বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল পেশ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। বিরোধীদের অভিযোগ, মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিলকে শিখণ্ডী করে আসলে লোকসভার আসন বাড়াতে সক্রিয় হয়েছে বিজেপি। জনগণনার আগেই সুবিধামতো আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রভাব খর্ব করে উত্তর ভারতের আসনের অনুপাত বাড়িয়ে নেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ। দক্ষিণের চেয়ে উত্তর ভারতে বিজেপির প্রভাব বেশি। তাই এ ক্ষেত্রে তাদের সুবিধা হবে। গত কয়েক দিন ধরেই কেন্দ্রের এই বিল নিয়ে বিতর্ক চলছে। মমতা দমদমের সভা থেকে জানান, মহিলা সংরক্ষণ বিল তাঁরা সমর্থন করবেন। কিন্তু তার সঙ্গে অন্য কোনও বিল আনা হলে সমর্থন করা হবে না।
বস্তুত, সংসদে তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনে তিনটি বিল পাশ করাতে চাইছে কেন্দ্র। প্রথমটি লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল। লোকসভার সাংসদ সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার বিষয়টি এরই অন্তর্গত এবং তা নিয়েই এত বিতর্ক। দ্বিতীয়টি লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বিল এবং তৃতীয়টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল। মমতা বলেন, ‘‘ডিলিমিটেশন বিল আর মহিলাদের সংরক্ষণ বিল একসঙ্গে নিয়ে আসতে চাইছে। মহিলাদের এত অসম্মান কোরো। আমাদের এখানে পুরসভা, পঞ্চায়েতে ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ রয়েছে। আমাদের ৩৭ শতাংশ মহিলা লোকসভায় নির্বাচিত। মহিলা বিল আমরা সমর্থন করব। কিন্তু তার সঙ্গে অন্য কিছু আনতে যেয়ো না। ডিলিমিটেশনকে সমর্থন নয়। দেশটাকে আপনারা টুকরো টুকরো করতে চাইছেন। বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই ডিলিমিটেশন আমরা মানি না।’’
মমতা বলেন, ‘‘কাউন্সিলরেরা সাবধান। যে কোনও সময় হানা দিতে পারে। মাথা নত করবেন না। লড়ে যেতে হবে।’’
মমতা বলেন, ‘‘সব এজেন্সিকে আমার অনুরোধ, একতরফা ভাবে একটা দলের জন্য কাজ করবেন না। দেশের জন্য কাজ করুন। আপনাদের সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই।’’
মমতা বলেন, ‘‘আমরা শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে। কিন্তু অত্যাচার হলে দুরন্ত খেলা খেলতে জারি। দুরন্ত খেলা হবে। বাংলা জয় করে দিল্লিকে জয় করব, কথা দিলাম। আমি চেয়ার চাই না। কিন্তু মানুষের উপর যে অত্যাচার করা হয়েছে, আমি রাজনৈতিক ভাবে তার বদলা নেবই নেব।’’
মমতা বলেন, ‘‘অনুপ্রবেশ রোখার দায়িত্ব কেন্দ্রের। এটা আমার হাতে নেই। সীমান্ত তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হাতে। বাইরে থেকে যারা আসে, আগে সে বিষয়ে রাজ্যকে জানানো হত। এখন তা-ও হয় না। নিজের দোষ ঢাকতে আমাদের বলা হচ্ছে।’’
বিজেপি জোর করে বাংলা দখলের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন মমতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ রাজ্যের মনীষীদের নাম উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, তা সম্ভব নয়।
মহিলা বিল সমর্থন করবেন বলে জানালেন মমতা। তবে তার সঙ্গে ডিলিমিটেশন বিলকে তৃণমূল সমর্থন করবে না। মমতার হুঁশিয়ারি, ‘‘মহিলা বিলের সঙ্গে অন্য কিছু আনতে যেয়ো না। আমরা তা হতে দেব না।’’
মমতা বলেন, ‘‘আমি তো ছাতু খাই, লিট্টি খাই, ঠেকুয়া খাই। ধোকলা, ধোসাও খাই। খারাপ তো লাগে না! আমার তো জাত যায় না। জাতের নামে বজ্জাতি? গণতন্ত্রে বদলা হবে। জিতবে আবার বাংলা।’’
ভোটের আগে তল্লাশি অভিযানের অভিযোগ তুলেছেন মমতা। বলেন, ‘‘মহিলারা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, ওরা ব্যাগ খুলে দেখছে! আমি ভাবি, কী খুঁজছে? লিপস্টিক খুঁজছে? কোন দিন ব্যাগে কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে ধরে নিয়ে যেতে পারে! খুব সাবধান।’’
বিজেপির ইস্তাহারকে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, ‘‘তৃণমূলকে চার্জশিট দিচ্ছে। চার্জশিট তো ওঁদের দেওয়া উচিত। কেন অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে না?’’
মমতা বলেন, ‘‘নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব। এটা তো অত্যাচারের উৎসব চলছে।’’
বিজেপিকে আক্রমণ করে মমতা বলেন, ‘‘কাল যখন ক্ষমতায় থাকবে না, এই হানাগুলো যখন তোমাদের বাড়িতে হবে, তখন সামলে নিও।’’
বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির অপব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘এজেন্সির অপব্যবহার করছে কেন্দ্রীয় সরকার। আমি সাত বার সাংসদ হয়েছি। এমন জীবনে কখনও দেখিনি। ভোটের আগে মানুষের নাম কেটেছে। কোনও ধর্ম-বর্ণ না দেখে আমি সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলাম। অন্য কোনও রাজ্যে যা হয়নি, এখানে তা হয়েছে। শুধু বাংলার ক্ষেত্রে তথ্যগত অসঙ্গতি দেখিয়ে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন এজেন্সিকে দিয়ে হেনস্থা করছে।’’
মমতা বলেন, ‘‘সে দিন দমদমে আমার গাড়ির সামনে গটগট করে চলে এসেছিলেন জওয়ানেরা। আমি বললাম, এসো এসো, কী তল্লাশি করার করো। আমার কোনও অসুবিধা নেই।’’
বিজেপির উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‘নোটবন্দি করে কালো টাকা বন্ধ করবেন বলেছিলেন। করতে পেরেছেন? না আরও কালো টাকা দেশে নিয়ে এসেছেন?’’
মমতা বলেন, ‘‘সিআইএসএফ, বিএসএফ-কে কত শ্রদ্ধা করতাম। স্যালুট করতাম। সকলকে বলে দিয়েছে বিজেপি করতে হবে।’’
মমতা বলেন, ‘‘প্রচার আটকানোর জন্য ঘরে নজরবন্দি করে রাখা হচ্ছে। দেবাশিস রাসবিহারীর বিধায়ক। ওঁর মেয়ের সঙ্গে উত্তম কুমারের ছেলের বিয়ে হয়েছে। তাঁর বাড়ি, তাঁর অফিসেও হানা দিয়েছে! ব্যক্তিগত কিছু থাকলে ভোটের পরে করতে পারত!’’
তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস কুমারের বা়ড়িতে আয়কর হানা নিয়ে সরব মমতা। বলেন, ‘‘তৃণমূলের প্রার্থীর বাড়িকে আয়কর হানা। প্রার্থী প্রচার করবেন কখন? এখন আটকে রাখা মানে তাঁর একটা গোটা দিন নষ্ট। ইডি, সিবিআই, আইটি সবাই তল্লাশি চালাচ্ছে। বিজেপির সরাসরি লড়াইয়ের হিম্মত নেই? ভোটে লড়া তো সাংবিধানিক অধিকার। আটকে রেখে তার অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। আমি আইনি পদক্ষেপ করব যতটা সম্ভব।’’