West Bengal Election 2026

সংরক্ষিত আসনের বাইরেও তফসিলি জাতি, জনজাতির ১১ জনকে প্রার্থী করল তৃণমূল! তালিকায় ৪৭ জন সংখ্যালঘু

রাজ্যে মোট বিধানসভা কেন্দ্রের সংখ্যা ২৯৪। তফসিলি জাতির জন্য ৬৮টি, তফসিলি জনজাতির জন্য ১৬টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। চলতি বিধানসভা ভোটে তৃণমূল ২৯১টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯৫ জন তফসিলি জাতি এবং জনজাতির।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৬ ২১:৩০
Share:

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।

তফসিলি জাতি (এসসি) এবং তফসিলি জনজাতি (এসটি)-র জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে ৮৪। শাসকদল তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হতেই দেখা গেল, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতির ৯৫ জনকে প্রার্থী করেছে তারা। অর্থাৎ তৃণমূলের তরফে রাজ্যে সাধারণ আসনেও ১১ জন তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতির মানুষকে প্রার্থী করা হয়েছে। চলতি ভোটে রাজ্যের শাসকদলের কাছে তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি যে গুরুত্ব পেতে চলেছে, তার ইঙ্গিত কিছুটা মিলেছিল, যখন তৃণমূল চলতি মাসের শুরুতে ‘তফসিলি সংলাপ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে, যখন রাজ্যের পাঁচটি জনগোষ্ঠীর জন্য সাংস্কৃতিক ও উন্নয়ন বোর্ড গঠনের কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হতেই তার প্রতিফলন দেখা গেল। রাজ্যের ২৯১টি আসনে ৪৭ জন সংখ্যালঘু মানুষকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। অন্য দিকে, বিজেপির প্রথম দফার প্রার্থী তালিকায় স্থান পাননি এক জন সংখ্যালঘুও।

Advertisement

রাজ্যে মোট বিধানসভা কেন্দ্রের সংখ্যা হল ২৯৪। তার মধ্যে তফসিলি জাতির জন্য ৬৮টি এবং তফসিলি জনজাতির জন্য ১৬টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। চলতি বিধানসভা ভোটে তৃণমূল ২৯১টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। পাহাড়ের তিনটি আসনে প্রার্থী দিচ্ছেন অনীত থাপার দল ‘ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা’। সংরক্ষিত আসন ছাড়া অসংরক্ষিত আসনেও ১০ জন তফসিলি জাতি এবং এক জন তফসিলি জনজাতির প্রতিনিধিকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। কেন এমন করা হল?

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রাজ্যে যে ৮৪টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে, সেগুলি দীর্ঘ দিনই ছিল বামেদের দখলে। ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটের সময় থেকে এই আসনগুলিতে সমর্থন বাড়তে শুরু করে তৃণমূলের। তাদের টিকিটে সংসদে গিয়েছেন জগদীশচন্দ্র বাসুনিয়া, প্রকাশ চিক বরাইক, প্রতিমা মণ্ডল, বাপি হালদারেরা। রাজ্যে মন্ত্রী হয়েছেন বিরবাহা হাঁসদা। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে এই অংশে প্রভাব বাড়তে থাকে বিজেপির। ওই বছর লোকসভা নির্বাচন এবং ২০২১ তার প্রতিফলন দেখা যায়। ওই দুই ভোটে তফসিলি জাতি এবং তফসিলি জনজাতি অধ্যুষিত আসনগুলিতে ভাল ফলাফল করে বিজেপি। উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি পশ্চিমাঞ্চল এবং মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাতেও ধাক্কা খায় তৃণমূল। যদিও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তফসিলি অধ্যুষিত আসনগুলির মধ্যে কোচবিহার, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া আসন পুনরুদ্ধার করে তারা। সূত্রের খবর, এ বার সেই সংখ্যাই আরও বৃদ্ধি করতে চাইছে রাজ্যের শাসকদল। কিন্তু সেই চেষ্টার মাঝেই রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর রাজ্য সফর নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আর সেই ঘটনাকে হাতিয়ার করে প্রচারে নামে বিজেপি। তৃণমূলকে ‘আদিবাসী-বিরোধী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তার পরেই তৃণমূলের তরফে আদিবাসীদের জন্য কাজের খতিয়ান তুলে ধরা হয়।

Advertisement

মার্চের শুরুতে কলকাতার নজরুল মঞ্চে ‘তফসিলি সংলাপ’ কর্মসূচির সূচনা করে তৃণমূল। সেখানে উপস্থিত দলের তফিসিলি নেতাদের তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দেন, ভোটের আগে কী কাজ করতে হবে তাঁদের। সেই কর্মসূচি অনুসারে নীল-হলুদ গাড়িতে চেপে প্রচার করবেন ওই নেতারা। কেন নীল-হলুদ? সূত্রের খবর, নীল রঙের সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন সংবিধান প্রণেতা বিআর অম্বেডকর। আর হলুদ রাজবংশীদের রং, গোটা উত্তরবঙ্গে যাঁরা বিপুল সংখ্যায় রয়েছেন। একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রেও তাঁরা ভোটবাক্সের নিয়ন্ত্রক।

সূত্রের খবর, সেই রাজবংশীদের কাছে টানতে চাইছে তৃণমূল। তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় সেই সমীকরণ ধরা পড়েছে। কোচবিহারের মেখলিগঞ্জ, মাথাভাঙা, কোচবিহার উত্তর, কোচবিহার দক্ষিণ, শীতলকুচি, সিতাই, আলপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম, কালচিনি, ফালাকাটা, মাদারিহাট, জলপাইগুড়ির ধুপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, জলপাইগুড়ি, রাজগঞ্জ, মাল, নাগরাকাটা, দার্জিলিঙের মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহের বেশ কয়েকটি আসন তফসিলি জাতি ও জনজাতির জন্য সংরক্ষিত। সিতাইয়ে প্রার্থী করা হয়েছে জগদীশের স্ত্রী সঙ্গীতা রায় বাসুনিয়াকে। উত্তরবঙ্গের এই আসনগুলিতে গত বিধানসভা নির্বাচনে এগিয়ে ছিল বিজেপি। তৃণমূলের একটি সূত্র বলছে, এ বার সেগুলিতে প্রভাব বাড়াতে চাইছে তৃণমূল। আর সে জন্য ভোটের আগেই নীল-হলুদ গাড়িতে চেপে প্রচারের কর্মসূচি শুরু করেছে তারা।

হুগলির আরামবাগ মহকুমার আসনগুলিতেও থাকেন বহু সংখ্যক তফসিলি জাতি এবং তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে আরামবাগ, খানাকুল, গোঘাট, পুরশুড়া— চারটি আসনেই জিতেছিল বিজেপি। ওই আসনগুলির পাশাপাশি রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের জেলার মানুষ জনকেও কাছে টানতে চাইছে তৃণমূল, এমনটাই বলছে দলের একটি সূত্র। রাজ্যের পশ্চিমে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরে বাস করেন বহু সংখ্যক মুন্ডা, কোরা এবং ডোম জনগোষ্ঠীর মানুষ। মুন্ডা এবং কোরা জনগোষ্ঠীর মানুষ তফসিলি জনজাতিভুক্ত। ডোম জনগোষ্ঠীর মানুষ তফসিলি জাতিভুক্ত। ওই জনগোষ্ঠীর জন্য সাংস্কৃতিক এবং উন্নয়ন বোর্ড গঠনের ঘোষণা করেন মমতা।

তবে রাজ্যে শুধু সংরক্ষিত ৮৪টি আসন নয়, তা ছাড়াও বাকি প্রায় সব জায়গায় তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষজনের বাস রয়েছে। সূত্রের খবর, এ বার সেই অংশকেও ধরতে চাইছে তৃণমূল। আর সে কারণে সংরক্ষিত আসনের বাইরেও আরও ১১ জন তফসিলি জাতি, জনজাতির প্রতিনিধিকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল, এমনটাই মনে করছেন অনেকে।

তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা ৪৭। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, রাজ্যে মোট জনগণের ২৭ শতাংশ মুসলিম। পশ্চিমবঙ্গে ৭৫টি বিধানসভা আসনে প্রার্থীদের ভোটজয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন তাঁরা। মুর্শিদাবাদ, মালদহ জেলার কিছু আসনে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁরা নির্ণায়কের ভূমিকা নেন। রাজ্যের আরও প্রায় ৫০টি আসনে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সূত্রের খবর, এই সমীকরণ মাথায় রেখেই ৪৭ জন সংখ্যালঘুকে টিকিট দিয়েছে তৃণমূল, যেখানে, বিজেপির প্রথম দফার প্রার্থী তালিকায় এক জনও সংখ্যালঘু নেই। তৃণমূলের একটি সূত্র বলছে, প্রচারে এই বিষয়টিকেও হাতিয়ার করতে পারে তারা। আর তা করেই সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক অনেকটাই নিশ্চিত করতে চায় তৃণমূল, এমনটাই বলছে তথ্যাভিজ্ঞ মহল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement