Morocco water crisis

জলশূন্য জীবনে কুয়াশার হাতছানি! প্রত্যন্ত গ্রামে ‘জীবন’ দান করছে পাহাড়ি হাওয়া, সাহায্য করছেন ‘কর্মহীন’ মহিলারা

মাইলের পর মাইল হেঁটে জল আনতে যাওয়ার দিন ফুরিয়েছে মরক্কোর এইট বামরানের আশপাশের গ্রামের মহিলাদের। পরিবর্তে তাঁরা এখন কুয়াশা দিয়ে জল তৈরিতে ব্যস্ত। সাহায্য করেছে এক অসরকারি সংস্থা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ ১৪:৪৩
Share:
০১ ২১

রাস্তা দিয়ে চলতে-ফিরতে হামেশাই চোখে পড়ে কল থেকে বেরিয়ে চলা জলের ধারা। বাড়িতেও আমরা প্রায়শই জল অপচয় করে থাকি। জলকষ্ট নিয়ে সমাজমাধ্যমে, সংবাদমাধ্যমে পাতার পর পাতা লেখা হলেও, আদতে সেই কষ্ট ঠিক কতটা গুরুতর তা শহুরে মানুষের ধারণার বাইরে।

০২ ২১

গ্রামাঞ্চলের বহু মানুষের কাছে সেই কষ্টটা অজানা নয়। বিশেষ করে মরু অঞ্চল বা শুষ্ক অঞ্চলে বসবাসকারীদের কাছে এ সমস্যা দৈনন্দিন। সেখানকার বাসিন্দারা মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেন দু’ফোঁটা জলের সন্ধানে। প্রধানত মহিলাদের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপে জল সন্ধানের।

Advertisement
০৩ ২১

কেবল দেশের পশ্চিম প্রান্তের রাজস্থান নয়, সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের মরক্কোর মহিলারাও এই একই সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন বছরের পর বছর। মরক্কোর এইট বামরানের আশপাশের গ্রামগুলিতে জলের সমস্যা প্রবল। সাহারার খুব কাছে থাকায় এই অঞ্চলটি বেশ শুষ্ক। পানীয় জলের উৎস প্রায় নেই বললেই চলে।

০৪ ২১

সে সমস্ত গ্রামে যে ক’টা কুয়ো রয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সেগুলি সবই শুকিয়ে যায়। জলতলের হদিস পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। সেই সময় মাইলের পর মাইল হেঁটে মহিলা এবং বাচ্চাদের জল আনতে যেতে হত।

০৫ ২১

গরম ও তপ্ত রোদে বড় কলসি মাথায় চাপিয়ে জল আনতে যাওয়াই তো শুধু নয়। আবার রোদে পুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে জলপূর্ণ পাত্র মাথায় বয়ে নিয়েও আসতে হত তাঁদের। দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে প্রায় ২৩ লিটার জল তাঁদের প্রতি দিন টেনে নিয়ে আসতে হত।

০৬ ২১

কিন্তু তাঁদের এই সমস্যা এখন অতীত। পাশে দাঁড়িয়েছে নারী পরিচালিত একটি অসরকারি সংস্থা, নাম ‘দার সি হামাদ ফাউন্ডেশন’।

০৭ ২১

মরক্কোর এইট বামরানের আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের এখন আর জলকষ্টে ভুগতে হয় না। মরু অঞ্চলের কুয়াশাই এই চরম কষ্টের হাত থেকে পরিত্রাণের পথ দেখিয়েছে। এখন গ্রামের বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করে কুয়াশাই। মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে চলা থেকে রেহাই পেয়েছেন গ্রামের মহিলারা।

০৮ ২১

কুয়াশা থেকে কী ভাবে জল তৈরি হচ্ছে? কাজটি অত্যন্ত সহজ এবং কার্যকরী। তেমনটাই জানাচ্ছেন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন। তাঁদের উদ্যোগেই গ্রামের সকলে এখন ‘জীবন’ পান করছেন।

০৯ ২১

এ ক্ষেত্রে সমস্ত গ্রামবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে অ্যান্টি-অ্যাটলাস পর্বতমালার অন্তর্গত মাউন্ট বুটমেজ়গিডা। এটি মরক্কোর এইট বামরানে অবস্থিত। সেই পর্বতের চূড়ায় লাগানো হয়েছে বিশেষ এক ধরনের জাল।

১০ ২১

আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভেসে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস সেই জালে আটকা পড়ে। এরই সঙ্গে জলীয় বাষ্প পূর্ণ কুয়াশাকেও ধরে রাখে সেই জাল।

১১ ২১

মাউন্ট বুটমেজ়গিডারে ৪০০ ফুটেরও অধিক উচ্চতায় ইস্পাতের খুঁটির সঙ্গে লাগানো হয়েছে পলিমারের জাল। প্রতিটি জাল প্রায় ৬০০ বর্গমিটার আকৃতির। তাতে আটকে যায় ভেসে আসা জলীয় বাষ্প পূর্ণ বায়ুর আর্দ্রতা এবং কুয়াশায় মিশে থাকা জলের কণা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা জমে পরিণত হয় বড় বড় জলের ফোঁটায়। তার পর তা নালায় পড়ে।

১২ ২১

সেই সমস্ত নালার সঙ্গে লাগানো রয়েছে সৌরশক্তি চালিত নল, যার প্রবাহপথ তৈরি করা হয়েছে মাটির তলায়। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে লাগানো হয়েছে কল। নালা থেকে বেরোনো ভূগর্ভস্থ নলের সঙ্গে সেই সমস্ত কলের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। নালার জল নলের মাধ্যমে কলে আসে। কোনও রকম পাম্প বা জটিল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন এতে পড়ে না।

১৩ ২১

মরক্কোর অসরকারি সংস্থা ‘দার সি হামাদ ফাউন্ডেশন’ দ্বারা নির্মিত এই প্রকল্প বর্তমানে এইট বামরানের ১০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে পরিষ্কার পানীয় জল সরবরাহ করছে। এর ফলে সেই সমস্ত গ্রামের মানুষদের জলকষ্ট কমেছে। তাঁরা সকলে প্রাণভরে জল খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারছেন।

১৪ ২১

২০০৬ সাল থেকে ‘দার সি হামাদ ফাউন্ডেশন’ এই প্রকল্পের কাজ শুরু করে। ২০১৫ সালে তা জল সরবরাহের যোগ্য হয়ে ওঠে। প্রকল্পটি ফলপ্রসূ হওয়ার প্রথম দিনটি এখনও সেই অসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় মানুষজনের মনে গেঁথে রয়েছে।

১৫ ২১

কল থেকে জল পড়ার সাক্ষী থাকতে গ্রামের সকলে একটি বাড়িতে জড়ো হয়েছিলেন। সেখানে লাগানো কলটি খুলে জল বার করা হয়েছিল। একটি পাত্রে সেই জল সংগ্রহ করে সকলে হাতে হাতে ঘুরিয়ে খাচ্ছিলেন। বর্তমানে এই প্রকল্পটি প্রায় ১৬টি গ্রামে জল সরবরাহ করছে।

১৬ ২১

তবে গ্রামের প্রত্যেকে প্রথমেই এই ব্যবস্থাকে খোলা মনে, সাদরে গ্রহণ করেননি। অনেকেই সেই জল মুখে তুলতে চাইছিলেন না। তাঁদের মধ্যে ধারণা ছিল যে, ভূগর্ভ থেকে যে জল আসছে না, তাতে প্রাণের কোনও অস্তিত্ব নেই। ধর্মীয় কাজেও সেই জল ব্যবহার ব্রাত্য ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে।

১৭ ২১

এই প্রকল্পের প্রধান জামিলা বারগাচ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যে গ্রামে তিনি নিজে ছোট থেকে বড় হয়েছিলেন, সেই গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। ভিটে ছেড়ে সকলে জলের সন্ধানে অন্য জায়গায় পাড়ি দিচ্ছিলেন। এই বিষয়টি তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

১৮ ২১

‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ লো-কার্বন টেকনোলজিস’-এর সমীক্ষা অনুসারে, উন্নত প্রযুক্তির এই জালগুলির এক বর্গমিটার থেকে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ গ্যালন পর্যন্ত জল সংগ্রহ করা যায়।

১৯ ২১

এই জালগুলিতে কোনও সমস্যা দেখা দিলে তা মেরামত করার জন্য বাইরের লোক ডাকতে হয় না। জল আনতে যেতে না হওয়ায় সেই গ্রামের মহিলাদের মধ্যে কর্মশূন্যতার মনোভাব সৃষ্টি হতে দেখা যায়। পরিবারেও তাঁদের মর্যাদা কমতে শুরু করে। সেই সময় ‘দার সি হামাদ ফাউন্ডেশন’ থেকে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়।

২০ ২১

গ্রামের ইচ্ছুক মহিলাদের জালগুলির সংরক্ষণ এবং মেরামতির কাজ শেখানো হয়। এখন তাঁরাই সেগুলির পরিচর্যা করেন। একসময় যাঁরা নিজের নামটুকুও লিখতে পারতেন না, তাঁরা এখন গ্রামের জলব্যবস্থার খেয়াল রাখছেন।

২১ ২১

চলতি মাসে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক রাষ্ট্রপুঞ্জ সংস্থা ‘ইউএনএফসিসিসিসি’ (ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ)–এর পক্ষ থেকে এই প্রকল্পটির প্রশংসা করা হয়েছে। দশকের পর দশক ধরে মারাত্মক জলকষ্টে আক্রান্ত অঞ্চলে জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ‘মডেল’ এটি, এমনটাই জানিয়েছেন তারা।

সব ছবি: সংগৃহীত এবং এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement