গত ফেব্রুয়ারি মাসে তৃণমূলে যোগদান করেন স্বপ্না বর্মণ। —ফাইল চিত্র।
অ্যাথলেটিক্সের সবচেয়ে কঠিন ইভেন্ট বলা হয় হেপ্টাথলনকে। ট্র্যাক আর ফিল্ড মিলিয়ে মোট সাতটি ইভেন্টে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিযোগীকে। সাতটিতেই নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন জলপাইগুড়ি-কন্যা। ২০১৮ সালে এশিয়ান গেমসের সোনাজয়ী স্বপ্না বর্মণ সে বার অসুস্থতাকে তোয়াক্কা না-করে দাঁতে দাঁত চেপে লড়েছিলেন। কিন্তু ভোটের ময়দানে লড়াইয়ের আগে আইনি যুদ্ধের মুখোমুখি রাজগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী। সদ্য পিতৃহারা স্বপ্না আদৌ ভোটে লড়তে পারবেন কি না, তা নিয়ে জেলা তৃণমূলের অন্দরেই ধন্দ তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছেন না অবশ্য।
স্বপ্নার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর চাকরি। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনে কর্মরত তৃণমূলের এই প্রার্থী। মাসখানেক আগে ব্যক্তিগত কারণ দর্শিয়ে কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রেলের অভিযোগ, ছুটিতে থাকাকালীন তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তাঁকে দেখা যায়। নিয়ম বলে, সরকারি চাকরিরত কেউ রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারেন না। ভোটের প্রচারে যোগ দিতে পারেন না। দিলে তা আইনত দণ্ডনীয়। আগামী বিধানসভা ভোটে স্বপ্না তৃণমূল প্রার্থী হওয়ার পরে সেই আইনি জটিলতা আরও গভীর হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারী নির্বাচনে লড়তে চাইলে পদত্যাগ করা বাধ্যতামূলক। স্বপ্নাও গত ১৬ মার্চ পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু রেল তা গ্রহণ করেনি। তার আগেই গত ৯ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন রেল কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ, তিনি কর্মরত অবস্থায় রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন। এই ‘অচলাবস্থা’য় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন স্বপ্না। কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চে তাঁর মামলা বিচারাধীন। রাজগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী জানিয়েছেন, রেলের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরে পেনশন তিনি নেবেন না। এই মর্মে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশন কর্তৃপক্ষকে ইমেল করেছেন। কিন্তু তার পরেও জটিলতা কাটেনি।
গত মঙ্গলবার বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্তের বেঞ্চ স্বপ্না-মামলার শুনানি শুনেছে। রেলের তরফে ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল সুদীপ্ত মজুমদার আদালতে জানান, স্বপ্না যদি তাঁর ভুল স্বীকার করেন এবং অবসরকালীন কোনও সুযোগ-সুবিধা নেবেন না বলে মুচলেকা দেন, তবেই তাঁর ইস্তফা সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এবং সেটা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জানিয়ে দেওয়া হবে।
স্বপ্নার ঘনিষ্ঠ সূত্রে খবর, তিনি মুচলেকা জমা করেছেন। কিন্তু তাঁর চিঠির বয়ানে খুশি নয় রেল। পরের দিন অর্থাৎ, বুধবার জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চে রেল সে কথাই জানিয়েছে। যার প্রেক্ষিতে আদালত আবার স্বপ্নাকে বয়ান ‘ঠিক করে’ চিঠি পাঠাতে বলেছেন। এখন স্বপ্নার ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বা না করার অনেকটাই নির্ভর করছে রেলের পদক্ষেপের উপর। কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল বলেন, ‘‘স্বপ্না বর্মণ রেলকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তার বয়ান আদালতের আদেশ অনুযায়ী ছিল না। বিষয়টি আদালতের নজরে এনেছি আমরা। আদালত তাঁকে পুনরায় আদেশ মোতাবেক চিঠি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। উনি নতুন করে চিঠি দিলে এবং তার প্রেক্ষিতে রেল কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা আদালতকে জানানো হবে।’’ অন্য দিকে, স্বপ্নার আইনজীবী নিলয় চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আদালতের নির্দেশ মেনে আবার রেলকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমরা ইমেল করেছি। একই সঙ্গে আমাদের লোক চিঠির হার্ডকপি নিয়ে রেলের আলিপুরদুয়ার দফতরে গিয়েছেন।’’
স্বপ্না প্রার্থী হওয়ার পরপরই তাঁর বাবা মারা যান। ব্যক্তিগত ভাবে সঙ্কটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। গত কয়েক দিন তাঁকে ভোটপ্রচারেও দেখা যায়নি। তৃণমূল জেলা নেতৃত্ব আশাবাদী, মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনের আগেই এই জটিলতা কাটবে। কিন্তু তা না হলে? স্থানীয় নেতৃত্ব জানাচ্ছেন, নিশ্চয়ই এ বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব কিছু ভেবে রেখেছেন।