বৃহস্পতিবার, ভোটের দিন পূর্বস্থলীর হেমায়েতপুরের ‘ওয়ার রুমে’ এ ভাবেই ব্যস্ত ছিলেন স্বপন দেবনাথ। —নিজস্ব চিত্র।
ভোটের আগে হোক, বা পর দিন— পুলিশের সঙ্গে জেলা তৃণমূল সভাপতি (গ্রামীণ) স্বপন দেবনাথের ঘনিষ্ঠতার চর্চা জিইয়ে রইল বর্ধমানে।
গোড়ায় বিতর্ক উস্কে দিয়েছিলেন এক পুলিশকর্তা। নারদ নিউজের ‘স্টিং অপারেশন’-এ জেলার প্রাক্তন পুলিশ সুপার এসএমএইচ মির্জা-কে দাবি করতে শোনা গিয়েছিল, তিনিই নাকি তৃণমূলের অন্যতম শীর্ষ নেতা মুকুল রায়কে বলে স্বপন দেবনাথকে মন্ত্রী করেন। শুক্রবার পুলিশ-যোগ নিয়েই ফের বিদায়ী মন্ত্রীকে খোঁচা মেরেছেন বিরোধীরা। বৃহস্পতিবার স্বপনবাবু স্রেফ পুলিশ-মহলে প্রভাব খাটিয়ে ভোট করিয়েছেন—এমন অভিযোগের সঙ্গে পূর্বস্থলী দক্ষিণের জোট প্রার্থী কংগ্রেসের অভিজিৎ ভট্টাচার্যের টিপ্পনী, ‘‘উনি জেতার স্বপ্ন দেখছেন, ফের সেই পুলিশের দৌলতে। যদিও লাভ হবে না।’’
মির্জা প্রসঙ্গ উঠতেই ভোটের আগে ফুঁসে উঠে স্বপনবাবু বলেছিলেন, ‘‘মন্ত্রিসভা ঠিক করেন নেত্রী (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়)। কোনও এসপি নন।’’
এ বারের বিরোধী-কটাক্ষ সম্পর্কে এ দিন বহু চেষ্টাতেও তাঁর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। দল সূত্রের খবর, গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিনি কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাইপাসের ওই হাসপাতালের ডাক্তারেরা জানিয়েছেন, একে দীর্ঘদিনের ডায়াবিটিসের সমস্যা, তার উপরে শরীর প্রায় জলশূন্য হয়ে পড়েছিল স্বপনবাবুর। শরীরে কিছু সংক্রমণ ধরা পড়েছে। অতিরিক্ত উদ্বেগও ছিল। এ দিন সকাল থেকে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও ডাক্তারদের সঙ্গে খুব কম কথাই বলেছেন স্বপনবাবু। ভোটের প্রসঙ্গ এক বারও তোলেননি। তবে বিদায়ী মন্ত্রীর তরফে পূর্বস্থলীর তৃণমূল নেতা রাজকুমার পান্ডের বক্তব্য, ‘‘স্বপনদা কোথাও, কোনও ভাবে পুলিশকে প্রভাবিত করেননি। মানুষ নির্ভাবনায় ভোট দিয়েছেন।’’
পূর্বস্থলী ১ ব্লকের হেমায়েতপুর মোড়ের দলীয় কার্যালয় থেকে বৃহস্পতিবার ভোট পরিচালনা শুরু করেন স্বপনবাবু। সকাল-সকাল ভোট দিয়ে কার্যালয়ে পৌঁছে প্রথম দফায় কর্মীদের নির্দেশ দেন, কোন পুলিশ অফিসারকে দিয়ে কোন কাজ করাতে হবে, সমস্যা হলে কোন অফিসারের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে।
বেলা বাড়তেই আসতে শুরু করে তৃণমূল কর্মীদের নানা রকমের নালিশ। কেন্দ্রীয় বাহিনী বুথে বুথে ‘চাপ’ দিচ্ছে। রাস্তায় ঘন ঘন গাড়ি নিয়ে টহল দিচ্ছে। বাহিনী মন্তেশ্বর এবং পূর্বস্থলী উত্তর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থীকে বুথের ভিতরে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে লোকসভা, পঞ্চায়েতের মতো ভোট ‘করানো’ যাচ্ছে না—এমন সব ক্ষোভ।
কাজ বাড়ে স্বপনের। থানার অফিসার, ওসি, আইসি থেকে শুরু করে জেলার যে সব পুলিশ-কর্তারা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন ফোনে যোগাযোগ করেন তাঁদের সঙ্গে। তারই মধ্যে গলসি থানার পুলিশ কিছু সিপিএম সমর্থককে নিরাপত্তা দিয়ে বুথে নিয়ে আসছে জেনে ক্ষিপ্ত
হয়ে বলে ফেলেন, ‘‘ওই থানার আইসি তো সিপিএমের ব্যাজ পরে কাজ করলেই পারেন!’’
যদিও মোটের উপরে স্বপন-অনুগামীদের দাবি, জেলা পুলিশের একাংশ এ বারেও তাঁদের ‘দাদা’র পাশে দাঁড়িয়েছে। শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ পেয়ে বর্ধমানে এসপি বদলেছে নির্বাচন কমিশন। তার পরেও এই দাবি আদৌ খাটে কি? স্বপন-অনুগামী তৃণমূল নেতাদের যুক্তি, ‘‘শুধু মুড়ো বদলালে কী হবে? নিচুতলার পুলিশকর্মী, অফিসারদের মধ্যে দাদার ঘনিষ্ঠ অনেকে। তারা কথা মানবে না হতেই পারে না। আর ওরাও জানে, পরেও আমাদের সঙ্গে ঘর করতে হবে।’’
অতিরিক্ত এসপি পদমর্যাদার এক অফিসারকে স্বপনবাবু ফোন করেন বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা নাগাদ। সেই পুলিশ-কর্তা ফোন ধরতেই স্বপনবাবুকে বলতে শোনা যায়, ‘‘বুথের কাছে গেলেই পুলিশ লাঠি হাতে তেড়ে আসছে কেন? আপনি দেখুন!’’ সন্ধ্যায় ভোট মেটা পর্যন্ত স্বপনবাবু লাগাতার এমনই যোগাযোগ রেখে গিয়েছেন পরিচিত পুলিশকর্মীদের সঙ্গে।
এমন যোগাযোগের ফল কী হল? বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটের দিন তাঁরা কোনও সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হলে তা মেটাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে অনেক ক্ষেত্রে দেরি করেছে পুলিশ। পূবর্স্থলী দক্ষিণে কালীনগরের তিনটি বুথ শাসক দখল দখল করেছে এই অভিযোগ পেয়ে রাজ্য পুলিশের সাহায্যে রাস্তা চিনে বাহিনী যতক্ষণে সেখানে পৌঁছয়, ততক্ষণে ‘দখলদারেরা’ পগারপার।
এক ধাপ এগিয়ে সিপিএমের পূর্বস্থলী জোনাল কমিটির সম্পাদক সুব্রত ভাওয়াল বলেছেন, ‘‘যেখানে গা-জোয়ারি করতে গিয়ে তৃণমূল আমাদের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে, সেখানেই পুলিশের মধ্যে কলকাঠি নেড়ে ওদের সুবিধে করে দিয়েছেন খোদ স্বপনবাবু।’’ অভিযোগ মানেননি জেলার অতিরিক্ত এসপি (গ্রামীণ) প্রশান্ত চৌধুরী। তাঁর দাবি, ‘‘এমন কিছু ঘটেছে বলে জানা নেই আমার।’’
বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে অনুগামীরা মনে করাচ্ছেন, ২০০৬ সালে দলের দুর্দিনেও নাদনঘাট থেকে জিতেছিলেন স্বপনবাবু। ২০১১ সালে পূর্বস্থলী (দক্ষিণ) (সাবেক নাদনঘাট) থেকে তাঁর জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ১৬ হাজার। ২০১৪-র লোকসভায় তা বেড়ে হয়েছে ৩৪ হাজার। সে বার ভোট শতাংশে তৃণমূল একাই ছিল ৫১, বাম-কংগ্রেস জোট ৩৩। ‘‘এমন নেতার পুলিশের সাহায্য লাগবে কেন’’, বলছেন স্বপন-ঘনিষ্ঠেরা।
বিরোধীরা পাল্টা বলছেন, উন্নয়নে পক্ষপাত, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতিতে মদতের অভিযোগ দীর্ঘকালই ছিল স্বপনবাবুর বিরুদ্ধে। নারদে পুলিশ-কর্তার ‘হুল’ বিঁধে আরও নড়বড়ে হয়েছে তাঁর ভাবমূর্তি। ক্যামেরার সামনে স্বপনবাবু তাঁকে প্রণামও করতেন বলে মন্ত্রীর ভাবমূর্তিতে কাদা ছিটিয়েছেন জেলার প্রাক্তন পুলিশ সুপার। তার উপরে যোগ হয়েছে জোটের চাপ।
সে জন্যই কি পুলিশ দিয়ে ভোট করাতে হল? বৃহস্পতিবার নিজের ‘ওয়ার রুম’ ছাড়ার আগে স্বপনবাবু বলেছেন, ‘‘কে, কী বলছে জানি না। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে পুলিশ-কর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। এটুকুই।’’