Aspiring Agriculture Minister

কাঁধে লাঙল, ২২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিজেপি অফিসে টিকিটপ্রার্থী! বললেন, ‘নির্বাচনে জিতে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী হতে চাই’

একই আধারে বিজেপি, কংগ্রেস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, প্যান্ট-শার্ট, গামছা, চপ্পল, লাঙল, মলিনতা এবং মন্ত্রিত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে দৃশ্যমান! হ্যাঁ, মন্ত্রিত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়েই বাঁকুড়া জেলার গঙ্গাজলঘাটি থেকে তিনি কলকাতায় হাজির হয়েছেন।

Advertisement

ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ ১৯:৪৬
Share:

শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করার জন্য বিজেপি দফতরের সামনে লাঙল কাঁধে নিয়ে অপেক্ষায় কৃষিমন্ত্রী হতে ইচ্ছুক আলোককুমার সিংহ। —নিজস্ব চিত্র।

মলিন পায়ে প্লাস্টিকের চপ্পল। পরনে গাঢ় নীল রঙের পাতলুন আর লাল-নীল-সাদা চেক জামা। গলায় বাঁকুড়ার গামছা। কাঁধে লাঙল। বিধাননগরে বিজেপির দফতরের গাড়িবারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। ভারী লাঙলটা সারাক্ষণ বইতে পারছেন না বলে মাঝেমধ্যে নামিয়ে রাখছেন বাঁশ কেটে তৈরি করা একটা স্ট্যান্ডের উপরে। সেটাও নিজেই বানিয়ে এনেছেন। আর লাঙলের লম্বা হাতল থেকে ঝুলছে গোটা দুয়েক প্ল্যাকার্ড। কোনওটিতে কংগ্রেসের প্রবাদপ্রতিম নেতা তথা দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর প্রিয় স্লোগান লেখা। কোনওটিতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি। আর সে সবের নীচেই লিখে রাখা তাঁর নিজস্ব ইচ্ছার কথা। যার জন্য সওয়া দু’শো কিলোমিটার পেরিয়ে ছুটে এসেছেন কলকাতা তথা বিধাননগরে।

Advertisement

বর্ণনা শুনে হাঁসজারু বা বকচ্ছপের কথা কারও কারও মনে আসতে পারে। কারণ একই আধারে বিজেপি, কংগ্রেস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, প্যান্ট-শার্ট, গামছা, চপ্পল, লাঙল, মলিনতা এবং মন্ত্রিত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে দৃশ্যমান! হ্যাঁ, মন্ত্রিত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তথা দাবি নিয়েই বাঁকুড়া জেলার গঙ্গাজলঘাটি থেকে আলোককুমার সিংহ বিজেপির রাজ্য দফতরে এসে পৌঁছেছেন। নিজের গ্রাম বড়জুড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন বুধবার সাতসকালে। প্রথমে দুর্গাপুর। সেখান থেকে ট্রেন ধরে কলকাতা। তার পরে পথনির্দেশ জোগাড় করে বিধাননগরের বিজেপি দফতর। পুরোটাই ওই লাঙল কাঁধে নিয়ে। যে লাঙলে ঝুলন্ত প্ল্যাকার্ডে লেখা রয়েছে, ‘ক্ষুধার্ত, বুভুক্ষু মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে কৃষিমন্ত্রী হতে চাই’। লেখা রয়েছে ‘জয় জওয়ান, জয় কৃষাণ’ (লালবাহাদুর বলতেন জয় জওয়ান, জয় কিসান)।

বিজেপি দফতরে পৌঁছে আলোক দেখা করতে চান রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে। কিন্তু সংসদের অধিবেশন এবং বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে যোগ দিতে বুধবার সকালেই শমীক দিল্লি চলে গিয়েছেন। ফলে দেখা হওয়ার উপায় নেই। আলোক তবু হাল ছাড়েননি। দিনভর পায়চারি করে বেড়িয়েছেন বিজেপি দফতর চত্বরে। কখনও গাড়িবারান্দায়, কখনও সামনের রাস্তায়। আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে কথোপকথনে বললেন, ‘‘২৮ বছর ধরে বিজেপি করছি। মানে ১৯৯৮ সাল থেকে। সে বার পাশাপাশি দু’টো পঞ্চায়েতে দায়িত্ব নিয়ে দলকে জিতিয়েছিলাম।’’ তাঁর মুখের কথায় অনেকে বিশ্বাস না-রাখতেও পারেন বুঝে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন ১৯৯৮ সালের একগুচ্ছ নির্বাচনী নথি, দলীয় চাঁদার বিলবই ইত্যাদি। সময়ের ছাপে সে সব কাগজ লালচে ও ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে, অক্ষর আবছা হয়েছে। সন্তর্পণে ভাঁজ খুলে খুলে নথিগুলি মেলে ধরছেন আলোক। বলছেন, ‘‘২০২৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে আমার ভাইয়ের বউকেও বিজেপির টিকিটে দাঁড় করিয়েছিলাম। ভোটের পরে বাড়িছাড়া হতে হয়েছিল। তবু দল ছাড়িনি।’’

Advertisement

বছর ৫৭-র আলোক পেশায় চাষি। বিঘেচারেক জমি রয়েছে। কিন্তু সেচের সুবন্দোবস্ত না-থাকলে বাঁকুড়ার রুখা মাটিতে বছরভর চাষ হয় না। আলোকদের বড়জুড়ি গ্রামে সেচের বন্দোবস্ত নেই। বলছেন, ‘‘বছরে একটা চাষ করতে পারি। বর্ষাকালে। শুধু ধানই হয়। আর কিছু হয় না।’’ আলোকের বাড়িতে মা রয়েছেন। ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী এবং ভাইপো রয়েছেন। ভাই নির্মাণ শ্রমিক। পরিবারে প্রাচুর্য যে নেই, সে কথা আলাদা করে বলে দিতে হয় না। তবু আলোকের চিন্তাভাবনা শুধু আত্মকেন্দ্রিক বা পরিবারকেন্দ্রিক নয়। পশ্চিমবঙ্গে চাষ-আবাদের খোলনলচে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন আলোক। চাষির জীবনের হাল ফেরানোর পরিকল্পনাও তৈরি করতে থাকেন আপন মনেই।

বিধানসভা নির্বাচন শিয়রে। তাঁর দলের নেতৃত্ব যে এখন প্রার্থী বাছাই নিয়ে প্রায় শেষ পর্যায়ের আলোচনা চালাচ্ছেন, সে কথা আলোক জানেন। তাই সরাসরি দলীয় কার্যালয়ে হাজির হয়েছেন। রাজ্য সভাপতির সঙ্গে দেখা করে বিধানসভা নির্বাচনের টিকিট চাইতে এসেছেন। আলোক ভোটে লড়তে চান। বিধায়ক হয়ে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী হতে চান।

বুধবার দীর্ঘক্ষণ আলোককে দলীয় দফতরের সামনে অপেক্ষা করতে দেখে বিজেপির তরফ থেকে কয়েকজন তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। রাজ্য সভাপতির সঙ্গে যে এখন দেখা হওয়া সম্ভব নয়, সে কথা বুঝিয়ে বলা হয়। তাঁর আর্জি একটি চিঠিতে লিখে রেখে যেতে বলা হয়। আলোক অবশেষে একটি চিঠি লিখে জমা দেন রাজ্য বিজেপির সমাজমাধ্যম সেলের প্রধান সপ্তর্ষি চৌধুরীর হাতে। তবে রাজ্য সভাপতিকে সরাসরি নিজের কথাগুলো বুঝিয়ে বলতে না-পারলে টিকিট পাওয়া বা কৃষিমন্ত্রী হওয়া হয়ে উঠবে কি না, নিশ্চিত হতে পারেননি আলোক।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement