ধনকুবের ভারতীয় শিল্পপতি গৌতম আদানির সংস্থাকে ‘তাড়িয়ে’ বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণের কাজ অবশেষে চিনা কোম্পানির হাতে তুলে দিল কেনিয়া। এর জন্য বেজিঙের সঙ্গে কয়েক কোটি ডলারের চুক্তি করেছে নাইরোবি। তবে ড্রাগনের কথায় ‘নাচার’ খেসারতও দিতে হচ্ছে তাদের। কারণ, একই কাজের জন্য আফ্রিকার দেশটির থেকে ৫০ শতাংশ বেশি অর্থ নিচ্ছে মান্দারিনভাষীরা।
২০২৪ সালে নাইরোবির জ়োমো কেনিয়াট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (জেকিআইএ) অধিগ্রহণে উদ্যোগী হয় আদানি গোষ্ঠী। এ ব্যাপারে কেনিয়া সরকারের সঙ্গে অনেক দূর এগিয়েছিল কথাবার্তা। বিমানবন্দরটির আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণের দায়িত্বও ভারতীয় সংস্থাটি পাবে বলে মনে করা হচ্ছিল। দু’বছরের মাথায় তা পুরোপুরি বাতিল করে একটি চিনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সেরেছে আফ্রিকার দেশটি।
একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাইরোবির বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণের বরাত পেয়েছে ‘চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোং’ (সিসিসিপি) নামের বেজিঙের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। এর জন্য তাদের ২৯০ কোটি ডলার দেবে কেনিয়া সরকার। বিশ্লেষকদের একাংশের অবশ্য দাবি, সুযোগ পেয়ে আফ্রিকার দেশটির থেকে ‘গলাকাটা’ দাম নিচ্ছে ড্রাগন।
সূত্রের খবর, নাইরোবির বিমানবন্দর আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণের জন্য কেনিয়া সরকারের থেকে ২০০ কোটি ডলার চেয়েছিল আদানি গোষ্ঠী। পাশাপাশি, উড়ান পরিষেবাকে আরও লাভজনক করার নীলনকশাও ছকে ফেলে তারা। কিন্তু, তাদের সঙ্গে চুক্তি না করে একই কাজের জন্য প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি খরচের সিদ্ধান্ত নিল ওই আফ্রিকান রাষ্ট্র। এর জন্য কেনিয়াকে আগামী দিনে পস্তাতে হতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
কেনিয়ার জ়োমো কেনিয়াট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বেশ কিছু অদ্ভুত সমস্যা রয়েছে। এটিকে পূর্ব আফ্রিকার উড়ান পরিষেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বলা যেতে পারে। আর তাই নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে যাত্রীদের চাপ সেখানে অনেক বেশি। সেই কারণেই জেকেআইএ-র সম্প্রসারণে কোটি কোটি ডলার খরচ করতে উদ্যোগী হয়েছে নাইরোবি।
বিমানবন্দরটির আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণের জন্য চিনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাটির সঙ্গে ২০ বছরের চুক্তি করেছে কেনিয়া। সেই সমঝোতা অনুযায়ী, ২০৪৫ সাল পর্যন্ত এর পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ করবে সিসিসিপি। এর মধ্যে রানওয়ে, যাত্রী টার্মিনাল, বিমান পার্কিংয়ের হ্যাঙ্গার, বিমানবন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী সড়ক এবং অন্যান্য সহায়ক সুযোগ-সুবিধার নির্মাণকাজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
একটি বিবৃতিতে কেনিয়া সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি দিয়ে সর্বোচ্চ ৭৫ লক্ষ যাত্রী চলাচল করতে পারেন। কিন্তু, বাড়তে বাড়তে গত বছর (২০২৫ সাল) সেটা ৯০ লক্ষে পৌঁছে যায়। আর তাই এর আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিচ্ছেন আফ্রিকার দেশটির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো। এর জন্য জাতীয় পরিকাঠামো তহবিলের টাকা খরচের অনুমতিও দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কেনিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামোর উন্নতিতে দীর্ঘ দিন ধরেই কাজ করছে সিসিসিসি-সহ একাধিক চিনা সংস্থা। নাইরোবি এক্সপ্রেসওয়ে এবং মোম্বাসা-নাইরোবি স্ট্যান্ডার্ড গেজ় রেলওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বরাত পেয়েছে তারা। জ়োমো কেনিয়াট্টা বিমানবন্দরের চুক্তিও তাদের হাতে যাওয়ায় আফ্রিকার দেশটিতে বেজিংয়ের অবস্থান যে আরও মজবুত হল, তা বলাই বাহুল্য।
২০২৪ সালে বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণের জন্য ভারতের আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে কেনিয়ার সরকারের আলোচনা শুরু হতেই আন্দোলনে নামেন সেখানকার কর্মীদের একাংশ। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, চুক্তি সম্পন্ন হলেই খরচ কমানোর নামে ছাঁটাইয়ের রাস্তায় হাঁটবে গুজরাটের শিল্পসংস্থা। ফলে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ধর্মঘটেরও ডাক দেয় তাঁদের সংগঠন কেনিয়া অ্যাভিয়েশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন।
বিমানবন্দরের কর্মী অসন্তোষ সত্ত্বেও আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা থামায়নি নাইরোবি প্রশাসন। ফলে জ়োমো কেনিয়াট্টায় অতিরিক্ত রানওয়ে তৈরির বরাত পেতে একরকম মরিয়া হয়ে ওঠে ভারতীয় শিল্প সংস্থা। বিনিময়ে তাদের হাতেই ৩০ বছরের জন্য বিমানবন্দরটির মালিকানা তুলে দিতে একরকম রাজি হয়ে যায় কেনিয়া সরকার।
এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক সংগঠনের বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করলে তাতে হস্তক্ষেপ করে আফ্রিকান রাষ্ট্রটির স্থানীয় আদালত। ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নে সাময়িক স্থগিতাদেশ দেয় তারা। ফলে আদানি এয়ারপোর্ট হোল্ডিং লিমিটেড নাইরোবিতে পা রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয় দোলাচল, দু’বছরের মাথায় যেটা পুরোপুরি হাতছাড়া হয়েছে তাদের।
আন্দোলনকারী কেনীয় বিমানকর্মীদের বক্তব্য ছিল, সরকার দেশের অন্যতম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরটিকে পুরোপুরি বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দিতে চাইছে। এই ইস্যুতে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন শ্রমিক ইউনিয়ন শীর্ষনেতারা। তাঁরা বলেন, আদানির সঙ্গে চুক্তি হলে চাকরি হারাবে অনেক কেনীয় শ্রমিক। সেই শূন্যস্থান পূরণে কাজে নেওয়া হবে বিদেশিদের।
এই নিয়ে বিক্ষোভ বাড়তে থাকায় চাপের মুখে বিবৃতি দেয় কেনীয় সরকার। বলে, বিমানবন্দর বিক্রি করা হচ্ছে না। এর আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণের ব্যাপারে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে এটি চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিমানবন্দরটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়েও ভাবনাচিন্তা করছে প্রশাসন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আদানি এয়ারপোর্ট হোল্ডিংস লিমিটেড নাইরোবির জ়োমো কেনিয়াট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ এবং ৩০ বছরের মেয়াদি চুক্তিতে অধিগ্রহণের জন্য ১৫ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা দিতে রাজি ছিল। প্রাথমিক ভাবে তাতে রাজি হয়েও শেষ পর্যন্ত কেনিয়া সরকার তাতে পিছিয়ে আসায় দানা বেঁধেছে সন্দেহ।
মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ নাইরোবিকে ধীরে ধীরে ঋণের জালে জড়িয়ে নিয়েছে বেজিং। চিনের থেকে নেওয়া কেনিয়ার ঋণের পরিমাণ অবশ্য এখনও জানা যায়নি। তবে সেটা ৫০ হাজার কোটি ডলার বা তার বেশি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো ড্রাগনের থেকে চড়া সুদে ওই টাকা নিয়েছে তারা। ফলে ধার শোধ করতে বেশ কয়েক বার আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফের (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড) কাছে হাত পাততে হয়েছে তাদের।
চিনা ঋণের জাল কেটে বেরিয়ে আসতে মোম্বাসা বন্দর বা অন্য একটি বিমানবন্দরের ৯০ শতাংশ মালিকানা বেজিঙের হাতে নাইরোবি তুলে দিতে চলেছে বলে সেখানকার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে প্রতিবেদন। যদিও পত্রপাঠ তা খারিজ করে দেয় কেনীয় সরকার। ২০২৪ সালে তারা জানায়, ঋণ মেটাতে জাতীয় সম্পত্তি কখনওই কোনও বিদেশি রাষ্ট্রকে হস্তান্তর বা লিজ়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই প্রশাসনের।
বিশ্লেষকদের দাবি, ভারতীয় সংস্থাগুলি আফ্রিকায় বিনিয়োগ করুক, তা কখনওই চায় না চিন। এতে ওই মহাদেশে নিজের অবস্থান যে নয়াদিল্লি অনেকটাই মজবুত করে ফেলবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর তাই আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারি স্তরে আলোচনার মুহূর্তে কেনিয়ার বিমানবন্দর কর্মীদের বিক্ষোভের নেপথ্যে বেজিঙের ষড়যন্ত্রের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন তাঁরা।
২০০৯ সালে চিনের আর্থিক এবং কারিগরি সহায়তায় হাম্বানটোটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পে হাত দেয় শ্রীলঙ্কা। এর জন্য বেজিঙের ব্যাঙ্ক থেকেই উচ্চ সুদে প্রায় ১৬ হাজার কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল কলম্বো। ২০১৩ সালে বিমানবন্দরটি উদ্বোধনের পর দেখা যায় সেখানে যাত্রী চলাচল করছে খুব কম। ফলে মারাত্মক আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ে দক্ষিণের ওই দ্বীপরাষ্ট্র। ২০২২ সাল আসতে আসতে পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে যায় সেটি।
শ্রীলঙ্কার মতোই নেপালের পোখরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরি করেছে চিন। এর জেরে বেজিঙের ঋণের ফাঁদে পড়েছে কাঠমান্ডুও। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ড্রাগনের সঙ্গে যৌথ ভাবে বালোচিস্তান প্রদেশের গ্বদরে একটি বিমানবন্দরের উদ্বোধন করে পাকিস্তান সরকার। দেড় বছর পেরিয়ে হাতেগোনা বিমান ওঠানামা করেছে সেখানে। কিন্তু মান্দারিনভাষীদের ঋণের জালে জড়িয়ে গিয়েছে ইসলামাবাদ।
কেনিয়ার ক্ষেত্রে চিনা চক্রান্তের গন্ধ মিলতেই কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারকে সাবধান করে দেশের শতাব্দীপ্রাচীন দল কংগ্রেস। এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) জয়রাম রমেশ লেখেন, ‘‘আদানিদের বিরুদ্ধে নাইরোবির আন্দোলন ভারত এবং ভারতের সরকারের বিরুদ্ধে রোষে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’’ তার পরেও কেন নয়াদিল্লি সতর্কতামূলক কোনও পদক্ষেপ করতে পারল না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।