলের নাম ও প্রতীক পেতে আইনি লড়াই চলবে বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
অন্য দিকে বারাসতের সাংসদ কাকলি বলেন, ‘‘সংসদে আমরা আলাদা বসার আবেদন জানিয়েছি। তৃণমূলের ২০ জনের সই করা নথি নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করেছি এবং তাঁকে চিঠি দিয়েছি। আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এনডিএ জোটের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করব।’’ পশ্চিমবঙ্গে খুব দ্রুত এনসিপিআই-এর দলীয় কার্যালয় খোলা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এ-হেন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই খবরের শিরোনামে এসেছে অন্ধ্রপ্রদেশের বিজেপি সাংসদ তথা প্রাক্তন টিডিপি (তেলুগু দেশম পার্টি) নেতা চিন্তাকুন্টা মুনুস্বামী রমেশের নাম। তিনিই নাকি একের পর এক তৃণমূল সাংসদকে ফোন করেন। বছর ৬১-এর রমেশ অবশ্য সে কথা অস্বীকার করেননি। আর তাই কৃষ্ণনগরের ঘাসফুল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
টিডিপি-ত্যাগী বিজেপি সাংসদ রমেশ অবশ্য তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। উল্টে নিজের কাজের ব্যাখ্যা দিতে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘কাউকে রাজি করানোর একটা সহজাত দক্ষতা রয়েছে আমার। মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় পেলেই সেটা করতে পারি। তা ছাড়া তৃণমূলের প্রায় সমস্ত সাংসদকে অনেক দিন ধরে চিনি। সংসদের ক্যান্টিনে তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই বেশ বন্ধুত্ব রয়েছে।’’
২০২০ সালে দুবাই ও হায়দরাবাদে হওয়া ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে বহু সাংসদকে নিমন্ত্রণ করেন অন্ধ্রের ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ রমেশ। সেখানে হাজির ছিলেন একদা মমতা-অনুগত তথা বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়। বিদ্রোহী হয়ে তিনিও যোগ দিয়েছেন এনসিপিআইতে। গোড়ায় এই গোষ্ঠীতে ছিলেন না সুদীপ। কিন্তু, ১৩ জুন, শনিবার হঠাৎই দিল্লি উড়ে যান তিনি। সেই বিমানে ছিলেন শতাব্দীও।
অন্ধ্রর কাদাপা জেলার পোটলাদুরথি গ্রামে জন্ম রমেশের। তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্য নজরকাড়া। ১৯৯৯ সালে রিথউইক প্রজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি সংস্থা তৈরি করেন তিনি। মাত্র ১৪ বছরের মধ্যে ১,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এর আয়ের অঙ্ক। জ্বালানি, সড়ক, সেচ এবং আবাসন প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করছে রমেশের এই সংস্থা। সেখানে জনপ্রিয়তা মেলায় ধীরে ধীরে রাজনীতির আঙিনায় পা রাখেন তিনি।
২০১৯ সাল পর্যন্ত টিডিপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রমেশ। ২০১৪ সালে পাশ হয় অন্ধ্রপ্রদেশ পুনর্গঠন আইন। এর সূত্র ধরে কাদাপায় একটি ইস্পাত কারখানা নির্মাণের দাবি তোলেন রিথউইকের চেয়ারম্যান। শুধু তা-ই নয়, এই ইস্যুতে ২০১৮ সালের ২০ জুন অনশনেও বসেন তিনি। এর ঠিক ছ’দিনের মাথায় তাঁর আন্দোলন মঞ্চে হাজির হন তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা ডিএমকে নেতা করুণানিধির কন্যা কানিমোজি।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, অনশনের মঞ্চে রমেশের দাবিকে সমর্থন জানান কানিমোজি। ফলে, অন্ধ্রের আর্থিক সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য লড়াই করা ব্যবসায়িক রাজনীতিবিদের জনপ্রিয়তার সূচক হু-হু করে বাড়তে থাকে। এর পর সবাইকে চমকে দিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন ভেলামা জাতিগোষ্ঠীর রমেশ। ২০১৮ সাল পর্যন্ত পর পর দু’বার রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন তিনি। সেই মেয়াদ শেষ হতেই ভোটের ময়দানে পা রাখেন অন্ধ্রের শিল্পপতি।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দক্ষিণী রাজ্যটির আনাকাপল্লি থেকে বিপুল ভোটে জেতেন রমেশ। তাঁর জয়ের ব্যবধান দাঁড়ায় ২ লক্ষ ৯৬ হাজার ৫৩০। এই শিল্পপতির রাজনৈতিক কেরিয়ারে দল ভাঙানোর দাগও রয়েছে। ২০১৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অন্ধ্রের গদি হারান টিডিপি সুপ্রিমো এন চন্দ্রবাবু নায়ডু। তাঁর জায়গায় কুর্সি পান ওয়াইএসআর কংগ্রেসের জগনমোহন রেড্ডি।
টিডিপি অন্ধ্রের ক্ষমতা হারানোয় তৃণমূলের মতো সেখানেও দলের অন্দরে শুরু হয় বিদ্রোহ। মাত্র এক মাসের মধ্যে ছ’য়ের মধ্যে চার জন সাংসদ যোগ দেন বিজেপিতে। এঁদের মধ্যে অন্যতম রমেশ। তাঁর শিবির বদলে দলত্যাগ-বিরোধী আইনে চন্দ্রবাবু পদক্ষেপ করবেন বলে মনে করা হয়েছিল। যদিও ওই সময় এ ব্যাপারে নীরব থাকেন তিনি। পরে বিজেপির অন্যতম জোটসঙ্গীতে পরিণত হন টিডিপি সুপ্রিমো।
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই ‘কনস্টিটিউশন ক্লাব’-এর নির্বাচনে জড়িয়ে পড়েন রমেশ। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রাজীবপ্রতাপ রুডি ও সঞ্জীব বালিয়ান। পর্দার আড়ালে থেকে দ্বিতীয় জনকে সমর্থন করছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ফলে ভোট নিশ্চিত করার দায়িত্ব পান অন্ধ্রের শিল্পপতি সাংসদ।
এই কাজে নেমে ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে রমেশের। তাঁর নির্দেশেই তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন অন্ধ্রের শিল্পপতি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘাসফুল শিবিরের রাজ্যসভার এক সাংসদ বলেন, ‘‘ওই সময় আমাদের অন্তত তিন জনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে রমেশের। ফলে এখন দল ভাঙানোর খেলায় রমেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া একেবারেই আশ্চর্যের নয়।’’
যদিও এর উল্টো মতও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, তৃণমূলের সংসদীয় দলে ফাটল ধরানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব। গত ৮ জুন দিল্লিতে শতাব্দী রায়ের বাসভবনে বিক্ষুদ্ধদের সঙ্গে দেখা করেন ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়ক। তাঁর সঙ্গে আলোচনার পরই বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে যোগ দেন যাদবপুরের অভিনেত্রী সাংসদ সায়নী ঘোষ।
সূত্রের খবর, দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরে ছ’বারের সাংসদ ও চার বারের বিধায়ক সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন শুভেন্দু। এর পরই শতাব্দীর সঙ্গে একই বিমান দিল্লিতে গিয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। ১৩ জুন প্রথম ভূপেন্দ্র যাদব এবং পরে অমিত শাহের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক হয় তাঁর। এতে তৃণমূলের ভাঙন যে আরও স্পষ্ট হয়ে যায়, তা বলাই বাহুল্য।
বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদেরা এনসিপিআইতে মিশে যেতে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন মহুয়া মৈত্র। তিনি বলেন, ‘‘রমেশ আমার বন্ধু। আমি ওঁকে পছন্দ করি। উনি রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে চান। তার জন্য আমরা কেউ তৃণমূল স্তরে কাজ করি। আবার কেউ ভাল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখেন। রমেশ দ্বিতীয় গোত্রের মানুষ। বিজেপির কাছে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে এ সব করছেন তিনি।’’
এর পর আরও এক ধাপ এগিয়ে একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেন মহুয়া। তাঁর কথায়, ‘‘ওরে বাবা, একটা কেক তৈরি হচ্ছে! সেখানে একটা কিশমিশ তো ফেলে দিয়ে আসি। রমেশ কোনও কারিগর নন, তাঁর কাছে কেক তৈরির উপকরণও নেই। হাতে আছে দুটো কিশমিশ। সেটাই ছুড়ে দিয়ে নিজেকে প্রাসঙ্গিক করছেন তিনি।’’
১৪ জুন, রবিবার, এনসিপিআইতে মিশে যাওয়ার চিঠি দিতে অধ্যক্ষের বাসভবনে যাওয়ার আগে ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে বৈঠক করেন বিদ্রোহী তৃণমূল গোষ্ঠী। সেখানে হাজির হন নিশিকান্ত দুবেও। আগামী দিনে সুদীপ-কাকলি-শতাব্দী-সায়নীরা তৃণমূলের নাম এবং প্রতীক নিয়ে টানাটানি শুরু করলে রমেশ কোনও বড় ভূমিকা পালন করেন কি না, সেটাই এখন দেখার।