নরেন্দ্র মোদী। —ফাইল চিত্র।
‘‘অনুপ্রবেশকারীকে খুঁজে বার করা হবে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গকে আবার বৈভবশালী রাজ্য করবে। তাই আমাদের প্রার্থীদের এখানে হাজির করেছি। বামেদের ৩৫ বছর দিয়েছেন, তৃণমূলকে ১৫, ৫ বছর মোদীকে দিয়ে দেখুন।’’
‘‘ডবল ইঞ্জিন সরকার যেখানে, সেখানেই উন্নয়ন। বাড়ি পর্যন্ত পানীয় জল যায়, সে জন্য দিল্লি থেকে টাকা এসেছে। কিন্তু তার মাঝেও টিএমসি ঢুকে পড়েছে। আপনারা বিজেপিকে আনুন। মোদী কি গ্যারান্টি। বাড়ি বাড়ি পানীয় জল পৌঁছোবে।’’
‘‘বাংলার রাজবংশী সমাজ, সাঁওতাল সমাজের ভূমিকা রয়েছে ভারতের উন্নতিতে। অনেক নায়ক রয়েছেন। তাঁদের জন্য আমরা গর্বিত। আমাদের নিরন্তর প্রয়াস, আদিবাসী সমাজের দ্রুত উন্নয়ন হোক। আগে মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় ছিলেন আদিবাসীরা। আমাদের সরকার মাওবাদী-মুক্ত সমাজ দিয়েছে। বন্দুক নামিয়ে ছেলে মায়ের কাছে ফিরেছেন। আমাদের মন্ত্রিসভায় আদিবাসী রয়েছেন। ওড়িশায় আমাদের মুখ্যমন্ত্রী আদিবাসী মুখ, ঝাড়খণ্ডেও তা-ই। এটাই আমাদের ট্র্যাক রেকর্ড। কিন্তু তৃণমূল সাঁওতাল সমাজকে অপমান করে। রাষ্ট্রপতি মুর্মু এসেছিলেন কিছু দিন আগে। তৃণমূল সংবিধানের মর্যাদা দেয়নি। আদিবাসী সমাজকে অপমান করেছে। তৃণমূলকে সবক শেখানো দরকার। তৃণমূল কখনও আদিবাসী উন্নয়নের শরিক হয়নি।’’
‘‘দিনাজপুরের বিশ্ববিদ্যালয় তৃণমূলের দুর্নীতির বড় জায়গা। খবরকাগজে পড়েছি, এদের নিজের ক্যাম্পাস নেই। কলেজে বিশ্ববিদ্যালয় চলছে। স্থায়ী শিক্ষক নেই। অস্থায়ী শিক্ষকেরা দৈনিক ৪০০-৫০০ টাকা পান। এই ভাবে যুব সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে তৃণমূল। পড়ার সুযোগ নেই রাজ্যে। কাজের জন্যও বাইরে যেতে হয়। পড়াশোনা করে চাকরি করতে গেলে মন্ত্রীই চাকরি লুট করেন। দেখেছেন, মন্ত্রীর বাড়িতে টাকার পাহাড় উদ্ধার। এনাফ ইজ় এনাফ। আর নয়। এই অবস্থা বদলানোর জন্য বিজেপিকে সরকারে আনুন।’’
‘‘মহিলা কল্যাণ আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে। তাঁদের সুরক্ষা, তাঁদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সচেষ্ট হব। এখানে মহিলারা যে ভাতা পান, তার ডবল দেব আমরা। সরকারি চাকরিতে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ পাবেন মহিলারা।’’
‘‘তৃণমূল ফুটবলকেও সিন্ডিকেটের কাছে দিয়ে দিয়েছে। মহাজঙ্গলরাজের দিশা দিয়েছে। আরও এক ঐতিহাসিক ছবি দেখেছি। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল জেতার জন্য লড়ে। কিন্তু যখন আরজি করে এক চিকিৎসককে খুন করা হয়েছিল, তখন সকলে রাস্তায় নেমেছিলেন। দুই ফুটবল ক্লাবও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ ভাবে আমাদের সবাইকে তৃণমূল সরকারকে সবক শেখাতে হবে। দিনাজপুরেও গত কয়েক বছরে মহিলাদের সঙ্গে অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমাদের সে সব ভুললে চলবে না। মেয়েদের জন্য মোদীর গ্যারান্টি— সমস্ত ধর্ষণের মামলার ফাইল খুলব। খুঁজে খুঁজে হিসাব নেব। কী ভাবে হবে, সেটা ঘোষণাপত্রে বলে দিয়েছে বিজেপি।’’
মোদীর কথায়, ‘‘গতকালই ঘোষণাপত্র দিয়েছে বিজেপি। এখানে মোদী কি গ্যারান্টি রয়েছে। বিজেপি সরকার ভয়কে খতম করে ভরসা জোগাবে। আইনের শাসনের উপর মানুষের আস্থা ফিরবে। আমরা তৃণমূলের ১৫ বছরের দুর্নীতি, দাঙ্গা, ধর্ষণ, খুনের মতো অত্যাচার সামনে আনার জন্য প্রমাণ দেব। পীড়িতদের ন্যায়বিচারের জন্য সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করা হবে।’’
মোদী স্লোগান তোলেন, ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার’। তিনি বলেন, ‘‘এই তৃণমূলের মা-মাটি-মানুষের জন্য কত মিথ্যা বলে ভোটে জিতে ক্ষমতায় বসেছে। এখন দিনরাত আমাদের গালি দেন। মিথ্যা অভিযোগ করেন। ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে কী করেছেন, মানুষকে বলুন না? গত ১৫ বছরে যখন কিচ্ছু করেনি, আরও ৫ বছরে কী করবে? কী উন্নয়ন হয়েছে? এরা ১৫ বছরের কথা বলে না। কারণ, দুর্নীতি, মিথ্যার সব তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে। একটাই মডেল গড়ে তুলেছে ১৫ বছরে। এখানে সিন্ডিকেটই সরকার, সরকারই সিন্ডিকেট। বাংলা ছাড়া কোথাও তৃণমূল নেই। অসম, ত্রিপুরা, গোয়ায় কেউ এদের ভোট দেয় না। কারণ, সেখানে ওদের গুন্ডামি চলে না। এরা একটি জায়গায় পিএইচডি করেছে। গুন্ডামি। ভয় দেখিয়ে ভোট লুট করার।’’
খাগড়াকুড়ির ময়দানের মঞ্চে প্রার্থীদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করে মোদী ‘জয় মা কালী’, ‘জয় বাবা ভোলানাথ’ বলে ভাষণ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘‘দক্ষিণ দিনাজপুরের পুণ্যভূমিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রণাম জানাচ্ছি। সবার আগে সকলের কাছে ক্ষমা চাইছি। কারণ, সভার যে প্ল্যানিং করা হয়েছে, যে প্যান্ডেল করা হয়েছে, তা খুব ছোট হয়ে গিয়েছে। যত জন ভিতরে আছেন, তার তিন গুণ বাইরে আছেন। তাঁদের কাছে ক্ষমা চাইছি। তবে সকলকে আশ্বস্ত করছি, এই পরিশ্রমকে বেকার হতে দেব না। এই ভালবাসা ১০০ গুণ করে ফেরত দেব। উন্নয়নের মাধ্যমে ফেরত দেব।’’
কুশমুন্ডিতে পৌঁছে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁকে বরণ করে নেন বালুরঘাটের সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। তিনি জানান, সংকল্পপত্রে যা বলা হয়েছে, সেখান থেকে পরিষ্কার, এর আগে কোনও প্রধানমন্ত্রী উত্তরবঙ্গের জন্য এত কিছু ভাবেননি।
জঙ্গিপুরের সভা থেকে তৃণমূলের পাশাপাশি বামেদেরও কটাক্ষ করেছেন মোদী। তিনি বলেছেন, ‘‘বাংলার মানুষ বামেদের সরিয়েছিল। অনেক আশা নিয়ে মা-মাটি-মানুষের কথা শুনে তৃণমূলকে সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল তো বামেদের কার্বন কপি হয়ে গিয়েছে। সব গুন্ডা তৃণমূলে চলে এসেছে। বামেদের সব দুর্নীতি তৃণমূল নিয়ে নিয়েছে। এখন তারা আবার জয়ের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু ওরা ভুলে যাচ্ছে, এটা নেতাজির মতো বীরের ভূমি। তৃণমূলের ভয়ের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছে বিজেপির ভরসা। তাই এ বার তৃণমূলকে বার বার বাংলা বলছে, এই সব চলবে না।’’
কাটোয়ার জনসভা থেকে ১৫ জন দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে জনসভা করেন নরেন্দ্র মোদী। সভার শুরুতে সর্বমঙ্গলা ও ১০৮ শিবমন্দিরকে প্রণাম জানিয়ে বাংলায় ভাষণ শুরু করেন তিনি। বলেন, “আপনাদের ভালবাসায় আমি আপ্লুত। প্রত্যেক বারই আপনারা ভিড়ের রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছেন। এটা শুধু ট্রেলার।” রাজ্যের শাসকদলকে নিশানা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘তৃণমূল নেতাদের দুর্নীতির হিসাব নেব। তৃণমূলের ১৫ বছরের নির্মম শাসনের হিসাব হবে। এই জনজোয়ার বাংলায় পরিবর্তনের জন্য তৈরি।’’ তিনি স্লোগান তোলেন, ‘‘ভয় আউট, ভরসা ইন, বিজেপিকে ভোট দিন।’’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একই দিনে তিন সভা পশ্চিমবঙ্গে। পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ায় একটি সভা করেছেন। তার পর জনসভা করেন মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে। নবদ্বীপ, জঙ্গিপুর, মুর্শিদাবাদ এবং বহরমপুরের প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করেন। তৃতীয় সভাটি কুশমুন্ডিতে। মালদহ, উত্তর এবং দিনাজপুরের বিজেপি প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করছেন প্রধানমন্ত্রী।