(বাঁ দিক থেকে) সুব্রত গুপ্ত, জাহাঙ্গির খান এবং অজয়পাল শর্মা। — ফাইল চিত্র।
নির্বাচন কমিশনের সাফল্যে ব্যর্থতার ‘দাগ’ লাগিয়ে দিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা। শেষপর্যন্ত গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে নতুন করে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে হল কমিশনকে। এমন পরিস্থিতি সাম্প্রতিক অতীতে অন্তত পশ্চিমবঙ্গে ঘটেছে বলে কেউ মনে করতে পারছেন না। আগামী ২১ মে ফলতার ২৮৫ ভোটকেন্দ্রে আবার ভোটগ্রহণ হবে। আর ভোটগণনা হবে আগামী ২৪ মে। এর ফলে সোমবার ফলতা বাদে রাজ্যের ২৯৩ আসনে ভোটগণনা হবে।
শনিবার রাতে কমিশন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ফলতা বিধানসভার ভোটগ্রহণের বিষয়টি জানিয়েছে। কমিশন ২৯ এপ্রিল, বুধবার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে যে ভোটগ্রহণ হয়েছে, তা পুরোটাই বাতিল করেছে। কমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, ফলতার বহু ভোটকেন্দ্রে গুরুতর নির্বাচনী অপরাধ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। সেই কারণে গোটা বিধানসভা কেন্দ্রেরই গত বুধবারের ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে থেকেই সংবাদের শিরোনামে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা। ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মা বনাম ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের মধ্যে ‘ঠান্ডা লড়াই’ শুরু হয়। ভোটের দিন ওই ফলতাতেই ইভিএম কারচুপির অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে পুনর্নির্বাচন চেয়ে আবেদনও যায় কমিশনের কাছে। কোন বুথে পুনর্নির্বাচন হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্ক্রুটিনি করে কমিশন। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাতে থেকেই বেশি বুথে পুনর্নির্বাচনের আবেদন জমা পড়েছিল। সেই তালিকায় ছিল ফলতাও। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নির্দেশে ফলতা, মগরাহাট, ডায়মন্ড হারবার-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় স্ক্রুটিনি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে যান কমিশন নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে পুনর্নির্বাচন সংক্রান্ত রিপোর্ট দিল্লিতে পাঠান সুব্রত। সূত্রের খবর, সেই রিপোর্টে বিশেষ করে উল্লেখ ছিল ফলতার নাম। কমিশনের কাছে পাঠানো প্রস্তাবে সুব্রত জানান, ফলতার প্রায় ৩০টি বুথে পুনর্নির্বাচন করানো হোক। কেন তিনি পুনর্নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন, তার ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে বলে খবর। সূত্রের খবর, ফলতায় পুনর্নির্বাচন সংক্রান্ত স্ক্রুটিনিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য ধরা পড়েছে। ফলতার একাধিক বুথে নাকি ক্যামেরাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল! নেটওয়ার্কের কারণে কন্ট্রোল রুমে সেই তথ্য আসেনি। তা ছাড়া বেশ কয়েকটি বুথে ইভিএমে টেপ লাগিয়ে বিভিন্ন দলের প্রতীক ঢেকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ভোটের দিন প্রিসাইডিং অফিসার দুপুর ১টায় জানান, টেপ তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তত ক্ষণে ওই বুথগুলিতে প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট পড়ে গিয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। ফলে ওই বুথগুলির ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাই এই বুথগুলিতে পুনর্নির্বাচনের প্রস্তাব দেওয়া হয় কমিশনকে। তার পরেই কমিশন নতুন করে আবার ফলতা বিধানসভায় ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল।
ভোটের পরেও বার বার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফলতা। শুক্রবার সূত্রপাত। দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়ায় ফলতায়। বিজেপি কর্মীদের উপর মারধরের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল ফলতার হাশিমনগর। শনিবারও ওই একই এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। হাশিমনগর এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ তথা বিজেপি কর্মীদের অভিযোগ, তাঁদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। তার প্রতিবাদ করায় তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের নেতৃত্বে কিছু লোকজন হামলা চালিয়েছেন। বিজেপির কর্মী এবং সমর্থকদের মারধর করা হয়েছে। শুক্র, শনিবার— দু’দিন জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধেরা। পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেন তাঁরা। একই সঙ্গে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান এবং তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ’ কয়েক জন নেতার গ্রেফতারির দাবিও উঠেছে। এ অবস্থায় হুমকি দেওয়া এবং ভয় দেখানোর অভিযোগে জাহাঙ্গিরের ‘ঘনিষ্ঠ’দের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের নির্দেশ দিল কমিশন। ইসরাফুল এবং অপর এক জাহাঙ্গির-ঘনিষ্ঠ সুজাদ্দিন শেখের নামোল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাঁদের সহযোগীদের বিরুদ্ধেও এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। স্থানীয় পুলিশকে ফলতার আইনশৃঙ্খলার উপর নজর রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ভোটগণনার জন্য অতিরিক্ত গণনা পর্যবেক্ষক (কাউন্টিং অবজ়ার্ভার) নিয়োগ করেছে নির্বাচন কমিশন। নিয়োগ করা হচ্ছে আরও পুলিশ পর্যবেক্ষকও। সব মিলিয়ে মোট ২৪২ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে কমিশন। কমিশন সূত্রে খবর, ওই পর্যবেক্ষকদের কাজ হবে গণনা প্রক্রিয়ায় সাহায্য করা। তা ছাড়া গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশ পর্যবেক্ষকদের নিয়োগ করা হচ্ছে।
রাজ্যের প্রতিটি গণনাকেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ফাঁক রাখতে নারাজ কমিশন। সেই কারণে প্রতি কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে। আপাতত পশ্চিমবঙ্গবাসীর রায় যন্ত্রবন্দি অবস্থায় রয়েছে স্ট্রংরুমে। সোমবার সেই স্ট্রংরুম থেকে ইভিএম, ভিভিপ্যাট নিয়ে আসা হবে গণনাকেন্দ্রে। তার পরেই ওই ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটের সিল এবং ট্যাগ ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। তার পরে প্রার্থী বা তাঁর এজেন্টদের সামনে গণনা-টেবিলে তা খোলা হবে। সাধারণত একটি গণনাকেন্দ্রে ১৪টি টেবিল থাকে। প্রত্যেক বার ১৪টি টেবিলে গণনা সম্পন্ন হলে এক রাউন্ড হয়। গণনা চলে কয়েক রাউন্ড ধরে। কোথাও কোথাও আবার ২০ রাউন্ডের বেশি গণনা হয়।
প্রত্যেক গণনাকেন্দ্রই ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা থাকবে। মূলত কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকবে গণনাকেন্দ্রগুলি। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছে রাজ্য পুলিশও। গণনার দিন কেন্দ্রগুলিতে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য ২০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগ করেছে কমিশন। প্রয়োজনে সেই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিটি স্ট্রংরুম পাহারা দেওয়ার জন্য ন্যূনতম ২৪ জন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে।
কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, বৈধ আইডি কার্ড ছাড়া গণনাকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না কেউই। ওই আইডি কার্ডে এ বার বিশেষ ব্যবস্থা করেছে কমিশন। প্রতিটি কার্ডে থাকছে কিউআর কোড। গণনাকক্ষে ঢোকার মুখে ওই কিউআর কোড স্ক্যান করে প্রত্যেককে ভিতরে ঢুকতে হবে। তবে তার আগে প্রত্যেকের আইডি কার্ড আরও দু’বার পরীক্ষা করবেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা। গণনার সময় গণনাকক্ষে শুধু থাকতে পারবেন রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, কাউন্টিং স্টাফ, টেকনিক্যাল স্টাফ, কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার, কমিশনের অনুমোদিত ব্যক্তি ও অবজ়ার্ভার, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, প্রার্থী বা তাঁদের এজেন্ট।
সোমবার যন্ত্রবন্দি মানুষের রায় গোনার কাজ শুরু হবে সকাল ৮টা থেকে। কখনও-সখনও কোনও কেন্দ্রের গণনা শেষ হতে রাতও পেরিয়ে যায়। গণনার শুরুতেই পোস্টাল ব্যালট গোনা হয়। তার পরে হয় ইভিএমের ভোটগণনা। কোথাও পোস্টাল ব্যালট না থাকলে সেখানে ইভিএম গণনা হবে। গণনা শুরুর চার ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ, দুপুর ১২টার মধ্যেই ভোটের ফলের প্রাথমিক ধারণা আসতে শুরু করে। অর্থাৎ ওই সময়ের মধ্যেই কয়েক রাউন্ডের গণনা শেষ হয়।