মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভোটের নির্ঘন্ট ঘোষণার অব্যবহিত আগে পশ্চিমবঙ্গের দুই শ্রেণির নাগরিকের জন্য দু’টি সুবিধার কথা ঘোষণা করেছেন, তাতে কি আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে?
রবিবার বিকালে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সাংবাদিক বৈঠকে এমনই প্রশ্ন উঠেছিল। জবাব তিনি জানিয়ে দেন, যে মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ-সহ চারটি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়েছে, সেই মুহূর্ত থেকে ওই রাজ্যগুলি এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নির্বাচনের আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হচ্ছে। তার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত নয়। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা রবিবার দুপুরে যে দু’টি ঘোষণা করেছেন, তার সঙ্গে নির্বাচনী আচরণবিধির কোনও সম্পর্ক নেই।
এ প্রশ্ন ওঠা অবশ্য অবান্তর ছিল। পোড়খাওয়া রাজনীতিক এবং পরপর তিন মেয়াদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা আদর্শ আচরণবিধির সময় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকবেন না, এমন আশা করাটা বাতুলতা। মমতা ভোটঘোষণার সময় বিলক্ষণ জেনেই তার ঘন্টাখানেক আগে পরপর দু’টি ঘোষণা করেন নাটকীয় ভাবে।
তার প্রথমটি হল রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য বকেয়া ডিএ (মহার্ঘভাতা) মেটানো। দ্বিতীয়টি মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের ভাতাবৃদ্ধি। সন্দেহ নেই, আসন্ন বিধানসভা ভোটের দিকে নজর রেখেই প্রশাসক মমতার ওই সিদ্ধান্ত। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে মমতা তথা তৃণমূলকে যেতে হচ্ছে গত ১৫ বছরের শাসনকাল এবং স্থিতাবস্থা বিরোধিতা মাথায় নিয়ে। ফলে তাঁকে সমাজের সমস্ত শ্রেণির দাবিদাওয়ার প্রতিই মনোযোগ দিতে হচ্ছে। যার অন্তিম দু’টি হল সরকারি কর্মচারী এবং মুসলিম ও হিন্দুধর্ম।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রবিবার দুপুর ২টো ৪০ মিনিটে এক্স হ্যান্ডলে একটি পোস্ট করে মমতা জানান, পশ্চিমবঙ্গে পুরোহিত এবং মোয়াজ্জিনদের মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এত দিন তাঁরা মাসে ১,৫০০ টাকা করে পেতেন। এ বার তা বেড়ে ২,০০০ টাকা হতে চলেছে। ভাতাবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ঘোষণার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রতিটি সম্প্রদায় এবং ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করাই সরকারের লক্ষ্য। জানান, পুরোহিত এবং মোয়াজ্জিন ভাতার জন্য যাঁরা নতুন আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলেন, তাঁরাও বর্ধিত হারেই ভাতা পাবেন।
তার ২৫ মিনিট পরে দুপুর ৩টে ০৫মিনিটে এক্স হ্যান্ডলে আরও একটি পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকারি কর্মীদের পুরনো বকেয়া মহার্ঘভাতা দেওয়া শুরু হচ্ছে। মমতা লেখেন, ‘আমাদের মা-মাটি-মানুষের সরকার তার সকল কর্মচারী, পেনশনভোগী, লক্ষ লক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অশিক্ষক কর্মচারী, পঞ্চায়েত-পুরসভার কর্মী ও পেনশনভোগীকে যে কথা দিয়েছিল, তা রেখেছে। তাঁরা রোপা-২০০৯ অনুযায়ী বকেয়া ডিএ ২০২৬ সালের মার্চ থেকেই পেতে শুরু করবেন।’
রাজ্যের সরকারি কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া ডিএ-র দাবি করছেন। এ নিয়ে কলকাতা হাই কোর্ট এবং সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিলেন তাঁরা। হাই কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের ডিএ দেওয়ার পক্ষেই রায় দিয়েছে। তার পরে বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মচারী সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনা করে রাজ্য সরকার। সুপ্রিম কোর্টে পাল্টা আবেদন করে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময় চেয়ে নিয়েছিল নবান্ন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ছিল। গত শুক্রবার বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকারি কর্মচারী এবং শিক্ষক সংগঠন একযোগে ধর্মঘট পালন করে। সেই ধর্মঘটে আংশিক সাড়া পড়েছিল রাজ্যের সরকারি দফতরগুলিতে। কিন্তু তখনও এমন কোনও ইঙ্গিত মেলেনি যে, রাজ্য সরকার বকেয়া ডিএ নিয়ে কোনও ঘোষণা করতে পারে। সরকারি আধিকারিকদের একাংশ জানাচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রীর মাথায় বিষয়টি ছিল। আদালতের রায়ও বকেয়া ডিএ মেটানোর পক্ষেই গিয়েছে। ফলে সরকারকে ওই টাকা মিটিয়ে দিতেই হত। মুখ্যমন্ত্রী ভোটঘোষণার আগে নাটকীয় ভাবে ডিএ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।
সিপিএমের সরকারি কর্মচারী সংগঠন কো-অর্ডিনেশন কমিটির নেতা বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরীর অবশ্য দাবি, তাঁদের আন্দোলনের ফলেই রাজ্য সরকার চাপে পড়ে ডিএ নিয়ে ঘোষণা করেছে। তবে অনেকের মতে, এই ঘোষণা চাপে পড়ে নয়, ঘটনাচক্রেও নয়। মমতা জানেন, ডিএ নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মূলত ছিলেন বাম কর্মী সংগঠনগুলির সদস্যেরা। তাঁদের ভোট তৃণমূলের বাক্সে আসার সম্ভাবনা তেমন নেই। কিন্তু রাজ্যে ভোটের দায়িত্বে থাকবেন সরকারি কর্মীরা। তাঁদেরই ভোটের সময়ে বিভিন্ন বুথে এবং গণনাকেন্দ্রে নিয়োগ করবে নির্বাচন কমিশন। বকেয়া ডিএ দিয়ে দিলে সরকারি কর্মচারীরা ‘সন্তুষ্ট’ থাকবেন।
পুরোহিত এবং মোয়াজ্জিনদের ভাতাবৃদ্ধির ঘোষণাও ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলবে। এমনিতেই মুসলিম ভোটের উপর তৃণমূলের ‘অধিকার’ রয়েছে। তবে পাশাপাশিই মমতার বিরুদ্ধে বিজেপির অভিযোগ রয়েছে মুসমিল তোষণের। যার ফলে হিন্দুদের একাংশের ক্ষুন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষত, এই ধর্মীয় মেরুকরণের আবহে। ফলে মমতা একদিকে যেমন মসজিদে আজ়ান দেন যে মোয়াজ্জিনরা, তাঁদের ভাতা বৃদ্ধি করেছেন, তেমনই পুরোহিতদেরও সমহারে ভাতা বাড়িয়েছেন।