রাজীব মিস্ত্রি
এজেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল রাজীবের বাবা নুর আলি মিস্ত্রির।
নুর খুন হয়েছেন চার দিন আগে। রবিবার তাঁর পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম সেরে শাসনের কীর্তিপুরে সিপিএম বুথ এজেন্টের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বছর কুড়ির রাজীব। সোমবার সকালে বুথে বসেই নজর পড়ল এক ভোটারের দিকে। রাজীব চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘‘এই লোকটাই খুন করেছে আমার বাবাকে! ওকে ধর।’’
চিৎকার শুনে ভোটকর্মীরা তখন হতভম্ব। ছুটে এলেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা। এল পুলিশ। যাকে নিয়ে হই-হট্টগোল, ফাঁকতালে সে সরে পড়ার চেষ্টা করছিল। জওয়ানেরা দ্রুত ধরে ফেললেন তাকে। পুলিশ জানাল, ধৃতের নাম হাফিজুল ইসলাম। খুনের ঘটনায় যে ১০ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়, হাফিজুল তাদের এক জন। ভোট দিতে এসে নিহতের ছেলের হাতেই ধরা পড়ে গেল।
সোমবার এই ঘটনার সাক্ষী থাকল হাড়োয়া বিধানসভা কেন্দ্রের পশ্চিম মহিষগদি প্রাথমিক স্কুলের ৫৬ নম্বর বুথ। নুরের পরিবারের দাবি, এলাকায় তৃণমূল কর্মী বলেই পরিচিত হাফিজুল। সিপিএমের দাবি, ভোটের আগে সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করতেই খুন করা হয়েছিল নুরকে। তৃণমূল অবশ্য ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বলে মানতে চায়নি। এ দিন স্থানীয় নেতারা দাবি করেন, হাফিজুল দলের কেউ নয়।
কিন্তু ঘটনা হল, সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরির চেষ্টায় যেমন কসুর ছিল না, তেমনই ভোটের দিন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বরও ছিল উচ্চকিত। যে কারণে বাবা খুন হয়ে যাওয়ার পরেও রাজীব সিপিএমের এজেন্ট হয়ে বুথে বসার সংকল্প করেন।
নুরের ভাই আজান মিস্ত্রি এ দিন রাজীবের ‘রিলিভার’ হিসাবে হাজির ছিলেন ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের বাইরে। বললেন, ‘‘ক’দিন আগেই দাদাকে খুন করেছে ওরা। তার পরেও ভাইপো ভেঙে পড়েনি। ওর মনোবল বাড়াতেই আমি রিলিভার হয়েছি।’’ পাশের ৫৬ নম্বর বুথে এজেন্ট হয়েছিলেন রাহাজুল ইসলাম, নুরের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। ১৯ তারিখ রাতে তাঁর বাড়িতে বৈঠক চলাকালীনই আক্রান্ত হয়েছিলেন নুর। রাহাজুল বলেন, ‘‘সব মানুষ এই ঘটনায় খেপে আছে। সকলেই প্রতিরোধের জন্য তৈরি।’’ নুরের বৃদ্ধা মা আর স্ত্রীও এ দিন ভোট দিয়েছেন। আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে স্ত্রী রিজিয়া বিবি বলেন, ‘‘ওঁর আত্মার শান্তি চেয়েই ভোট দিতে এলাম। আর কী করতে পারি!’’
আর রাজীব জানাচ্ছেন, তিনি এজেন্ট হবেন, চাননি বাড়ির কেউ কেউ। কিন্তু জেদ চেপে গিয়েছিল সদ্য তরুণের। চোয়াল শক্ত করে বললেন, ‘‘বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চেয়েছিলাম।’’