ফাইল চিত্র।
বোধ হয় একেই বলে উলটপুরাণ!
যে রাজ্যে কোনও সরকারি হাসপাতালের বেড বা কেবিন পাওয়ার জন্য মানুষকে হাপিত্যেশ অপেক্ষায় থাকতে হয়, সেই ‘হীরক রাজার দেশে’ এ বার কোনও ‘রোগী’ ভর্তি হওয়ার আগেই তাঁর নামে ‘বুক্ড’ হয়ে গেল এসএসকেএমের মতো নামজাদা সরকারি হাসপাতালের একটি কেবিন। হাসপাতালের সেকেন্ড ফ্লোরের (তিন তলা) ২১ নম্বর কেবিন। হাসপাতালের সরকারি নথিপত্রও তৈরি হয়ে গেল মদন (গোপাল) মিত্রের নামে (এম জি মিত্র)! যেখানে তাঁর নামের পাশে লেখা রয়েছে ২২১ নম্বর।
তিনি আসবেন বলে!
ভোটটা যে তাঁকে যে ভাবেই হোক ‘কন্ট্রোল’ করতে হবে!
কিন্তু সেটা করবেন কে? আদত ‘কন্ট্রোলার’ তো বহু দিন ধরেই রয়েছেন গারদের গরাদের আড়ালে!
কিন্তু, আড়াল থেকে তাঁর ‘রিমোট কন্ট্রোল’-এর ‘কারিকুরি’টা যে এখন খুব জরুরি!
এসএসকেএম হাসপাতালের এই সেই নথি। নিজস্ব চিত্র।
তাই, গারদের বাইরেও যেমন গভীর দুশ্চিন্তা-উদ্বেগ, গারদের ভেতরেও তেমন কারও কারও চোখে গত তিন দিন, তিন রাত ‘ঘুম নেই’। এমনটাই বলছেন বিজেপি নেতারা।
হাজারো চেষ্টা করেও, তাঁর নাকি ‘চোখের দু’পাতা এক হচ্ছে না’! সঙ্গে শুরু হয়েছে তীব্র শ্বাসকষ্ট। বুকে ব্যথা। শুরু হয়ে গিয়েছে তাঁকে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড়। কেবিন সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখার নির্দেশ এসেছে। সেই মতো হাসপাতালের তিন তলার ২১ নম্বর কেবিন সাফ করে, ধুয়ে-মুছে রাখা হয়েছে। কেবিনে ‘রেডি’ রাখা রয়েছেন অক্সিজেন। তিনি আসবেন বলে!
‘ঘুমহীন দিন-রাতে’ ওই সব ‘অসম্ভব যন্ত্রণা আর শ্বাসকষ্ট’ এখন যাঁর হচ্ছে, যিনি ভুগছেন ‘তীব্র মানসিক অবসাদে’, তাঁর নাম- মদন মিত্র। কামারহাটি বিধানসভা আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিদায়ী বিধায়ক। রাজ্যের প্রাক্তন প্রভাবশালী মন্ত্রী।
যাঁর বিধানসভা আসনে ভোট হচ্ছে আগামী কাল, সোমবার।
শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথাটা দিন দু’য়েক হল বেশ বেড়ে গিয়েছে মদনবাবুর। বার বার হচ্ছে। ঘন ঘন হচ্ছে। কানাঘুযো শোনা যাচ্ছে, গত সপ্তাহেই মদনবাবুকে ভর্তি হতে বলা হয়েছিল হাসপাতালে। তিনি রাজি হননি। কিন্তু রবিবার সকাল থেকেই তাঁর শ্বাসকষ্ট আর বুকে ব্যথাটা খুব বেড়ে যায়। কাল রাত থেকেই জ্বর আসে। সকালে তাঁর গা পুড়ে যাচ্ছিল ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে। ফলে, মেডিক্যাল বোর্ড বসে তড়িঘড়ি। সেই বোর্ড তাঁকে আজই হাসপাতালে ভর্তি করানোর সুপারিশ করে। শোনা যাচ্ছে, মদনবাবু এখনও ‘যাচ্ছি, যাব’ করছেন।
জেল কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, মদনবাবু এর পরেও হাসপাতালে যেতে চাইছেন না। এসএমকেএমে নয়। জেলের হাসপাতালেও নয়। আজ সকালেও তাঁর চিকিৎসা চলেছে মন্দির ওয়ার্ডে, জেলের কুঠুরিতেই।
হচ্ছেটা কী?
নানা জনে নানা কথা বলছেন। কটাক্ষ করছেন। পাল্টা সহানুভূতিও যে ইটিউতি ভাসছে না, এমন নয়। বিজেপি নেতারা বলছেন, জেলে বসে থাকলে লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না মদনবাবু। তাঁর কামারহাটিতে ‘ভোট করানোর রিমোট কন্ট্রোল অপারেশন’কে সে ভাবে কার্যকরী করে তুলতে পারবেন না। হাসপাতালে গেলে যেটা অনেকটাই সম্ভব। আবার ভোটের আগে অসুস্থ হয়ে পড়ার আরও একটা ‘সুবিধা’ রয়েছে! মানুষের সহানুভূতি পাওয়া যাবে!
এই পরিস্থিতিতে অবশ্য মদনবাবুর জন্য ‘সহানুভুতি’ ফুটে উঠেছে তাঁর ঘনিষ্ঠ ‘কেষ্ট-বিষ্টু’দের চোখে-মুখে! যাঁদের ‘দাদা ছাড়া গতি নেই’! তাঁদের কথায়, ‘‘দাদার অসুস্থতা নিয়ে নোংরা রাজনীতি হচ্ছে। চাইলে, নির্বাচন কমিশন খোঁজখবর নিয়ে দেখুক, দাদা সত্যি-সত্যিই অসুস্থ কি না।’’
আরও পড়ুন- কিছু করুন, প্রধানমন্ত্রীর সামনে ভেঙে পড়লেন প্রধান বিচারপতি
মহম্মদ যেতে না চাইলে তো পাহাড়কেই আসতে হয় মহম্মদের কাছে!
তাই একটা অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে এসএসকেএম হাসপাতালের চেস্ট, মেডিসিন, কার্ডিওলজি আর এন্ডোক্রিনোলজির চার জন আরএমও গিয়েছেন আলিপুর জেলে মদনবাবুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। তাঁরা যেতে বললে, আজ রাতেই হয়তো এসএসকেএম হাসপাতালের তিন তলার ২১ নম্বর কেবিনটা হয়ে যেত মদনবাবুর অস্থায়ী ঠিকানা।
কিন্তু, ডাক্তাররা কেন, কে জানে, তা বললেন না! জানালেন, এখনই হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই মদনগোপালের। কাল দুপুরে কি আবার মত বদলাবেন ডাক্তাররা?
কে যে কাকে ‘কন্ট্রোল’ করেন!