কলকাতার ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কে সরিয়ে দিল কমিশন। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আবার রাজ্য পুলিশে রদবদল করল নির্বাচন কমিশন। এক ধাক্কায় রাজ্যের ১২ জন পুলিশ সুপারকে বদল করা হল। সরানো হয়েছে কলকাতার ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কে। এ ছাড়া চার পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার, এডিজি পদমর্যাদার দু’জন কর্তাকেও সরিয়েছে কমিশন।
সোমবার রাজ্য পুলিশের ডিজি পীযূষ পাণ্ডেকে সরিয়ে দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। বদল করা হয়েছিল কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদেও। তার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না-কাটতেই নতুন করে রদবদল। কলকাতা পুলিশের ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরার জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হল ইয়েলওয়াড় শ্রীকান্ত জগন্নাথরাওকে।
এ ছাড়াও, রাজ্যের ১২ পুলিশ জেলার সুপারকেও পাল্টে দিল কমিশন। সেই তালিকায় রয়েছেন বীরভূম, ডায়মন্ড হারবার, পূর্ব মেদিনীপুর, কোচবিহার, মালদহ, পশ্চিম মেদিনীপুর, বারাসত, জঙ্গিপুর, মুর্শিদাবাদ, হুগলি (গ্রামীণ), ইসলামপুর, বসিরহাটের পুলিশ সুপারকে। বীরভূমের পুলিশ সুপার করা হয়েছে সূর্যপ্রতাপ যাদবকে। তিনি ২০১১ ব্যাচের আইপিএস। ওই জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন আমনদীপ। কোচবিহারের এসপি সন্দীপ কাররাকে সরিয়ে ওই জেলার দায়িত্ব দেওয়া হল জসপ্রীত সিংহকে। তিনি ২০১৬ ব্যাচের আইপিএস। বারাসত পুলিশ জেলার নতুন এসপি হলেন ২০১২ ব্যাচের আইপিএস মিস পুষ্পা। বারাসত পুলিশ জেলার এসপি ছিলেন প্রিয়ব্রত রায়। প্রিয়ব্রত এর আগে কলকাতা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) ছিলেন। আইপ্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি অভিযানের সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। ইডি তাঁর বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিল। তার পর ডিসি (দক্ষিণ) থেকে তাঁকে বারাসতে বদলি করা হয় মাসখানেক আগে। এ বার সেই বারাসত থেকেও তাঁকে সরিয়ে পুষ্পাকে দায়িত্ব দেওয়া হল। ডায়মন্ড হারবারের পুলিশ জেলার সুপারকেও বদলে দিল কমিশন। এই পদে ছিলেন বিশপ সরকার। তাঁর জায়গায় আনা হয়েছে চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি (সদর) ঈশানী পালকে।ইসলামপুর পুলিশ জেলার সুপার জোবি থমাসকে সরিয়ে দিয়েছে কমিশন। তাঁর জায়গায় আনা হয়েছে রাকেশ সিংহকে। তিনি ২০১৪ ব্যাচের আইপিএস।
মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার এসপি ধৃতিমান সরকারকেও সরিয়ে দিয়েছে কমিশন। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ২০১৩ ব্যাচের আইপিএস সচিনকে। বেলডাঙার অশান্তির পর সানি রাজকে এসপি পদ থেকে সরিয়ে ধৃতিমানকে আনা হয়েছিল। এ বার তাঁকে সরিয়ে দায়িত্বে আনা হল সচিনকে। সানি রাজকে সেই সময় এসবি-তে বদলি করা হয়। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন সেই সানিকে পাঠিয়েছে হুগলি (গ্রামীণ)-র পুলিশ সুপার করে। বসিরহাট পুলিশ জেলার সুপার আরিশ বিলালকেও সরিয়েছে কমিশন। তাঁর জায়গায় আনা হয়েছে অলকানন্দা ভাওয়ালকে। তিনি ২০১৭ ব্যাচের আইপিএস। মালদহের পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বদলি করা হয়েছে। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয় অনুপম সিংহকে। পূর্ব মেদিনীপুরের এসপি পারিজাত বিশ্বাসকেও সরিয়ে দিয়েছে কমিশন। দিন কয়েক আগেই তাঁকে ওই জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ বার পূর্ব মেদিনীপুরে নতুন পুলিশ সুপার করা হয়েছে অংশুমান সাহাকে। তিনি ২০১২ ব্যাচের আইপিএস। ছিলেন নারায়ণী সেনার ব্যাটালিয়নের দায়িত্বে।
এ ছাড়াও জঙ্গিপুর এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার এসপি-ও বদল করেছে কমিশন। পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পলাশ ঢালিকে সরিয়ে পাপিয়া সুলতানাকে দায়িত্ব দেওয়া হল। তিনি ২০১৫ ব্যাচের আইপিএস। ছিলেন ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি (এসবি)। জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার সুপার হোসেন মেহেদি রহমানকে সরিয়ে দায়িত্বে আনা হল সুরিন্দর সিংহকে। তিনি ২০১৬ ব্যাচের আইপিএস। মেহেদি এর আগে বসিরহাটের এসপি ছিলেন। কিছু দিন আগেই তাঁকে জঙ্গিপুরে নিয়ে আসা হয়।
পুলিশ সুপার ছাড়াও দুই জায়গার এডিজি-ও বদল করল কমিশন। দক্ষিণবঙ্গে নতুন এডিজি করা হল রাজেশকুমার সিংহকে। তিনি ১৯৯৭ ব্যাচের আইপিএস। এর আগে তিনি এডিজি (পলিসি)-র দায়িত্বে ছিলেন। রাজীব মিশ্রের জায়গায় রাজেশকে দক্ষিণবঙ্গের এডিজি পদে আনা হয়েছে। আর উত্তরবঙ্গের এডিজি পদে আনা হয়েছে কে জয়ারামনকে। তিনিও একই ব্যাচের আইপিএস অফিসার। তিনি ছিলেন রাজ্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর। সুকেশ জৈনের বদলে উত্তরবঙ্গের এডিজি করা হয়েছে জয়ারামনকে।
পাশাপাশি, চার কমিশনারেটের পুলিশ কমিশনার বদল করল নির্বাচন কমিশন। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের নতুন সিপি করা হল প্রণব কুমারকে। সেখানে সিপি ছিলেন সুনীল কুমার চৌধরি। হাওড়া পুলিশ কমিশনারেটের নতুন সিপি করা হয়েছে অখিলেশ চতুর্বেদীকে। সেখানে ছিলেন আকাশ মাঘারিয়া। ব্যারাকপুর এবং চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের নতুন সিপি হয়েছেন যথাক্রমে অমিতকুমার সিংহ এবং সুশীলকুমার যাদব। ব্যারাকপুরে ছিলেন প্রবীণ ত্রিপাঠী এবং চন্দননগরে ছিলেন কোটেশ্বর রাও।
প্রশাসন ও পুলিশ স্তরে বদলি নিয়ে ইতিমধ্যেই কমিশনের সঙ্গে নতুন সংঘাতে জড়িয়েছে রাজ্য সরকার। সোমবার রাতে এ বিষয়ে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠিও দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম কোনও আলোচনা না-করে বা কোনও মতামত না-নিয়ে বদলি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিককে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে কমিশনের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হোক এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক রীতি অনুসরণ করা হোক। জ্ঞানেশ চিঠি লেখার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ বদলির নির্দেশ দিল কমিশন।