ভারতে পায়রা পোষ্য হিসাবে খ্যাত। তবে এ দিক-ও দিক ঘুরে বেড়াতেও দেখা যায় তাদের। পো়ড়ো বাড়ির আনাচকানাচে আস্তানা তৈরি করে নেয় এরা। সেখানেই দিব্য সংসার পাতে। অপরকে বিরক্ত করার প্রবণতা তাদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না।
কিন্তু ইউরোপের দেশগুলিতে গল্পটা অন্য। সেখানকার মানুষজন পায়রার জ্বালায় এক প্রকার অতিষ্ঠই বটে। পায়রার বিষ্ঠায় ভরে যায় সেখানকার রাস্তাঘাট। পথচলতি মানুষদের গায়েও অনেক সময় এসে পড়ে পায়রাদের ‘আশীর্বাদের ফোঁটা’।
তবে কোনও প্রাণীকে শৌচকর্ম করা থেকে আটকানোর সাধ্য কারও নেই। তার উপর সেই প্রাণী যখন পায়রা, তখন তো এ ভাবনা খাটেই না। বিজ্ঞান বলছে, একটি পায়রা ১৫-৩০ মিনিট অন্তর মলত্যাগ করে। কারণ, এই পাখি খাবার খুব তাড়াতাড়ি হজম করে ফেলে।
কোনও পায়রা যদি অসুস্থ হয় বা তার শরীরে যদি কোনও পরজীবী বাসা বাঁধে, তা হলে তো কথাই নেই। ১৫-৩০ মিনিটের অন্তরটা ১০-২০ মিনিটেও নেমে আসতে পারে। সেই কারণে পায়রার মলত্যাগে নিয়ন্ত্রণ আনা এক প্রকার দুষ্কর ব্যাপার।
তাই স্পেনের বিখ্যাত শহর বার্সেলোনা পায়রাঘটিত সমস্যা সমাধানের জন্য নিয়ে এসেছে এক অভিনব উপায়, যাতে কোনও পাখিকে হত্যাও করা হবে না, আবার শহরের মানুষ পায়রাজনিত সমস্ত সমস্যা থেকে মুক্তিও পাবেন।
কয়েক হাজার পায়রার ঘর বার্সেলোনা। সেই কারণে সেখানাকার মানুষদের তো অসুবিধা হয়ই। পর্যটকেরাও সেখানে ঘুরতে গিয়ে পায়রাদের সঙ্গে মানিয়ে উঠতে পারেন না। বিরক্ত হন। অনেকে আবার আর কখনও বার্সেলোনা না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সেই কারণে বার্সেলোনার প্রশাসনিক পরিষদ থেকে পায়রাদের জন্মনিরোধক বড়ি খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে পায়রাগুলির প্রাণরক্ষাও হবে, আবার তাদের ঊর্ধ্বমুখী সংখ্যাতেও নিয়ন্ত্রণ টানা যাবে। কিন্তু পাখিকে জন্মনিরোধক বড়ি খাওয়ানো হবে কী ভাবে?
সেই কাজের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে এক বিশেষ যন্ত্রের। বার্সেলোনা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছে সেই বিশেষ ধরনের যন্ত্র। পুরো শহর জুড়ে মোট ৪০টি যন্ত্র বসানো হয়েছে। সেগুলি পূর্ণ করা হয়েছে পায়রার খাবার দিয়ে। প্রতি দিন সকাল ৮টায় সেই যন্ত্রগুলি থেকে বেরিয়ে আসে পাখির খাবার। এক একটি যন্ত্র থেকে আনুমানিক ৫০০ গ্রাম মতো খাবার বেরোয়। আর সেই খাবারে মেশানো থাকে নিকারবাজ়িন নামের জন্মনিরোধক ওষুধ।
অন্যান্য জীবের মতো পায়রাও যেখানে খাবার পায়, সেখানেই থাকে। ফলত বিশেষ সেই যন্ত্রগুলির আশপাশে বেড়ে চলে পায়রাদের ভিড়। সেখান থেকে বেরোনো খাবার খাওয়ার মাধ্যমে তাদের শরীরে প্রবেশ করে সেই জন্মনিরোধক ওষুধ।
এর ফলে পায়রাগুলির প্রাণ হারানোর কোনও ভয় নেই। পুরুষ বা স্ত্রী, যে পায়রাই এ খাবার গ্রহণ করুক না কেন তার দেহে শুক্রাণু বা ডিম্বাণু উৎপাদন হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি বন্ধও হয়ে যেতে দেখা যায়। মেয়ে পায়রার ডিম্বাণু স্ফুটন ব্যাহত হয়। আর ছেলে পায়রাদের শুক্রাণু উৎপাদিত হয় না। এর ফলে বংশবিস্তার বাধা পায়।
এ ক্ষেত্রে বার্সেলোনার বাসিন্দাদেরও মানতে বলা হয়েছে বিশেষ এক নিয়ম। পায়রাদের প্রতি যতই প্রেম থাকুক না কেন, তাদের খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে সেই শহরের বাসিন্দাদের। কোনও উদ্যানে বা মাঠে ঘুরতে বেরিয়ে মন চাইল বলে পায়রাকে একটু খাবার দিলাম, এমন কোনও কাজের উপর জারি করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
এই কাজ বন্ধ করার জন্য বার্সেলোনার প্রশাসনিক পরিষদ থেকে সচেতনমূলক প্রচার করা হয়েছে। এরই সঙ্গে সেখানকার লোকজন আদৌ সে নির্দেশ মানছেন কি না তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য লোকও নিয়োগ করা হয়েছে।
২০১৭ থেকে বার্সেলোনায় পায়রার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য এই পন্থা চালু করা হয়। সেই সময় বার্সোলোনায় পায়রার সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৫ হাজার। প্রায় এক দশকের কাছাকাছি সময় এসে দাঁড়িয়ে সেখানকার পায়রার সংখ্যা ৭০ শতাংশেরও বেশি হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছে।
সবচেয়ে ভাল বিষয় হল এই কাজটি সম্পূর্ণ নৈতিক। এতে কোনও পায়রা আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি, তাদের মেরেও ফেলা হয়নি। কেবল বংশবিস্তার আটকে দিয়েই পায়রাগুলির সংখ্যা বৃদ্ধি আটকে ফেলা গিয়েছে। তা দেখে প্যারিস এবং ব্রাসেলসও পায়রার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য এই পথ বেছে নিয়েছে।