ড্যান কুপার ওরফে ডিবি কুপার। আমেরিকার অপরাধের ইতিহাসে এমন এক নাম, যাঁর অপরাধের প্রকৃতি এবং অন্তর্ধান রহস্য নাড়া দিয়েছিল সারা বিশ্বকে। অনেক চেষ্টা করে এবং ৫২ বছর ধরে খুঁজেও তাঁর খোঁজ পায়নি আমেরিকার গোয়েন্দাসংস্থা এফবিআই।
এখনও ইন্টারনেটে ড্যানের নামে সার্চ দিয়ে খোঁজেন বা জানার চেষ্টা করেন বহু মানুষ। কিন্তু কে এই ড্যান কুপার? কী অপরাধ করেছিলেন তিনি? কেনই বা রহস্য রয়েছে তাঁর অন্তর্ধান নিয়ে? এমন হাজারো প্রশ্ন রেখে মাত্র এক দিনে কয়েক ঘণ্টার উপস্থিতি দিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন কুপার।
১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর। অন্য সাধারণ দিনের মতোই নর্থ-ওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সের বিমান ফ্লাইট-৩০৫ বোয়িং-৭২৭ পোর্টল্যান্ড থেকে সিয়াটলের উদ্দেশে রওনা হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রাও শুরু করে বিমানটি। রওনা দেয় গন্তব্যের উদ্দেশে।
সেই বিমানেই যাত্রী হয়ে উঠেছিলেন ছিমছাম চেহারার এক প্রৌঢ়। তীক্ষ্ণ চোয়াল, পরনে স্যুট, চোখে সানগ্লাস। নাম ড্যান কুপার। ইতিহাস তাঁকে চেনে ডিবি কুপার নামে। বিমানে একঝলক তাঁকে দেখে অনেকেরই মনে হয়েছিল তিনি কোনও ব্যবসায়ী কিংবা কর্পোরেট কর্তা।
বিমানে কেবল একটি সুটকেস নিয়ে উঠেছিলেন কুপার। বিমানে উঠে চুপচাপ নিজের জন্য বরাদ্দ সিটে গিয়ে বসে পড়েন তিনি। বিমানটি রওনা দেওয়ার আগে হাসিমুখে এক বিমানসেবিকাকে নিজের কাছে ডাকেন। প্রথমে মদ অর্ডার করেন। পরে পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধূমপান করতে শুরু করেন। ওই দিন দুপুর ২টো ১৮ মিনিট নাগাদ বিমান যাত্রা শুরু করে।
বিমান ওড়ার কিছু ক্ষণ পরেই এক বিমানসেবিকাকে ডেকে স্মিত হেসে তাঁর হাতে একটি খাম তুলে দিয়েছিলেন কুপার। বিমানসেবিকার নাম ছিল ফ্লোরেন্স সফনার। খাম থেকে এক টুকরো কাগজ বার করে তাতে কী লেখা আছে পড়েন ফ্লোরেন্স। আর তা পড়তেই হতবাক হয়ে যান তিনি। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায় তাঁর!
কুপারের দেওয়া ছোট্ট কাগজে লেখা ছিল, ‘‘আমার কাছে একটি বোমা রয়েছে। আপনি আমার কাছে বসুন।’’ সেই সময় কী করা উচিত ফ্লোরেন্সের মাথায় আসছিল না। এমন সময় কুপার তাঁকে পাশের আসনে বসতে অনুরোধ করেন। ভয়ে ভয়ে ফ্লোরেন্স তাঁর পাশে বসে পড়েন।
কুপার সুটকেস খুলে দেখান ফ্লোরেন্সকে। বিমানসেবিকা দেখেন ওই সুটকেসে আটটি ডিনামাইট এবং একটি ডিটোনেটার রাখা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে চুপ করে কুপারের কথা শুনছিলেন ফ্লোরেন্স। তত ক্ষণে অবশ্য তিনি বুঝে গিয়েছিলেন বিমান হাইজ্যাক হয়ে গিয়েছে।
ফ্লোরেন্সকে নিজের তিনটি দাবির কথা জানান কুপার। প্রথম দাবিতে বলা হয়, বিকেল ৫টার মধ্যে তাঁকে নগদ ২ লক্ষ ডলার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁর জন্য বিমানে দু’টি প্যারাসুট পাঠাতে হবে। তৃতীয়ত, সিয়াটল বিমানবন্দরে একটি জ্বালানিভর্তি ট্রাকের বন্দোবস্ত করতে হবে। হাবেভাবে এ-ও বুঝিয়ে দেন, কোনও চালাকির চেষ্টা করলে ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটাবেন তিনি।
তবে কুপারের সঙ্গে ফ্লোরেন্সের কথোপকথনের বিষয়টি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি বাকি যাত্রীরা। বিমান হাইজ্যাক হয়েছে তা-ও জানতে পারেননি। তাঁরা জানতেন, ৪৫ মিনিটেই তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন। কুপারের দাবি বিমানের ক্যাপ্টেনকে বলেন ফ্লোরেন্স।
এর পর বিমানে থাকা অন্য বিমানসেবিকা টিনা মাকলো একটি ইন্টারকম টেলিফোন নিয়ে কুপারের পাশে বসেন। পাইলট এবং কুপারের মধ্যে কথাবার্তা চলেছিল সেই ইন্টারকমের মাধ্যমেই। খবর জানাজানি হতেই আমেরিকার প্রশাসন কুপারের সব দাবি মেনে নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়। কারণ, তার আগে আমেরিকায় অর্থের জন্য বিমান হাইজ্যাকের ঘটনা কখনও ঘটেনি। প্রশাসনও ধরে নিয়েছিল, বিমান এক বার মাটিতে পা রাখলে কুপারকে ধরতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।
প্রশাসন এবং কুপারের কথাবার্তা চলাকালীন সিয়াটল বিমানবন্দরের এলাকা জুড়ে চক্কর খাচ্ছিল বিমানটি। বিমানে থাকা যাত্রীদের বলা হয়, যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য বিমান অবতরণ সম্ভব হচ্ছে না। তবে তত ক্ষণে সিয়াটলের স্থানীয় ব্যাঙ্ক থেকে নগদ দু’লক্ষ ডলারের বন্দোবস্ত করে ফেলেছিল প্রশাসন। ডলারের নম্বরও নিজেদের কাছে নথিভুক্ত করেছিল। কুপারের দাবিমতো দু’টি প্যারাসুটও পাঠানো হয়।
৫টা ৪৫ মিনিটে সিয়াটল বিমানবন্দরে অবতরণ করে ফ্লাইট-৩০৫ বোয়িং-৭২৭। সঙ্গে সঙ্গেই কুপারের কাছে নগদ অর্থ এবং প্যারাসুট পৌঁছে দেওয়া হয় প্রশাসনের তরফে। বিমানে জ্বালানিও ভরা হয়। ওই অবস্থায় কুপার ৩৫ যাত্রী এবং দু’জন বিমানকর্মীকে বিমানের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেন।
কিন্তু পাইলট এবং দু’জন বিমানকর্মীকে বিমানে রেখে আবারও বিমান উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন কুপার। সঙ্গে জানান, তাঁর নির্দেশমতো বিমান চালাতে হবে। না হলেই বিস্ফোরণ! পাইলটকে মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে বিমান নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
কিন্তু জ্বালানির অপ্রতুলতায় মেক্সিকো সিটি পৌঁছোনো সম্ভব ছিল না। সে কথা পাইলট তাঁকে জানান। এর পর বিমান কতটা উচ্চতায় কত গতিবেগে চলবে, সবই ঠিক করে দিচ্ছিলেন কুপার। রিনো অথবা ফিনিক্সে আবারও জ্বালানি ভরার জন্য বিমানচালককে নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি। ঠিক হয় রিনোয় অবতরণ করবে বিমানটি। এই সময় দু’টি যুদ্ধবিমানকে ওই ফ্লাইট-৩০৫ বোয়িং-৭২৭-এর পিছনে ধাওয়া করতে পাঠায় আমেরিকা।
রাতের অন্ধকারে বিমানটি রিনো বিমানবন্দরে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বিমানচালক। এমন সময় বিমানসেবিকা টিনাকে ককপিটে যাওয়ার নির্দেশ দেন কুপার। ককপিটের দরজা খোলার সময় টিনা দেখেন, কুপার কোমরে কিছু একটা বাঁধছেন। এর পর দরজা বন্ধ করে ককপিটে ঢুকে যান টিনা। তাঁদের দাবি, ওই সময় কেউ না থাকার সুযোগ নিয়ে বিমানের সিঁড়ি খুলে উড়ন্ত বিমান থেকে প্যারাসুট নিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কুপার।
তিন ঘণ্টা পর রিনো বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিমানটি। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কুপারের কোনও চিহ্ন পাননি গোয়েন্দারা। তবে যে দু’টি প্যারাসুট তাঁকে দেওয়া হয়েছিল, তার একটি মিলেছিল। সঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল তাঁর টাই এবং আটটি সিগারেট। পাওয়া গিয়েছিল তাঁর স্বাক্ষর করা বিমানের বোর্ডিং পাসটিও। তবে কুপারের হদিস মেলেনি। অনেক চেষ্টা করেও তাঁর খোঁজ পায়নি এফবিআই। গত ৫৫ বছর ধরে তিনি বেপাত্তা।
তবে বিমানকর্মী এবং যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে কুপারের একটি স্কেচ তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর ছবির সঙ্গে তাঁকে দেওয়া ডলারের নম্বর মিলিয়েও লাভ হয়নি। তাঁকে খুঁজে দিলে পুরস্কার দেওয়া হবে এমন ঘোষণাও করেছিল আমেরিকা। কিন্তু তাতেও সমাধান হয়নি। তদন্তকারীরা অনুমান করেছিলেন, আমেরিকার একটি পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা এলাকায় প্যারাসুট নিয়ে অবতরণ করেছিলেন কুপার। কিন্তু সেই এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি কুপারের খোঁজ।
ওই ঘটনার ৯ বছর পরে ১৯৮০ সালে দক্ষিণ ওয়াশিংটনের কলম্বিয়া নদীর ধারে একটি বাচ্চা খেলা করছিল। সেই বালক বালি খুঁড়তে খুঁড়তে তিনটি ডলারের বান্ডিল পেয়েছিল। ছেলের হাতে এত ডলার দেখে ঘাবড়ে যান তাঁর বাবা-মা। মোট ৫,৮০০ ডলার পাওয়া গিয়েছিল ওই এলাকা থেকে। বাচ্চাটির মা-বাবা ওই ডলারের বান্ডিল তুলে দিয়েছিলেন এফবিআইয়ের হাতে। তাঁরা তদন্ত করে জানতে পারেন, সেই ডলারগুলি দেওয়া হয়েছিল ডিবি কুপারকে। কুপার যে এলাকায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন, সেখান থেকে ওই এলাকাটি ছিল ২৭ কিমি দুরে।
কুপারের কোনও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সদস্য হওয়ার কথাও উড়িয়ে দেননি আমেরিকার গোয়েন্দারা। কারণ, তাঁকে যে প্যারাসুটগুলি দেওয়া হয়েছিল, তার একটি সেনাবাহিনীর ছিল। অন্যটি ছিল সাধারণ মানের। সেনাবাহিনীর প্যারাসুট নিয়েই বিমান থেকে লাফ দেন কুপার। দক্ষ প্রশিক্ষণ না থাকলে ওই ধরনের প্যারাসুট চালানো সম্ভব নয়। তবে এত কিছু করেও কুপারের খোঁজ পাওয়া যায়নি। আজও পৃথিবীর কাছে রহস্যে মোড়া কুপার অন্তর্ধান রহস্য।