ঘরে-বাইরে লড়াই সামলে জিততে মরিয়া ‘বড়ভাই’-ঘরনি

বাইরে জোট বেঁধেছে কংগ্রেস-সিপিএম। তারা খড়্গহস্ত অনুন্নয়ন আর দুর্নীতি নিয়ে। আর অন্দরে তো দলের সংসারে ঠোকাঠুকি লেগেই রয়েছে। তবে এ সবকে পাশ কাটিয়েই দ্বিতীয় বারের জন্য বিধায়ক হওয়ার রাস্তা খুঁজতে ব্যস্ত ‘মেজদি’।

Advertisement

প্রকাশ পাল

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০১৬ ০৩:৪৯
Share:

লড়াইটা ঘরে-বাইরে।

Advertisement

বাইরে জোট বেঁধেছে কংগ্রেস-সিপিএম। তারা খড়্গহস্ত অনুন্নয়ন আর দুর্নীতি নিয়ে। আর অন্দরে তো দলের সংসারে ঠোকাঠুকি লেগেই রয়েছে। তবে এ সবকে পাশ কাটিয়েই দ্বিতীয় বারের জন্য বিধায়ক হওয়ার রাস্তা খুঁজতে ব্যস্ত ‘মেজদি’।

বিরোধীদের দাবি, গত পাঁচ বছরে বিধায়ক এমন কিছু করেননি, যা মনে রাখবেন চণ্ডীতলার মানুষ। তাঁদের কটাক্ষ, মুখ্যমন্ত্রী ‘কলকাতাকে লন্ডন বানাব’ বললেও যেমন কলকাতার কোনও উন্নয়ন হয়নি, তেমনই অবস্থা চণ্ডীতলারও। তারপরেও ‘মেজদি’ তথা চণ্ডীতলা বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী স্বাতী খোন্দকার উন্নয়নকেই হাতিয়ার করেছেন।

Advertisement

চণ্ডীতলা ১-এর ৫টি এবং চণ্ডীতলা ২ ব্লকের ৬টি পঞ্চায়েত নিয়ে গোটা বিধানসভা কেন্দ্র। ঘটনা হচ্ছে, ২০১১-র বিধানসভা ভোটের পর থেকে চণ্ডীতলায় সিপিএমের শক্তি বেড়েছে। মজবুত হয়েছে সংগঠন। গত বার তৃণমূল এবং কংগ্রেসের জোট পেয়েছিল ৮৬,৩৯৪টি ভোট। সিপিএম ৫৮,১৫৭ ভোট পায়। ২০১৪ সালের লোকসভায় তৃণমূল ৭৪,১৮৭ ভোট পায়। সিপিএমের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫৮,১৫৭। কংগ্রেস ১০,৮৩৪ ভোট পায়। বিজেপি পেয়েছিল ২৭,৩৮০টি ভোট। মাঝে ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটে চণ্ডীতলায় তৃণমূলের ফলে দল খুশি নয়। ১১টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ৩টি একক ভাবে সিপিএমের দখলে। বাকি ৮টির দখল তৃণমূলের। যদিও এর মধ্যে চারটি পঞ্চায়েতেই কংগ্রেসের সমর্থন নিতে হয়েছে শাসক দলকে।

অন্যদিকে প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক ভক্তরাম পান স্বয়ং অনুজ কমরেড প্রার্থী মহম্মদ শেখ আজিম আলির জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছেন। প্রাথমিক শিক্ষক আজিম বলছেন, ‘‘তৃণমূল শুধুই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বিলিয়েছে। চণ্ডীতলায় কাজের কাজ কিছুই করেনি। যে টুকু কাজ হয়েছে, তাতেও লুঠ হয়েছে। নেতারা ফুলেফেঁপে কলাগাছ হয়েছে। সব কিছুর জবাব ভোটের বাক্সেই মানুষ দেবেন।’’ পাঁচ বছর আগে মমতা হাওয়ায় স্বাতীদেবীর কাছে হারলেও থেমে থাকেননি আজিম। চালিয়ে গিয়েছেন জনসংযোগ। যা তাঁর বাড়তি সুবিধা।

অনুন্নয়নের প্রশ্নে চাঁচাছোলা বিজেপি প্রার্থী সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ও। কেন্দ্রের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত কখনও সাইকেলে, কখনও হেঁটে বেড়াচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘‘সিপিএম আমলে দুর্নীতি আর অনুন্ন‌য়ন দেখেছে চণ্ডীতলা। তৃণমূল আসার পর সঙ্গে যোগ হয়েছে সিন্ডিকেটরাজ। বহু গরিব মানুষ সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাননি। মাঝে শাসক দলের নেতারা শুধু টাকা কামিয়েছেন।’’ উন্নয়ন নিয়ে কটাক্ষ করে তাঁর প্রশ্ন, ‘‘উন্নয়ন হলে চিকিৎসার জন্য কেন চণ্ডীতলা হাসপাতালের উপর ভরসা করতে পারেন না গ্রামবাসী? আইটিআই কোথায় গেল? শিল্পায়নের কি হল?’’ ডানকুনির লিচুবাগানের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বিজেপি প্রার্থী বলতে থাকেন, ‘‘ডানকুনি খাল, সরস্বতী নদী সংস্কার করবে বলেছিল শাসক দ‌ল। কোথায় কী!’’

‘‘বুঝলেন, স্রেফ কুৎসা। কে বলল, আমরা উন্নয়ন করিনি? ডানকুনি উড়ালপুল কে করল!’’ বিরোধীদের উন্নয়ন নিয়ে অভিযোগকে ছক্কা মেরে মাঠের বাইরে পাঠালেন মেজদি। নাগাড়ে বলতে থাকেন, ‘‘কৃষ্ণরামপুর, নৈটি, গরলগাছা, চণ্ডীতলা সব জায়গায় ঘরে ঘরে পানীয় জল পৌঁছে দিয়েছি। ডানকুনিতে দমকল ভবন হয়েছে। কালীপুরে বৈদ্যতিক চুল্লি হয়েছে। গ্রামীণ হাসপাতালে সিজারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাস্তাঘাটও কম হয়নি।’’

তাঁর প্রার্থী হওয়া নিয়ে স্থানীয় তৃণমূলের অন্দরে কোন্দল কম হয়নি। যা শাসক দলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিধায়কের সঙ্গে দলের বহু নেতার মতবিরোধে একাংশ চেয়েছিলেন জেলায় অন্যতম সাধারণ সুবীর মুখোপাধ্যায় প্রার্থী হোন। এ নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভও হয়। যার জেরে সবাই জোরকদমে প্রচারে নামেননি বলে তৃণমূল শিবিরেই খবর। মেজদির অবশ্য প্রতিক্রিয়া, ‘‘ও সব বাজে কথা। দলের সবাই একজোট হয়ে কাজ করছি। জেতা নিয়ে আমার কোনও সংশয় নেই।’’

তবে ভোট বৈতরণী পার হতে শুধু উন্নয়ন নয়, তৃণমূলকে ভরসা রাখতে হচ্ছে প্রয়াত সাংসদের উপরেও। চণ্ডীতলায় যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন আকবর। আগের বিধানসভা ভোটেও আকবরের কথা বলেই ভোটের হাওয়াকে নিজের পালে টানতে সমর্থ হয়েছিলেন ঘরনি স্বাতী। এ বারও স্বামীই যে তাঁর ভরসা তা বুঝেই প্রচারে আকবরের কথা শোনাচ্ছেন তিনি। স্থানীয় জেলা পরিষদ সদস্য সুরজিৎ মণ্ডল সবর্ক্ষণ মেজদির সঙ্গে ঘুরছেন। দলের আরও অনেকের মতো আকবরের এই ভক্ত জানালেন, ‘‘বড়ভাইয়ের (আকবর) দেখানো পথেই এগিয়ে চলেছি। উন্নয়ন তো আছেই, বড়ভাইয়ের স্মৃতিও চণ্ডীতলার মানুষ তাঁদের বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন। ওঁকে চণ্ডীতলার মানুষ ভুলবেন না।’’

না থেকেও তাই চণ্ডীতলায় তৃণমূলের পারানির কড়ি ‘বড়ভাই’ই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement