মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
ছিল তৃণমূলের ইস্তাহার প্রকাশের কর্মসূচি। শুক্রবারের সেই কর্মসূচিতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারদের প্রসঙ্গে মন্তব্য করলেন। তিনি জানালেন, সূত্র মারফত তাঁর কাছে খবর আছে, প্রায় ৬০ লক্ষের মধ্যে এ পর্যন্ত ২২ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি হয়েছে। সেই ২২ লক্ষ ৬০ হাজারের মধ্যে ১০ লক্ষ নাম বাদ পড়বে বলে জানতে পেরেছেন তিনি। সেখানে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দুই দিনাজপুরে সবচেয়ে বেশি নাম রয়েছে। শুধু তাই নয়, মমতা জানতে পেরেছেন, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের নাম বেশি বাদ পড়েছে। এ ছাড়া হিন্দু, মতুয়া, রাজবংশী সম্প্রদায়েরও মানুষও রয়েছেন।
বিধানসভা ভোটের আবহে রাজ্যে একের পর এক আমলা এবং পুলিশ আধিকারিকের বদলি নিয়ে কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনকে একই পঙ্ক্তিতে ফেলে শুক্রবার আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। দলের ইস্তাহার প্রকাশের কর্মসূচি থেকে মূলত তিনটি ‘নয়া’ অভিযোগ করলেন তৃণমূলনেত্রী। প্রথমেই বিবেচনাধীন ভোটারের ‘ভাগ্য’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার পর রাজ্য ভাগের পরিকল্পনা চলছে বলে অভিযোগ করে তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়ে গিয়েছে!
শুক্রবার রাজ্যের বিবেচনাধীন ভোটারদের তথ্য নিষ্পত্তির প্রথম তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত তা নিয়ে কমিশন থেকে কোনও খবর মেলেনি। শুক্রবার সেই তালিকা আদৌ প্রকাশিত হবে কি না, তা নিয়ে দুপুরে সংশয় প্রকাশ করে তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘‘এই করে করে দিনগুলো নষ্ট করছে।’’
ইস্তাহার প্রকাশের আগে মমতা বলেন, সূত্র মারফত তিনি জানতে পেরেছেন, নিষ্পত্তি হওয়া বিবেচনাধীন ভোটারদের মধ্যে কত নাম বাদ পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘প্রায় ৬০ লক্ষের মধ্যে এ পর্যন্ত ২২ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি হয়েছে বলে শুনেছি। এ-ও শুনেছি, ২২ লক্ষ ৬০ হাজারের মধ্যে ১০ লক্ষ নাম বাদ পড়বে। তাতে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দুই দিনাজপুরে সবচেয়ে বেশি নাম রয়েছে। পার্টিকুলার কমিউনিটির মানুষ রয়েছেন সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া হিন্দু, মতুয়া, রাজবংশী সম্প্রদায়েরও মানুষও রয়েছেন।’’
নির্বাচন কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিবেচনাধীন ৬০ লক্ষের মধ্যে ২৫ লক্ষ ৩৪ হাজার ভোটারের তথ্যের নিষ্পত্তি হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে বৈঠক করেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালরা। তবে তালিকাপ্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি বলেই কমিশনের একটি সূত্রে খবর মিলেছিল। শুক্রবার মমতার সংশয়, ‘‘ভোটের আগে নিষ্পত্তির কাজ শেষ হবে কি না, কে জানে!’’
তার আগে আমলা এবং পুলিশ আধিকারিকদের বদলি নিয়ে একযোগে কমিশন এবং কেন্দ্রকে নিশানা করেছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘অলরেডি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছে। মুখে বলছে না। কিন্তু অ্যাক্টিভিটি (কাজ) প্রমাণ করছে।’’ তাঁর ব্যাখ্যা, ‘‘নির্বাচনের সময় কিছু আধিকারিককে বদলি করা হয়েই থাকে। সেটা নির্বাচন কমিশন করতে পারে। কিন্তু সেখানে সীমাবদ্ধতা আছে।’’
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আমলা বা পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগ থাকতে হয়। তা ছাড়া যাঁরা নির্বাচনের কাজে যুক্ত থাকেন, তাঁদের বদলি হয়। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগে যে ভাবে একের পর এক আমলা এবং পুলিশকর্তার বদলি করা হচ্ছে, তাতে রাজ্য বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘মানুষ খাদ্য পাবে কোথা থাকে? রেশন বন্ধ হয়ে গেলে যেন আমাকে দোষ দেবেন না। আমি তো রেশন দিতে চাই। কিন্তু এখানকার ফুড ডিপার্টমেন্টের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে নিয়ে গিয়েছে অবজ়ার্ভার করে। কখনও শুনেছেন? এঁরা নির্বাচনের কাজে যুক্ত ছিলেন না। এরা উন্নয়নের কাজের দেখাশোনা করতেন। পঞ্চায়েত দফতরের আধিকারিককে বলছে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হয়ে যেতে! ঝড়-জলে রাস্তা ভেঙে গেলে, দুর্যোগ হলে পিডব্লিউডি- প্রিন্সিপাল সেক্রেটারির বড় ভূমিকা থাকে। তাঁকেও অবজ়ার্ভার করে নিয়ে চলে যাওয়া হয়েছে।’’
মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি শুনেছেন, রাজ্যের আরও কয়েক জন আধিকারিককে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে ভিন্রাজ্যে। তাঁদের বদলে যাঁদের আনা হচ্ছে, তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই। মমতা অভিযোগের সুরে বলেন, ‘‘তাঁরা এখানকার মানুষকে চেনেন না, এখানকার ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি জানেন না। নির্বাচনী বুথ, ব্লক, জেলা সম্পর্কে ধারণা নেই। কে দেখবে এ সব?’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘তার পর যদি কোনও ঘটনা ঘটে, এ জন্য দায়ী থাকবে বিজেপি সরকার। কারণ, নির্বাচন কমিশন বিজেপি সরকারের বাইরে নয়। তাদের তোতাপাখি।’’ তার পর কেন্দ্রীয় সরকারকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘লজ্জা! প্রেসিডেন্ট রুল করে মোদীজিকে বাংলায় নির্বাচন করাতে হচ্ছে! বাংলার মানুষকে এত ভয়!’’
এখানেই শেষ নয়। মমতার দাবি, বিজেপির অনেক দিনের ‘টার্গেট’ পশ্চিমবঙ্গকে এ বার যে ভাবে হোক দখল করতে হবে। সে জন্য রাজ্যকে ভাগ করারও কথা চলছে! তাঁর কথায়, ‘‘ওদের প্ল্যান (পরিকল্পনা) আছে, উত্তরবঙ্গ বাদ দিয়ে বিহারের কিছু অংশ নিয়ে আবার নতুন রাজ্য তৈরি করার।’’ ওই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘‘এ দেশে সংবিধান, আইন— সব কিছু মোদী সরকার কিনে নিয়েছে।’’ পরক্ষণেই নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে বলেন, ‘‘আমরা শুনেছি, এই ভোটের পরে আবার ‘ডিলিমিটেশন’ করবে। আগামী বার মোদী সরকার জিতবে না। ক্ষমতায় আসবে না। তাই ‘ডিলিমেটেশন’, এনআরসি এবং সেন্সাসের নাম করে আরও মানুষের নাম বাদ দেওয়াই ওদের পরিকল্পনা।’’
পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়ে গিয়েছে— মমতার এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, আসলে মানুষ চাইছেন, সত্যিই রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়ে যাক। তাঁর কথায়, ‘‘মানুষের কাছে গেলে তাঁরা প্রশ্ন করছেন, রাজ্যে এই সরকারটা এখনও আছে কেন? কেন ফেলে দেওয়া হচ্ছে না? আমরা মানুষকে বোঝাতে পারছি না যে, আমরা কংগ্রেসি নই, ৩৫৬ ধারা জারি করে নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়া আমাদের ডিএনএ-তে নেই।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী বার বার রাষ্ট্রপতি শাসনের কথা বলছেন, কারণ তিনি শহিদ হতে চাইছেন। তিনি মাটি চেনেন। তিনি বুঝতে পারছেন, নির্বাচনে কিছুতেই জিততে পারবেন না। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছেন, যাতে ৩৫৬ ধারা জারি হয়ে যায়। আর তিনি নিরাপদে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে দিল্লি গিয়ে বলতে পারেন, আমার সরকারটাকে ফেলে দিল।’’